শুনতে পান না কানে, সংসার সামলে ৪০ বছর বয়সে IAS হলেন দুই সন্তানের মা নিশা

Success Story Nisa Unnirajan cracked UPSC exam at age of 40

বিক্রম ব্যানার্জী, কলকাতা: “ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়।” এই প্রচলিত বাংলা প্রবাদ শুধুই বক্তব্য নয় বরং কিছু মানুষের জীবনে এ যেন মোক্ষম মন্ত্র। সেই মন্ত্রের জোরেই প্রতিবছরই লাখ লাখ পড়ুয়া সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস বা UPSC পরীক্ষায় বসেন। সেখান থেকে অবশ্য খুব কম সংখ্যক শিক্ষার্থীই সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়ে ফেরেন। সেই তালিকাতেই নাম রয়েছে কেরলের বাসিন্দা নিশা উনিরাজনের (Success Story)। শ্রবণজনিত সমস্যার কারণে কানে শুনতে পেতেন না তিনি। ফলে সহায় হয় হিয়ারিং মেশিন। পরিবারের দায়িত্ব, বিয়ের পর স্বামী সন্তান সামলেও যে UPSC র মতো বড় পরীক্ষায় সফল হওয়া যায় তা মুখে বলে নয় বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন দক্ষিণ ভারতের এই লড়াকু মহিলা।

হাজারো সমস্যার মাঝে নিজের লক্ষ্যকে খুঁজে নিয়েছেন নিশা

বয়স বড় বালাই। 30 বছর বয়স হয়ে গেলে যখন UPSC পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করে দেন সিংহভাগ পরীক্ষার্থী, সেই পর্বে দাঁড়িয়ে বিয়ের পর স্বামী সংসার সামলে, 35 বছর বয়সে সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির সিদ্ধান্ত নেন কেরলের মেয়ে নিশা। ঠিক করেন, UPSC পরীক্ষায় সফল হয়েই ছাড়বেন। তবে ভাবলেই তো আর সাফল্য হাতে এসে ধরা দেবে না! এর জন্য প্রয়োজন অভাবনীয় পরিশ্রম। সেটা করতে এক চুলও পিছিয়ে যাননি নিশা উনিরাজন।

ছেলেবেলা থেকেই পড়াশোনায় ছিলেন মেধাবী। আর পাঁচটা ছেলে মেয়ের মতো পড়ার জন্য নিশাকে জোর করতে হয়নি পরিবারের। নিজে থেকেই একেবারে বইখাতা নিয়ে বসে যেতেন তিনি। পরবর্তীতে পরিবারের চাপে সাংসারিক জীবনে পা রাখতে হয়েছিল তাঁকে। বিয়ে হয়েছিল নিশার। তবে সংসার জীবন সামলে কি নিজের স্বপ্নে শান দেওয়া যাবে? ছেলেবেলায় যে বড় স্বপ্নটা নিশা দেখেছিল তা আদৌ পূরণ হবে? এসব প্রশ্ন যখন উত্তর খোঁজার গণ্ডিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন নিশার পাশে দাঁড়ান তাঁর স্বামী এবং গোটা পরিবার।

বিয়ের পর, নিজের স্বামী এবং সন্তানকে সামলানোর পাশাপাশি 35 বছর বয়সে গিয়ে সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুতি শুরু করেন নিশা। তবে এখানে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল তাঁর শ্রবণজনিত সমস্যা। জানা যায়, বিয়ের পর পরই কানে শুনতে কম পেতেন নিশা। সময়ের সাথে সাথে সেই সমস্যা আরও বাড়ে। একটা সময় পৌঁছে, নিজের শ্রবণ ক্ষমতা এক প্রকার হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। যার ফলে চিকিৎসকের পরামর্শে নিতে হয়েছিল হিয়ারিং মেশিন বা কানে শোনার যন্ত্র। তবে সেসবের মধ্যেও হাল ছাড়েননি নিশা।

বলে রাখা প্রয়োজন, নিশার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে নন্দনার বয়স 11। ছোটজনের বয়স মাত্র 7 বছর। প্রতিদিন সকালে উঠে সংসারে যাবতীয় কাজকর্ম সেরে মেয়েদের খেতে দেওয়া, স্নান করানো, স্কুলে পাঠানো সবটাই করতেন নিশা। সেইসব সামলেই দিনের বাকিটা সময় নিজের UPSC পরীক্ষার প্রস্তুতিতে লাগাতেন তিনি। নিশার পড়াশোনায় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সাহায্য করে এসেছেন স্বামী পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার অরুণ বাবু। তবে পরিবার থেকে পূর্ণ সমর্থন পেলেও শ্রবণ সমস্যা যেন নিশার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

অবশ্যই পড়ুন: IPL-র আগেই ধাক্কা! দলে জায়গা হারালেন KKR পেসার

সর্বভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতিতে বিভিন্ন ক্লাস এবং অন্যান্য প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষার সময় শ্রবণ সমস্যার জন্য বেশ বিপদে পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবে ওই যে, আর যাই হোক নিজের স্বপ্ন পূরণ করে ছাড়বেন বলেই পন করেছিলেন কেরলের মেয়ে। সেখান থেকেই পরপর 6 বার সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় বসেন তিনি। প্রত্যেকবারই ব্যর্থ হয়েছিলেন নিশা। তবে যতবার অসফল হয়েছেন ততবারই নিজের ব্যর্থতার কারণ খুঁজে সেই ফাঁকা জায়গা ভরাট করার চেষ্টা করেছেন নিশা। আর তাতেই মেলে সফলতা।

2024 সালে 40 বছর বয়সে সপ্তম বারের জন্য UPSC পরীক্ষায় বসেন নিশা। আর তাতেই বদলে যায় ভাগ্য। ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, দেশের মধ্যে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় 100 র‍্যাঙ্ক করেছেন তিনি। IAS হওয়ায় পর এ প্রসঙ্গে ক্যামেরার মুখোমুখি হয়ে UPSC উত্তীর্ণ নিশা জানিয়েছেন, হাজারো সমস্যার মধ্য থেকে নিজের লক্ষ্যকে খুঁজে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর এই বিরাট সাফল্যের পেছনে স্বামী অরুণের অবদানও সর্বসমক্ষে স্বীকার করেছেন কেরলের মেয়ে।

Leave a Comment