দু’দিনের জাপান সফরে মোদী, বুলেট ট্রেন থেকে AI সহ আলোচনা হবে আর কোন বিষয়ে?

Narendra Modi
Narendra Modi

কৃশানু ঘোষ, কলকাতাঃ সম্প্রতি সারা বিশ্ব সরগরম একটা বিষয় নিয়ে আর সেটি হল ট্রাম্পের শুল্কবাণ। কিন্তু তার থেকেও বেশি আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে ভারতের পদক্ষেপ। কারণ, ভারত সেই শুল্কবাণে পাত্তা না দিয়ে আমেরিকার বিকল্প বাজার খুঁজতে শুরু করে দিয়েছে। আর তারপরেই জাপান সফর করছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। ট্রাম্পের শুল্কবাণের পর হঠাৎ করেই ভারত ও জাপানের এই বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন।

২০১৮ সালের পর ২০২৫ সালে, প্রায় ৭ বছর পর, ২৯ ও ৩০ আগস্ট, ১৫তম ভারত ও জাপানের বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে জাপানে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেখানে তিনি দেখা করবেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সাথেও। জাপান সফর শেষে, তিনি যাবেন চীনের সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) সম্মেলনে যোগ দিতে। সেখানে চীনা রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে অংশ নেবেন তিয়ানজিনে বৈঠকেও। এর পাশাপাশি তিনি দেখা করতে পারেন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিনের সাথেও।

কেন গুরুত্বপূর্ণ মোদীর এই জাপান সফর?

১. কোয়াড জোট

অনেকেই মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কবাণের ইস্যু তৈরি করেছে আরও একাধিক উত্তেজনার। যার ফলে মোদীর এই জাপান সফরে নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। বিশেষ করে কোয়াড জোটের বিষয়টির উপর।

আরও পড়ুনঃ এক হচ্ছেন পুতিন, জিনপিং, কিম! উত্তর কোরিয়ার পাগল রাজার চিন সফরে চাপে আমেরিকা

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিস্রি কোয়াড সম্পর্কে জানিয়েছেন, ‘ইন্দো-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের প্রচারের জন্য কোয়াড একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। সম্প্রতি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সরবরাহ চেইনকে আরও স্থিতিশীল করা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। এই সমস্ত বিষয়গুলি ভারত ও জাপানের জন্য অগ্রাধিকারের বিষয়। উভয় দেশ এই প্ল্যাটফর্ম এবং এই অংশীদারিত্বকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। আমাদের সহযোগিতা আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা সমস্ত কোয়াড অংশীদারদের সাথে কাজ করার জন্য মুখিয়ে রয়েছি। আমি নিশ্চিত যে দুই প্রধানমন্ত্রী যখন সাক্ষাৎ করবেন, তখন বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি কোয়াড নিয়েও আলোচনা করা হবে।’

২. প্রতিরক্ষা চুক্তি

বিক্রম মিস্রি মনে করেন, আমেরিকার সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে, ভারত প্রতিরক্ষা খাতে নিজেদের বিকল্পগুলি বাড়াতে চায়। এমন পরিস্থিতিতে, প্রতিরক্ষা চুক্তি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার একটি বড় বিষয় হতে পারে। তিনি জানিয়েছেন, ‘উভয় দেশই যৌথভাবে ইউনিফাইড কমপ্লেক্স রেডিও অ্যান্টেনা তৈরি করছে। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ইউনিকর্ন (UNICORN) AIপ্রকল্পটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। ভারতীয় নৌবাহিনী এবং জাপানি নৌবাহিনী, ভারতে জাহাজ মেরামতের ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা অন্বেষণ করছে।‘

বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নিরাপত্তা সহযোগিতা ঘোষণার অধীনে উভয় দেশই প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে সিলমোহর দিতে পারে। যদি এটি ঘটে, তাহলে ভারত এবং জাপানের মধ্যে যৌথ স্তরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং অস্ত্র তৈরির একটি চুক্তিও হতে পারে। এক্ষেত্রে উল্লেখ্য, কিছুদিন আগে, ভারতকে জাপানের তরফ থেকে যৌথভাবে যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন সম্পর্কিত প্রযুক্তি বিকাশের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।

৩. বাণিজ্যিক সম্পর্ক

ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হওয়ায় মার্কিন শুল্কের প্রভাব মোকাবেলা করার জন্য বাণিজ্যিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। আমদানি-রপ্তানি এবং বিনিয়োগ সম্পর্কিত কিছু বড় চুক্তি সম্পর্কেও আলোচনা হতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। সম্প্রতি, জাপানের প্রধানমন্ত্রী, জাপানি সংবাদপত্র নিক্কেই এশিয়াকে জানিয়েছেন যে, তিনি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য আগামী দশকে ভারতে ১০ ট্রিলিয়ন ইয়েন অর্থাৎ প্রায় ৫.৯৫ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছেন। উভয় দেশ ওষুধ থেকে শুরু করে অটো সেক্টর পর্যন্ত একে অপরের ঘনিষ্ঠ অংশীদার হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

জাপানি সংবাদমাধ্যম অনুযায়ী, ভারতে বিনিয়োগের মাধ্যমে, জাপানি কোম্পানিগুলি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো কৌশলগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রবেশাধিকার পেতে চায়। ভারতে নিজেদের সেটআপ স্থাপন করার পর, এই কোম্পানিগুলি ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করবে, যা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও উন্নত করবে। এর পাশাপাশি, ভারত-জাপান এআই কোম্পানিগুলি যৌথভাবে উদীয়মান প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করবে।

৪. বুলেট ট্রেন

জাপান সফরের মূল আর সবথেকে বড় আলোচনার বিষয় হতে পারে বুলেট ট্রেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রী মোদী জাপান সফরের সময় সেন্দাইয়ের তোহোকু শিনকানসেন প্ল্যান্ট পরিদর্শন করবেন, যেখানে বুলেট ট্রেনের কোচ তৈরি করা হয়। ভারতের বুলেট ট্রেন প্রকল্প নিয়েও দুই নেতার মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, মুম্বই-আহমেদাবাদ হাই স্পিড রেল করিডোরের জন্য E10 বুলেট ট্রেনের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে ভারতকে। এর গতি প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৩২০ কিমি হবে এবং ভূমিকম্পের সময় যাতে ট্রেন লাইনচ্যুত না হয়, সেই প্রযুক্তিও এই ট্রেনে রয়েছে। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী, E10 বুলেট ট্রেন আগামী দিনে চালক ছাড়াই চলবে।

Leave a Comment