পড়া বুঝতেন শুনে শুনে, UPSC ক্র্যাক করে হন দেশের প্রথম ১০০% দৃষ্টি প্রতিবন্ধী IFS

Success Story Of Beno Zephine know about her untold story

বিক্রম ব্যানার্জী, কলকাতা: “চেষ্টাই সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি।”এই প্রচলিত বাংলা প্রবাদ কমবেশি প্রত্যেক সফল ব্যক্তির জীবনের মন্ত্র (Success Story)। কঠিন সংগ্রাম করে সফলতার শিখরে পৌঁছেছেন এমন উদাহরণ অহরহ। তবে জন্ম থেকে 100 শতাংশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, এমন বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের সফলতার গল্প খুব কমই শোনা যায়। সেই বিরলতার মধ্যেই একেবারে পদ্ম হয়ে ফুটেছেন তামিলনাড়ুর বেনো জেফাইন। জীবনের কঠিন লড়াইকে সঙ্গী করেই তামিলনাড়ু বলা ভালো দেশের প্রথম 100 শতাংশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস বা UPSC পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে IFS অফিসার হয়েছেন তিনি

ইচ্ছে থাকলেই যে উপায় হয় প্রমাণ করেছেন বেনো

তামিলনাড়ুর চেন্নাইতেই জন্ম এবং সেখানেই বেড়ে ওঠা বেনো জেফাইনের। জন্ম থেকেই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তাঁর কাছে আপাতদৃষ্টিতে গোটা জগত ছিল অন্ধকার। মেয়ে চোখে দেখতে পান না তাই তাঁকে লিটল ফ্লাওয়ার কনভেন্ট উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করেছিলেন বাবা-মা। এটি চেন্নাইয়ের দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বা বিশেষভাবে সক্ষমদের একটি বিশেষ বিদ্যালয়। বেনোর গোটা স্কুল জীবনটাই কেটেছে এখানে। বাবা লুক অ্যান্টনি চার্লস পেশায় একজন রেল কর্মী ছিলেন। ফলে আর্থিক সমস্যা কোনও দিনই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি তাঁর জীবনে। মা মেরি পদ্মজা ছিলেন হাউস ওয়াইফ।

ছেলেবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি একটা আলাদা টান ছিল বেনোর। আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতো তাঁকে আলাদা করে এ বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার জন্য কখনই তাড়া দিতে হয়নি বাবা-মায়ের। তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অন্ধকার দিক ছিল তাঁর দৃষ্টিশক্তিহীনতা। যাঁর কারণে বহুবার সহপাঠীদের কাছে ঠাট্টার পাত্র হতে হয়েছে তাঁকে। তবে সে সবকিছু উপেক্ষা করেই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যেতেন বেনো। লেখাপড়ায় এক চুলও কমতি হোক চাইতেন না নিজেই। জানা যায়, একবার বিদ্যালয়ে জল অপচয়ের প্রতিবাদ করেছিলেন বেনো। যার কারণে তাঁকে ববেজয় অপমানিত হতে হয়েছিল। আর সেই অপমানকে যেন নিজের জীবনের আগুন বানিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।

2008 সালে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর পরীক্ষায় 500 র মধ্যে 464 নম্বর তুলেছিলেন বেনো। এখানেই শেষ নয়, দশম শ্রেণীতে দুর্দান্ত ফল করার পাশাপাশি গোটা বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম হয়েছিলেন তিনি। জানা গিয়েছে, দশম শ্রেণীতে বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করার পর সরকারি খরচে আমেরিকার এক শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে 400 জন শিক্ষার্থীর মধ্যে একমাত্র দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে তামিল ভাষায় বক্তৃতা রাখেন বেনো। বলেছিলেন, “আমার দৃষ্টিশক্তি নেই। তবে একজন সরকারি কর্মী হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত দৃষ্টি শক্তি রয়েছে।”

জানা যায়, সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসার প্রবল ইচ্ছা ছিল বেনোর। তবে শারীরিক সমস্যা নিয়ে তা কি সম্ভব হবে? এইসব প্রশ্ন যখন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে ততক্ষণ চেন্নাইয়ের স্টেলা মারিস কলেজ থেকে ইংরেজিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করে লয়োলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেছেন তিনি। পরবর্তীতে পরিবারের সহযোগিতায় নিজের পুরনো স্বপ্ন অর্থাৎ সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেন বেনো। পরিবার সূত্রে খবর, UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতিতে মেয়ের ভরসা ছিল বিভিন্ন অডিও ক্লাস এবং ব্রেইলি বুকস। আসলে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে পড়া শুনে শুনে বোঝার চেষ্টা করতেন বেনো। দীর্ঘদিন কঠোর পরিশ্রমের পর প্রথমবারের মতো UPSC পরীক্ষায় বসেন তিনি। তবে প্রথমবারই ব্যর্থ হন বেনো।

অবশ্যই পড়ুন: ভাল খেলেও বিজয় হাজারে থেকে ছিটকে গেল রিঙ্কুর উত্তরপ্রদেশ, মুম্বইয়ের স্বপ্ন ভাঙল কর্ণাটক

জানা যায়, সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পর একপ্রকার ভেঙে পড়েছিলেন বেনো। তবে পরিবারের সমর্থনে ফের ঘুরে দাঁড়ান চেন্নাইয়ের লড়াকু নারী। হাল না ছেড়ে নিজেকে বোঝান, সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় পাস করতেই হবে তাঁকে। সেই মতোই আবার একইভাবে শুরু হয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি। আর তাতেই মেলে ফল। দ্বিতীয়বারের পরীক্ষায় সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিসে উত্তীর্ণ হন তিনি। 2013 সালে UPSC পরীক্ষায় গোটা দেশের মধ্যে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে 343 তম হয়েছিলেন। এরপরই ইন্টারভিউ পর্ব কাটিয়ে এক বছর প্রশিক্ষণের পর দেশের প্রথম 100 শতাংশ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হিসেবে IFS অফিসারের পদ পান দক্ষিণ ভারতের লড়াকু কন্যা বেনো।

Leave a Comment