চপ ভাজার তেল দিয়েই উড়ছে বায়ুসেনার যুদ্ধবিমান! অসাধ্য সাধন বাঙালি বিজ্ঞানীর

Aviation Fuel

সৌভিক মুখার্জী, কলকাতা: ধীরে ধীরে আত্মনির্ভরতার পথে এগোচ্ছে ভারত। তার এক জলজ্যান্ত উদাহরণ কলকাতার এক বাঙালি বিজ্ঞানী। হ্যাঁ, ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডে ভারতীয় বায়ুসেনার এক যুদ্ধবিমানের আকাশে উড়ছিল দেশে তৈরি বিশেষ বায়ো এভিয়েশন ফুয়েল (Aviation Fuel) দিয়ে। যার নেপথ্যে ছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী ডঃ অঞ্জন রায়। ভারতের সেই সাফল্যের স্মৃতি আবারও যে কাড়া নাড়ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই উদ্যোগ?

আসলে বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত হলেও ২০১৯ সালে ডঃ অঞ্জন রায় ছিলেন দেরাদুনের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ পেট্রোলিয়াম ডিরেক্টর। তাঁর এই গবেষণা শুরু আরও আগে। মোটামুটি ২০০৯ সাল নাগাদ ডঃ অঞ্জন রায় জানান, ভারত প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করে থাকে। তার একটি বড় অংশ ব্যবহার না হয়ে নষ্ট হয়ে যায়। বছরে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন টন কার্বন অ্যাটম বিদেশ থেকে আনা হলেও তার সিংহভাগ অপচয় হয়। সেই সূত্রে প্রশ্ন ওঠে, দেশের মধ্যে থাকা কার্বন ব্যবহার করে কি বিমান ওড়ানো সম্ভব নয়? আর এই ভাবনা থেকেই তৎকালীন ডিরেক্টর ডঃ এম ও গর্গ এবং ডঃ অনিল সিনহার নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল গবেষণা। দীর্ঘ পরীক্ষার পর এমন এক জ্বালানি তৈরি করা হয়, যা দেখতে এবং গুণমানে বিমানের জ্বালানির মতোই।

এদিকে ২০১৬ সালে ডিরেক্টর পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ডঃ অঞ্জন রায় সেই প্রকল্পে নতুন করে গতি আনেন। তখন প্রশ্ন ওঠে, এই জ্বালানি দিয়ে কি সত্যি প্লেন উড়বে? ২০১৮ সালে একটি বেসরকারি বিমান সংস্থা পরীক্ষামূলকভাবে এগিয়ে আসে। তারপর ২৭ আগস্ট, ২০১৮ দেরাদুন থেকে দিল্লি রুটে একটি ছোট্ট বিমানের একটি ইঞ্জিনে ২৫ শতাংশ দেশীয় সিন্থেটিক বায়ো ফুয়েল ব্যবহার করে সফল উড়ান সম্পন্ন হয়। আর ওই বিমানে ছিলেন ২০ জন যাত্রী, দুজন পাইলট এবং ডিজিসিএ-এর এক পর্যবেক্ষক। অবতরণের পর পাঁচজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী উপস্থিত থেকে বিজ্ঞানীদের অভিনন্দন জানিয়েছিলেন।

প্রজাতন্ত্র দিবসে ইতিহাস

এদিকেই এই সাফল্যের পরই তৎপর হয়েছিল ভারতীয় বায়ু সেনা। তাদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবেই উঠে আসে। তাদের মতে, আমদানি বন্ধ হলে সামরিক উড়ান ব্যাহত হতে পারে। আর ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে বিমানটি পরীক্ষামূলক ভাবে ওড়ানো হয়েছিল। এর পর আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ২০১৯ সালের ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবসের প্যারেডের কর্তব্যপথে উড়ে যায় AN-32 যুদ্ধবিমান, যেটির দুটি ইঞ্জিনেই ১০% করে এই বায়ো এভিয়েশন ফুয়েল ব্যবহার করা হয়েছিল।

আরও পড়ুন: ফের ব্যাট হাতে মাঠে ফিরছেন সৌরভ গাঙ্গুলি, কোথায় গড়াবে ম্যাচ?

এ বিষয়ে ডঃ অঞ্জন রায় জানেন, এই জ্বালানির সবথেকে বড় বৈশিষ্ট্য হল, এটি তৈরি হয় অখাদ্য তেল থেকে। যেমন ছত্তিশগড়ের রতনজোত গাছের তেল, পশ্চিমবঙ্গের মহুয়ার তেল, করমচা, সিঙ্গারা বা চপ ভাজার পর ফেলে দেওয়া ব্যবহৃত রান্নার তেল ইত্যাদি। এই তেলগুলোতে উচ্চচাপে হাইড্রোজেন যোগ করে বিশেষ বায়ো ফুয়েল তৈরি করা হয়, এবং পরবর্তী সময়ে একাধিক ধাপে শোধন করে বিমানের উপযোগী তৈরি করা হয়।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এখনও পর্যন্ত বায়ুসেনার ৭০টি বিমান পরীক্ষামূলকভাবে এই জ্বালানি ব্যবহার করেছে। এমনকি একটি বিমানে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ লিটার জ্বালানি দরকার হয়। আর বর্তমানে উৎপাদন হয় একবারে ৫০ লিটার করে। সেই সীমাবদ্ধতা কাটাতে এবার বৃহৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি হচ্ছে বলেই খবর। ম্যাঙ্গালোরে গড়ে উঠেছে এই জ্বালানির নতুন প্ল্যান্ট। সেখানে দিনে ২০ হাজার লিটার জ্বালানি আমদানি করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

Leave a Comment