হিমালয়ের থেকেও বেশি পুরানো, ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন পর্বতমালা – আরাবল্লী (Aravalli Hills) – আজ ধ্বংসের মুখে। না আমরা এমনটা বলছি না, এমন কথা দিনভর দেখা যাচ্ছে টিভি চ্যানেল থেকে শুরু করে ফেসবুক, ইউটিউবের ইনফ্লুয়েন্সারদের মুখে। কোথাও পাহাড়ের বুকে দাঁড়িয়ে চলছে “আরাবল্লি বাঁচাও” ক্যাম্পেন, তো আবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিংয়ে #SaveAravalli।
যদিও কেস চলছে সুপ্রিম কোর্টে, তবুও কেন এই হাঙ্গামা? কী এই আরাবল্লী পর্বতমালা, যার গুরুত্ব এতটাই বেশি, যে আজ রাস্তায় নেমেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কী সত্যিই এই পর্বতমালাকে ধ্বংসের লাইসেন্স দিচ্ছে? নাকি এর পিছনেও রয়েছে কোনও রাজনীতি? কোর্টের তরফ থেকেও মাইনিং ব্যান করার পরেও কেন চলছে আন্দোলন?
আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো আরাবল্লী পর্বতের পেছনে লুকিয়ে থাকা আসল গল্প। আর জানাবো সরকারের তরফ থেকে প্রকাশ হওয়া আরাবল্লী সংক্রান্ত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি!
প্রথমেই আপনাদের জানতে হবে কী এই আরাবল্লী? | What Is Aravalli Hills?
প্রায় ২৫০ কোটি বছর আগের কথা, যখন বিশ্বে মানুষের সৃষ্টি হয়নি তখন থেকেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরাবল্লী। দিল্লি থেকে হরিয়ানা, রাজস্থান থেকে গুজরাত – চারটি রাজ্যে মোট ৬৭০ কিমি জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এই আরাবল্লী পর্বতমালা। চারটি রাজ্যের মোট ৩৯টি জেলায় অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে এই আরাবল্লী।
এই পর্বতমালার মধ্যেই যেমন একদিকে রয়েছে নাহার, চিত্তোরগড়, ভানগড় ফোর্টের মতো একাধিক বিখ্যাত ফোর্ট, তেমনই অন্যদিকে রয়েছে দিলওয়ারা জৈন, শ্রীনাথজি, একলিঙ্গজি-র মতো একাধিক মন্দির।
একদিকে যেমন এই পর্বতমালা বাঘ, সিংহ, হাতি সহ বহু পশুর বাসস্থান, ঠিক তেমনই একাধিক পরিযায়ী পাখিকে দিয়েছে আশ্রয়। রয়েছে একাধিক স্যাংচুয়ারি, রিজার্ভার, এবং পার্ক। সাথে রয়েছে একাধিক পবিত্র বনভুমিও।
এই পর্বতমালার গড় উচ্চতা ৬০০ থেকে ৯০০ মিটার। অন্যদিকে এই আরাবল্লীর সর্বোচ্চ পয়েন্ট গুরু শিখর, যার উচ্চতা ১৭২২ মিটার।
এবার আপনাদের জানতে হবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ এই আরাবল্লী! | Importance Of Aravalli Hills
এই আরাবল্লী হল ভারতের চারটি রাজ্যের বডিগার্ড। যা বহুকাল ধরে হরিয়ানা, দিল্লি সহ উত্তরপ্রদেশকে বাঁচিয়েছে মরুভূমি হওয়ার হাত থেকে। আসলে আরাবল্লীর পেছনেই রয়েছে থর মরুভুমি। যেখানে প্রতিদিন ওঠে ধুলোঝড়। আর এই ঝড়ের সাথেই উড়ে আসে হাজার টন বালি মধ্য ভারতের দিকে। কিন্তু, ধন্যবাদ আরাবল্লিকে। এটি দেওয়ালের মতো আমাদের এই বালি ঝড় থেকে রক্ষা করে। রক্ষা করে শীতকালের দূষণ কমাতে, গরম কালের অসহ্য গরম কমাতে। এই পাহাড়গুলি দিল্লির বায়ুদূষণ কমাতেও সাহায্য করে।
আরাবল্লীর বনভূমির ওপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করে বহু সম্প্রদায়ের মানুষ। তারা এখান থেকেই প্রয়োজনীয় জ্বালানি কাঠ, পশুখাদ্য, ফলমূল, ভেষজ গাছ সংগ্রহ করে।
আরাবল্লী পর্বতমালা একপ্রকার স্পঞ্জের মতো কাজ করে। ফলত, যখন বৃষ্টি হয়, তখন জল মাটির তলায় গিয়ে সোজা গ্রাউণ্ড ওয়াটারে জমা হয়। ফলে বিভিন্ন রাজ্যে জলের যোগান দিয়ে সাহায্য করে। এমনকি এই জলই দিল্লির মধ্যে বোরিং এবং টিউবওয়েলের জল হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
সেন্ট্রাল গ্রাউণ্ড ওয়াটার অথোরিটি এই ক্ষেত্রকে ক্রিটিকাল ওয়াটার জোন হিসাবে মার্ক করেছে। কারণ যদি আরাবল্লীতে খনন কিংবা নির্মাণ কাজ হয় তাহলে এই গ্রাউণ্ড ওয়াটার ক্ষতির মুখে পড়বে।
এই পর্বতমালার একটি অন্যতম গুরুত্ব হল খনিজ পদার্থ। আরাবল্লীতে যেমন পাওয়া যায় চুনাপাথর, মার্বেল, বেলেপাথর ও গ্রানাইটের মতো বাড়ি তৈরির সামগ্রী। তেমনই পাওয়া যায় তামা, সিসা, দস্তা, সোনা এবং টাংস্টেনের মতো একাধিক ধাতু। আমরা বাড়িতে যে টাইলস, মার্বেল ব্যবহার করি তার অধিকাংশই আসে এই পাহাড় থেকে।
অর্থাৎ, জলের প্রয়োজনে হোক বা মরুভুমি হওয়া আটকাতে, বন্যপ্রানী হোক বা সাধারণ মানুষ – সব কিছুতেই আরাবল্লীর গুরুত্ব কিন্তু অপরিসীম।
এবার আসি কেন এত ঝামেলা আরাবল্লী নিয়ে?
টিভি হোক বা সোশ্যাল মিডিয়া – সব জায়গায় এখন আরাবল্লী ট্রেন্ডিংয়ে থাকলেও, এই ঝামেলার সূত্রপাত হয় ১৯৮৫ সালে। যখন ক্ষমতায় ছিলেন রাজীব গান্ধী। তখন সুপ্রিম কোর্টে ভারত সরকারের বিরুদ্ধে একটি রিট মামলা দায়ের করেন একজন পরিবেশবিদ এম. সি. মেহতা। এই মামলায় এম. সি. মেহতা অভিযোগ করেছিলেন যে আরাবল্লী পাহাড়ে অনিয়ন্ত্রিত খনন কাজের ফলে পরিবেশ ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট এই কেসে স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়ে জানায় যে আরাবল্লি পাহাড় রক্ষা করা জরুরি, এবং সেখানে ক্ষতিকর খনন কাজ বন্ধ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এরপর সালটা ১৯৯২। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে বলা হয় – সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী ‘বন’ ছাড়াও, অচাষযোগ্য পাহাড়, পাহাড়ের পাদদেশ, চারণভূমি, এবং দুটি পাহাড়ের মধ্যে পাথুরে অঞ্চলকেও আরাবল্লী হিসাবে গণ্য করা হবে। তবে এই বিজ্ঞপ্তিটি শুধুমাত্র গুরগাঁও ও আলওয়ার এলাকা-র আরাবল্লী-কে কেন্দ্র করে জারি হয়েছিল, পুরো পর্বতমালাকে নয়। ফলে অপর অংশে চলতে থাকে অবৈধ খনন।
এরপর সালটা ১৯৯৫। আদালতে নতুন একটি রিট দায়ের করেন টি. এন. গোদাবরমান। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বনভূমি ধ্বংস হচ্ছে, রাজ্য সরকার আইন মানছে না, বেআইনিভাবে খনন চলছে। এই মামলাটি মূলত তামিলনাড়ু দিয়ে শুরু হলেও, আরাবল্লী পর্বত চলে আসে এই কেসে। সারা দেশজুড়ে বন ধ্বংস ও অবৈধ ব্যবহার বন্ধ করার জন্য এটি একটি ঐতিহাসিক জনস্বার্থ মামলা ছিল। কেসের রায় দেওয়ার সময়ে জানানো হয় – কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়া খনন, পাহাড় কাটাকাটি, জমির ব্যবহার বদল করা যাবে না। পাশাপাশি কোর্ট আরও জানায়, জমির মালিকানা সরকারি হোক বা ব্যাক্তিগত সব বনভুমিতে বন সংরক্ষণ আইন, ১৯৮০ (FCA) প্রযোজ্য হবে। ফলে আরাবল্লি পাহাড়ের বড় অংশ আইনি সুরক্ষা পায়।
পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট ফের পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেয়, বনের মতো দেখতে সমস্ত জমিতে ও সম্পূর্ণ আরাবল্লীতে বন সংরক্ষণ আইন প্রয়োগ করার জন্য।
আর কেন্দ্র এই দায়িত্ব দিয়ে দেয় রাজ্য সরকারের ওপর। এরপর আরাবল্লি নিয়ে বিভিন্ন রাজ্য নিজের মতো “আরাবল্লি সংজ্ঞা” তৈরি করে — যার ফলে খনন লাইসেন্সের জটিলতার সুযোগ পায় প্রশাসন ও ব্যবসায়ীরা। হরিয়ানা ও রাজস্থান জানায়, আরাবল্লীর একাধিক জায়গা নাকি রাজস্ব জমি, কোনও বন নয়। তাই সেখানে খননে অনুমোদন দেওয়া উচিত। এরপরেই চলতে থাকে দেদার ধ্বংসযজ্ঞ। রাতের অন্ধকারে আর রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে চলতে থাকে খনন। এক জায়গায় খনন বন্ধ হলে, শুরু হয় পাশের জেলায়। তৈরি হয় আইনি বিশৃঙ্খলা। আর এখান থেকেই শুরু হল সংঘর্ষের। যা আজও চলছে।
এরপর সালটা ২০০০। সুপ্রিম কোর্ট লক্ষ্য করল গোদাবরমান রায়ের পরও আরাবল্লীতে খনন থামেনি, পাহাড় কাটা চলছে। আর এর জন্য রাজ্য সরকারও যেমন দায়ী, তেমনই দায়ী কেন্দ্রীয় সরকারও। কারণ একদিকে যেমন আরাবল্লীকে বন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেনি রাজ্যগুলো, তেমনই পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় রাজ্যের রিপোর্টের ওপর নির্ভরশীল ছিল। নিজে থেকে আরাবল্লীর সীমানা নির্ধারণ করেনি।
এরপর সালটা ২০০২। সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত নেয় “আরাবল্লীর জন্য আলাদা, বাস্তবভিত্তিক একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ দরকার।” তাই গঠন করা হয় Central Empowered Committee (CEC)। তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয় – আরাবল্লীতে কোন জমি পাহাড়, কোথায় খনন হয়েছে, কোথায় FCA লাগবে, তা সরেজমিনে খতিয়ে দেখার।
CEC সবকিছু দেখার পর স্পষ্ট করে বলে –রাজস্ব রেকর্ডের ভিত্তিতে নয়, জমির প্রকৃতি ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে আরাবল্লী নির্ধারণ করা হবে। গাছপালা ঘন থাক বা না থাক, তা সরকারি হোক, বা ব্যক্তিগত বা অন্য নামে নথিভুক্ত – দেখতে যদি বন-জঙ্গলের মতো হয়, তাহলে আইনের চোখে সেটাকে বন ধরা হবে এবং FCA কার্যকর হবে।
সুপ্রিম কোর্ট, CEC-র এই সংজ্ঞা গ্রহণ করে জানায়, কাগজে জমিকে যাই বলা হোক না কেন, যদি বাস্তবে সেই জমির স্বভাব-চরিত্র বন, জলাভূমি বা প্রাকৃতিক হয়, তাহলেই সেটাকে সেইভাবেই দেখা হবে। এই সংজ্ঞাকে আইনি বৈধতা দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয় – আরাবল্লীর পাহাড়ি এলাকায় খনি সম্পূর্ণ বন্ধ, FCA 1980 প্রযোজ্য হবে, কোনও রাজ্য নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
যার ফলে কিছুটা হলেও বন্ধ হতে থাকে খনন। কিন্তু ওই বছরেই রাজস্থান সরকার দেখে তারা আদালতের আদেশ সরাসরি অমান্য করতে পারবে না। কিন্তু যদি বলা যায় – পাহাড়ের এই জায়গাটা আরাবল্লি নয় তাহলে তো খননে নিষেধাজ্ঞা লাগবে না। ফলত রাজস্থানের তৎকালীন গেহলট সরকার একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে।
এই কমিটি রিচার্ড মার্ফির সূত্র ব্যবহার করে আরাবল্লী পাহাড়ের জন্য সংজ্ঞা নির্ধারণ করে।
সেই সংজ্ঞা অনুযায়ী – আরাবল্লী পাহাড়ের যে সমস্ত অংশ ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু হবে, সেগুলি “আরাবল্লী পাহাড়” বলে গণ্য হবে। এই উঁচু অংশটির সঙ্গে সাপোর্টিং ঢাল/ভূমিও সেই সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত হবে।
আর, যদি ২ বা তার বেশি ১০০ মিটার উঁচু পাহাড় থাকে এবং তারা একে অপরের ৫০০ মিটারের মধ্যে থাকে, তাদের একসাথে “আরাবল্লী পর্বতমালা” বলে মানা হবে। এবং তাদের মাঝের অংশ ১০০ মিটার না হলেও সেই জায়গাটিকে পর্বতের অংশ হিসাবে মানা হবে। যুক্তি দেওয়া হয় — মানুষের জীবিকা ও উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রাখা দরকার।
কিন্তু, সুপ্রিম কোর্ট এই সংজ্ঞা অমান্য করে জানিয়ে দেয় – আইন এড়ানোর জন্য পাহাড়কে অন্য নামে ডাকলেই চলবে না। যদি কোনও জায়গা প্রকৃতিতে পাহাড় বা বন হয়, তাহলে তার উপর পরিবেশ ও বন সংরক্ষণের আইন লাগবেই।
তবে, ২০০৬ সালের ৯ই জানুয়ারি রাজস্থানের বিজেপি সরকার সেই নতুন সংজ্ঞা মেনে বহু জায়গায় খননের অনুমতি দেয়। শুধুমাত্র রাজস্থান সরকার এই সংজ্ঞা মানা শুরু করে। মনে করা হয়, রাজস্থানের প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পাহাড় মুছে গিয়েছে খননের জন্য!
পরবর্তীকালে অন্যান্য রাজ্যগুলিতে শুরু হয় অবৈধ খনন। ফরিদাবাদ, গুরগাঁও এবং মেওয়াতে আরাবল্লি পর্বতের ৪৪৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় খনির কাজের খবর পাওয়া যায়।
কিন্তু তৎকালীন সরকারের এই পদক্ষেপ নিয়ে কোনও সংবাদপত্রে কোনও আর্টিকেল বেরোয়নি। কেউ সরকারের বিরোধিতাও করেনি। ফেরা যাক মুল বিষয়ে।
এরপর ২০১৭ সালে, ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া জানায়, আরাবল্লীতে প্রায় ৩২০০টি অবৈধ খনন চলছে। এমনকি, কম্পট্রলার এবং অডিটর জেনারেল অফ ইন্ডিয়া জানায় – ২০১১ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত আরাবল্লি থেকে প্রায় ১ কোটি মেট্রিক টন খনিজ অবৈধ ভাবে খনন করা হয়েছে।
এরপর ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে, সুপ্রিম কোর্ট ভয়াবহ পর্যবেক্ষণে মন্তব্য করে যে—“রাজস্থানের কিছু অংশে আরাবল্লী-র ৩১টি ছোট পাহাড় সম্পূর্ণরূপে হারিয়ে গেছে অবৈধ খননের কারণে।” যার ফলে রাজ্য ৫০০০ কোটি টাকাও কামিয়েছে। এই সময়ে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস নেতা অশোক গেহলট।
এরপর সালটা ২০১৯। বিজেপি নেতা তথা হরিয়ানার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মনোহর লাল খট্টর বিধানসভায় Punjab Land Preservation Act, 1900 (PLPA)‑তে সংশোধনের অনুরোধ করেন। যার ফলে PLPA‑এর আওতাভুক্ত ভূমি অর্থাৎ আরাবল্লি‑র সংরক্ষণ তুলে দিয়ে তা যেন উন্নয়ন অর্থাৎ বিল্ডিং, রিয়েল এস্টেট, খনি ইত্যাদির জন্য খুলে দেওয়া হয়। এর ফলে প্রায় ২৮,০০০ একর আরাবল্লী জমি রিয়েল এস্টেট বা মালিকদের কাছে গিয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ফলে সুপ্রিম কোর্ট এর তীব্র বিরোধিতা করে এবং জানায়, চাইলে – রাজ্য নিজেদের আইন বানাক, কিন্তু PLPA থেকে আরাবল্লীকে সরালে ধরে নেওয়া হবে পরিবেশ আইন লঙ্ঘিত হচ্ছে। এবং সেই আইন লাগু হবে না। ইন্ডিয়া টুডে-র ২০২২ সালের জুলাই মাসের একটি তদন্তমূলক রিপোর্ট জানায়, এখান থেক বাড়ি করার জিনিস বের করার জন্য অবৈধভাবে ডিনামাইট ব্যবহার করছে মাফিয়ারা।
এরপর সুপ্রিম কোর্ট একের পর এক অ্যাকশন নেয় ২০২১ সালে। বন্ধ করে দেওয়া হয় – হরিয়ানার আরাবল্লিতে জঙ্গল সাফারি। নির্দেশ দেওয়া হয় ১০,০০০টি অবৈধ বাড়ি-ঘর সরিয়ে ফেলার। কোর্ট স্পষ্ট জানায়, “আমরা চাই আমাদের বনভূমি পরিষ্কার হোক।”
এত কিছুর পরেও ঝামেলা চলছিল অবৈধ খনন এবং আরাবল্লী সংজ্ঞা নিয়ে। তাই সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রকে দায়িত্ব দেয়, চার রাজ্যের জন্য আরাবল্লীর সংজ্ঞা নির্ধারণ করার।
এরপর সালটা ২০২৫। কেন্দ্রের তরফ একটি কমিটি গঠন করা হয়, এবং এই কমিটির নেতৃত্ব দেয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক। কমিটিতে দিল্লি, হরিয়ানা, রাজস্থান ও গুজরাটের বন দপ্তরের সচিবরা ছিলেন। পাশাপাশি ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (FSI), সেন্ট্রাল এমপাওয়ার্ড কমিটি (CEC) এবং জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার প্রতিনিধিরাও ছিলেন। সেই কমিটি রাজস্থান সরকারের সেই সংজ্ঞার ভিত্তিতেই ১০০ মিটারের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয় চার রাজ্যের জন্যই। আর ২০২৫ সালের ২০শে নভেম্বর, সুপ্রিম কোর্ট সরকারের দেওয়া আরাবল্লী পর্বতের সংজ্ঞাকে স্বীকার করে নেয়।
আর সুপ্রিম কোর্ট একগুচ্ছ নির্দেশ দেয় –
১। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (ICFRE)-এর মাধ্যমে একটি সুস্থায়ী খনি ব্যবস্থাপনা ও তার মানচিত্র তৈরি করা।
২। যতদিন না পর্যন্ত এই নতুন মানচিত্র ও পরিকল্পনা চূড়ান্ত হচ্ছে, ততদিন আরাবল্লী অঞ্চলে খনির জন্য কোনো নতুন লিজ দেওয়া হবে না বা আগের লিজ পুনর্নবীকরণ করা হবে না।
৩। টাইগার রিজার্ভ, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, ইকো-সেনসিটিভ জোন এবং গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিগুলোতে কোনো প্রকার খনন কাজ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
৪। অবৈধ খনন রুখতে এবং পাহাড়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ‘ভুবন’ পোর্টালের মাধ্যমে স্যাটেলাইট ইমেজের সাহায্যে নিয়মিত নজরদারি।
৫। দিল্লি ও এনসিআর (NCR) সংলগ্ন আরাবল্লী অঞ্চলে কোনোভাবেই খনি উত্তোলন করা যাবে না।
এবার আমরা জানবো সত্যিই কী সরকার আর আদালত আরাবল্লীকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে?
সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের পাহাড়ের সংজ্ঞা মেনে নেওয়ার পর থেকেই শুরু হয় প্রতিবাদ। আদালতের তরফ থেকে ১০০ মিটার সংজ্ঞা মেনে নেওয়াকেই দায় করে চলতে থাকে একের পর আন্দোলন। কারণ, সবজায়গায় একটি রিপোর্ট শেয়ার করা হচ্ছে ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার। সেই তথ্য জানাচ্ছে, এই পর্বতমালায় অবস্থিত প্রায় ১২,০০০ পাহাড়ের মধ্যে মাত্র ৮ শতাংশের উচ্চতা ১০০ মিটারের বেশি। তাহলে বাকি ৯২ শতাংশ পাহাড়ের কী হবে?
কিন্তু আদতে এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল, ভুয়ো। ফরেস্ট সার্ভে অফ ইন্ডিয়া জানিয়েছে, তারা এই ধরনের কোনও তথ্যই কখনও প্রকাশ করেনি। তারা টুইট করেও এই কথা জানিয়েছে।
এরপর সম্প্রতি ভারতের পরিবেশ মন্ত্রী, ভুপেন্দ্র যাদব এই ১০০ মিটার নিয়ম নিয়ে অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছন। ১০০ মিটারের যে সংজ্ঞা সেটা রিচার্ড মর্ফির একটি জিওলজিক্যাল স্টাডি মেনে করা হচ্ছে। কিন্তু অনেকেই এর ভুল অর্থ করে নিচ্ছে। ১০০ মিটার মানে ভূমি বা আশেপাশের এলাকা থেকে ১০০ মিটার নয়, বরং ওই পাহাড়ের উৎপত্তি যেখান থেকে, সেটা মাটির তলায় থাকলেও সেখান থেকেই ধরা হবে। অর্থাৎ যদি কোনও পাহাড়ের উৎপত্তি ভূমির নীচে ২০ মিটার বিস্তৃত থাকে তাহলে সেখান থেকেই ধরা হবে। পাশাপাশি তিনি নিশ্চয়তা দেন, কোনও রকম খননই বৈধ নয়। পরিবেশ বাঁচাতে আমরা বদ্ধ পরিকর। নতুন নিয়মে আরাবল্লী পর্বতমালার মোট ১.৪৪ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে মাত্র ০.১৯ শতাংশ এলাকা খনিজ উত্তোলনের জন্য উপযুক্ত। এই নিয়মের ফলে আরাবল্লীর ৯০ শতাংশই বেঁচে যাবে।
https://x.com/byadavbjp/status/2002674600908648574?s=20
কিন্তু, এখন ভাবার বিষয় মানুষ কেন লোক রেগে যাচ্ছে? কেন হচ্ছে একের পর এক প্রতিবাদ? কেন উঠছে শ্লোগান?
কারণ, অনেকের কাছেই এখনও প্রশ্ন এই ১০০ মিটার মাপা হবে কোথা থেকে? সারা দুনিয়ায় সাধারণত সমুদ্রতলকেই একটি স্ট্যান্ডার্ড পৃষ্ঠ হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু, নতুন সরকারী সংজ্ঞায় দেওয়া হয়েছে, আরাবল্লি জেলার মধ্যে অবস্থিত যে কোনও ভূমিরূপ, যা আশপাশের ভূমির তুলনায় ১০০ মিটার বা তার বেশি উঁচু, তাকে আরাবল্লি পাহাড় বলা হবে। এই উচ্চতা নির্ধারণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ভূমিরূপটিকে ঘিরে থাকা সবচেয়ে নিচের কনট্যুর লাইনকে ভিত্তি ধরা হবে। ওই সবচেয়ে নিচের কনট্যুর লাইনের ভিতরে থাকা সম্পূর্ণ এলাকা—তা বাস্তবে থাকুক বা ধারণাগতভাবে বাড়িয়ে ধরা হোক—পাহাড়, তার ঢাল এবং এর সঙ্গে যুক্ত সব ধরনের ভূমিরূপকে, তাদের ঢাল যতই কম বা বেশি হোক না কেন, সব মিলিয়ে আরাবল্লি পাহাড়ের অংশ হিসেবেই গণ্য করা হবে।
কিন্তু এরপরেও যেহেতু নির্দিষ্ট কোনও সীমানা নির্ধারণ করা হয়নি, তাই অনেকেরই আশঙ্কা পরবর্তীতে যে কেউ এই আশেপাশের ভুমি, কিংবা কনট্যুর লাইনের ভুল ব্যবহার করে খনন কাজ করে যেতে পারে।
কিন্তু, কেন্দ্রীয় সরকার ২৪শে ডিসেম্বর নতুন করে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে তিনটি বিষয় পরিস্কার করে দিয়েছে।
১। আরাবল্লি অঞ্চলে কোনও নতুন খনন লিজ একেবারেই দেওয়া যাবে না।
২। কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক, ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ ফরেস্ট্রি রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন (ICFRE)–কে গোটা আরাবল্লির জন্য একটি বৈজ্ঞানিক ও সমন্বিত ‘টেকসই খনন ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ (Management Plan for Sustainable Mining – MPSM) তৈরি করার সময় আরাবল্লি অঞ্চলে এমন আরও এলাকা বা জোন চিহ্নিত করতে বলেছে, যেখানে খনন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। এই চিহ্নিতকরণ হবে পরিবেশগত, ভূতাত্ত্বিক ও সমগ্র ভূদৃশ্য বিশ্লেষণের ভিত্তিতে। কেন্দ্র ইতিমধ্যেই যে এলাকাগুলোতে খনন নিষিদ্ধ করেছে, তার বাইরেও করতে হবে।
৩। কেন্দ্র নির্দেশ দিয়েছে—যেসব খনি ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে, সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে সেখানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে এবং সমস্ত পরিবেশগত সুরক্ষা বিধি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। চলমান খনন কার্যকলাপের উপর বাড়তি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে, যাতে পরিবেশ রক্ষা হয় এবং টেকসই খনন নীতিই অনুসরণ করা হয়।
আপনারা এই লিঙ্কে ক্লিক করে সরকারী বিজ্ঞপ্তিটি পড়তে পারেন – https://pib.gov.in/PressReleasePage.aspx?PRID=2208234®=3&lang=2
ফলত, সরকারের তরফ থেকে নির্দিষ্ট সব বিষয় জানানোর পরেও চলছে এই বিবাদ। যার ফলে ২৯শে ডিসেম্বর, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ অরাবলী পাহাড় সম্পর্কিত পূর্ববর্তী রায় স্থগিত থাকার নির্দেশ দেয়। এবং এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। আগামী ২১শে জানুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি রয়েছে।
এখন কী হবে পরবর্তী শুনানিতে?