চাঁদেই বসবে সোলার প্যানেল! পৃথিবীকে আজীবন বিদ্যুৎ দিতে জাপানের মহা পরিকল্পনা

সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: পরিষ্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানির সন্ধানে এবার নতুন দিশা দেখছে বিশ্ব। ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের (Electricity) চাহিদা মেটাতে পৃথিবীর বাইরের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর সেই সূত্রে জাপানের একটি সংস্থা এবার এমন এক পরিকল্পনা সামনে আনলো, যা বাস্তবায়িত হলে গোটা বিশ্বের বিদ্যুৎ সরবরাহের ধরন বদলে যেতে পারে। জানা যাচ্ছে, জাপানের নির্মাণ সংস্থা Shimizu Corporation এই প্রকল্পের প্রস্তাব দিয়েছে, যেটির নাম লুনা রিং (Luna Ring)। আর এই প্রকল্পে চাঁদের নিরক্ষরেখা ঘিরে বিশাল সৌর প্যানেলের একটি বলয় তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যা থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ সরাসরি পৃথিবীতে পাঠানো হবে।

কী এই লুনা রিং প্রকল্প?

বলে রাখি, লুনা রিং প্রকল্প অনুযায়ী চাঁদের নিরক্ষরেখা বরাবর একটি বিশাল সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা করা হবে। আর সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী, সৌর বলয়ের প্রস্থ হবে মোটামুটি ২৫০ মাইল এবং এটি চাঁদের চারদিকে প্রায় ৬৮০০ মাইল জুড়ে বিস্তৃত হবে। আর পুরো বলয়জুড়ে থাকবে অসংখ্য সৌর প্যানেল। এই সৌর প্যানেলগুলো মহাশূন্যে অবিরাম সূর্যালোক পাবে। যার ফলে পৃথিবীর মতো রাত, মেঘ বা আবহাওয়ার বাঁধা থাকবে না।

প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প থেকে আনুমানিক ১৩ হাজার টেরাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যেতে পারে। তুলনায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মোট বিদ্যুতের চাহিদা ঘরে ২০ টেরাওয়াট। অর্থাৎ যদি এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বর্তমান বৈশ্বিক চাহিদার বহুগুণ বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁদের পরিবেশ সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সুবিধাজনক। কারণ, চাঁদে কোনও রকম বায়ুমণ্ডল নেই। ফলে সূর্যালোক সরাসরি পৌঁছয় এবং মেঘ ও আবহাওয়ার কোনও বাধা নেই এখানে। পাশাপাশি চাঁদের ঘূর্ণন ধীর হওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে সূর্যালোক পাওয়া যায়। আর কম মাধ্যাকর্ষণের কারণে বড় কাঠামো নির্মাণ করা আরও সহজ।

কীভাবে তৈরি হবে এই বিশাল প্রকল্প?

প্রসঙ্গত, মানুষের পক্ষে এত বড় নির্মাণ কাজ সরাসরি করা খুবই কঠিন এবং ব্যয়বহুল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাই পরিকল্পনা করা হচ্ছে রোবট বা স্বয়ংক্রিয় কোনও যন্ত্রের মাধ্যমে কাজ সম্পন্ন করা হবে। আর এই রোবটগুলিতে চাঁদে মাটি খনন করবে, সৌর প্যানেল বসাবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ আর কাঠামো নির্মাণ করবে। পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যেই এই রোবটগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা হতে পারে। তবে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ উৎপাদন করলেই তো হবে না, বরং সেটাকে পৃথিবীতে পৌঁছনোর ব্যবস্থা করতে হবে। তার জন্য মাইক্রোওয়েভ ও লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে বলে জানানো হয়েছে। এর মাধ্যমে শক্তিকে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক তরঙ্গে রূপান্তরিত করা হবে। তারপর পৃথিবীর নির্দিষ্ট রিসিভিং স্টেশনে পাঠানো হবে। সেখান থেকেই শক্তিকে বিদ্যুতের রূপান্তর করে বিদ্যুৎ গ্রিডে তা যুক্ত করা হবে।

সবথেকে বড় ব্যাপার, এই প্রকল্প যদি চালু হয়, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় কোনও রকম কার্বন নির্গমন হবে না। তার কারণে বায়ু দূষণ তো হবেই না, আর পারমাণবিক বর্জ্যও তৈরি হবে না। যার ফলে এটি দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশবান্ধব শক্তির সবথেকে বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু চাঁদের পরিবেশে এত বিরাট অবকাঠামো নির্মাণের প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বর্তমানে আলোচনা চলছে। এখন দেখার, আদৌ এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় কিনা।

Leave a Comment