India Hood Decode: কেন মণিপুরে টানা ১ বছর ধরে চলছে রাষ্ট্রপতি শাসন?

President Rule In Manipur
President Rule In Manipur

একবার ভাবুন তো, যদি বলি – আমাদের দেশের মধ্যেই রয়েছে এমন একটি রাজ্য যেখানে গত এক বছর ধরে চলছে রাষ্ট্রপতি শাসন (President Rule In Manipur), টানা ১২ মাস ধরে নেই কোনও মুখ্যমন্ত্রী – কি বিশ্বাস করবেন?

হয়তো না! কিন্তু এটাই সত্যি।

আজ আমরা কথা বলছি ভারতের অন্যতম রাজ্য মণিপুর নিয়ে, যেখানে ঘরছাড়া প্রায় ৫০,০০০-এরও বেশি মানুষ, ২৪ ঘণ্টা টহল দিচ্ছেন ভারতীয় সেনারা! অবস্থা এতটাই শোচনীয়, যে সেখানে লাগু করা হয়েছে AFSPA-র মতো ভয়ানক আইন! যে আইনের দরুণ শুধুমাত্র সন্দেহের বশেই যে কাউকে গুলি করার ক্ষমতা রাখে সেনাবাহিনী।

মাত্র ৩০ লক্ষ জনসংখ্যা হওয়া সত্ত্বেও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না রাজ্য সরকার! জ্বলছে গত আড়াই বছর ধরে। আর এই খবর হয়তো জানেই না দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষ!

শুনলে হয়তো অবাক হবেন, এই রাজ্যে ছিল ডবল ইঞ্জিন সরকার, তবুও ব্যর্থ হয়েছে রাজ্য!

কিন্তু এখন প্রশ্ন – কেন এমন হাল মণিপুরের? কে আসল মাস্টারমাইন্ড এই মণিপুর জ্বলার পেছনে? যেখানে সবথেকে ভয়ঙ্কর রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরকেও ঠাণ্ডা করে রেখেছে সরকার, সেখানে মণিপুরের মতো রাজ্য কেন ফেল? একবার নয়, দুবার নয়, টানা ১১ বার কেন রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছে এই রাজ্যে?

আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো এমন কিছু তথ্য, এমন কিছু সত্য যা লুকিয়ে রেখেছে ভারতের মেনস্ট্রিম মিডিয়া!

বর্তমান পরিস্থিত!

সালটা ২০২৩। একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে হঠাৎই জ্বলে ওঠে মণিপুরে। কিন্তু, এর আসল কারণ ছিল সেখানকার আদিবাসী সম্প্রদায় – মেইতি, কুকিনাগাদের মধ্যে জমে থাকা দীর্ঘদিনের রাগের বহিঃপ্রকাশ। আর এই দাঙ্গা কিন্তু কোনও আকস্মিক ঘটনা ছিল না, বরং ছিল জমি, সংরক্ষণ নীতি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তজাতিগত পরিচয় সংক্রান্ত পুরনো বিরোধকে ঘিরে।

এই দাঙ্গায় শুধু লাঠি পাথর নয়, ব্যবহৃত হয়েছিল উন্নতমানের বিভিন্ন আগ্নেয়াস্ত্র। সোশ্যাল মিডিয়ায় একের পর এক ভিডিও ভাইরাল হতে থাকে – কোথাও মহিলাদের নগ্ন করে প্যারেড করানোর দৃশ্য, কোথাও মানুষকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার ভিডিও, কোথাও আবার জাতীয় পতাকাকে অবমাননার দৃশ্য, আবার কোথাও শিশুদের হাতে বন্দুকের ভিডিও। পরে তদন্তে দেখা যায়, এই ভিডিওগুলোর কিছু ছিল ভয়াবহ সত্য, আবার কিছু ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুয়ো প্রচার।

এই দাঙ্গায় প্রাণ হারান প্রায় আড়াইশোর বেশি মানুষ, আহত হন অনেকে, ঘর ছাড়েন আরও অনেকে। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, কারফিউ জারি করেও শান্তি ফেরাতে ব্যর্থ হন তৎকালীন রাজ্যের বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিং

এরপর প্রায় টানা ২ বছর ধরে চলে অরাজকতা। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি ব্যর্থ হয়ে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বীরেন সিং।

এরপর ১৩ই ফেব্রুয়ারি রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে জারি করা হয় দশম রাষ্ট্রপতি শাসন। প্রথমে ৬ মাসের জন্য জারি করা হলেও, ৬ মাস শেষে এই সময়সীমা আরও ৬ মাসের জন্য বাড়ানো হয়। যা এবার শেষ হবে ২০২৬ সালের ১৩ই ফেব্রুয়ারি

আপনারা হয়তো অনেকেই ভাবছেন – হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তো শুনেছি, কিন্তু এই মেইতি, কুকি, নাগাদের দাঙ্গা আবার কী? কারা এই সম্প্রদায়? আর এই সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য আপনাকে জানতে হবে মণিপুর কি?

মণিপুর কী?

মণিপুর হল আমাদের দেশের এমন একটি রাজ্য, যার ৩৫২ কিমি বর্ডার রয়েছে মায়ানামারের সাথে, আর দেশের মধ্যে জুড়ে রয়েছে অসম, মিজোরাম এবং নাগাল্যাণ্ডের সাথে

এই রাজ্য চারিদিক থেকে পাহাড়-পর্বতে ঘেরা আর মাঝখানে সমতল ভূমি। ঠিক যেন একটা বাটির মতো। মণিপুরের ১০ শতাংশ জায়গা সমতল ভূমি, আর বাকি ৯০ শতাংশই পাহাড়-পর্বত দিয়ে ঘেরা

মণিপুরে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে, কিন্তু তাদের মধ্যে সবথেকে বেশি বাস করে মোট তিনটি সম্প্রদায়ের মানুষ। এই তিনটি সম্প্রদায়ের মধ্যে –

প্রথমে আসে মেইতি, যারা সমতল এলাকায় বাস করেন। এরা প্রত্যেকেই হিন্দু এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী। এরা রাজ্যের মোট জনসংখ্যার মোট ৫১-৫৩ শতাংশ। এদেরকে বেশি উন্নত মনে করা হয়, কারণ এদের কাছে রয়েছে হাসপাতাল, শিক্ষার মতো সমস্ত সুযোগ-সুবিধা। ১৯৯০ সাল থেকে এই রাজ্যে যত মুখ্যমন্ত্রী হয়েছে, তারা প্রত্যেকেই হয়েছে এই মেইতি প্রজাতি থেকে। তাই বলা ভালো রাজনৈতিকভাবেও এরাই বেশি সক্রিয়।

দ্বিতীয় স্থানে আসে কুকি। যারা মিজোরামের দিকের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করেন।

আর এখানে তৃতীয় সম্প্রদায় হিসাবে আছে – নাগা। এরা সাধারণত নাগাল্যান্ডের দিকের পাহাড়ি এলাকায় বসবাস করে।

তবে, এই নাগা আর কুকি কিন্তু বড় কোনও আদিবাসী গোষ্ঠী নয়, বরং এরা কিছু ছোট ছোট উপ আদিবাসী গোষ্ঠী নিয়ে গঠিত। শুধু নাগাদের মধ্যেই রয়েছে ৩৮টি ছোট ছোট উপ আদিবাসী গোষ্ঠী। এরা পাহাড়ি এলাকায় থাকার দরুন বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়, এবং রাজনীতিতেও এদের অংশগ্রহণ খুবই কম। আর এরা বেশিরভাগ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী।

ব্রিটিশদের আমলে মণিপুর!

সালটা ১৭০৭। তখন মনিপুরের নাম ছিল কাংলেইপাক। রাজ্যের তৎকালীন রাজা পমহৈবা ছিলেন মৈতেই সম্প্রদায়ের এক শক্তিশালী শাসক। তিনি হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করেন, আর রাজ্যের নতুন নাম রাখেন মণিপুর। তাঁর শাসনকালে রাজ্যের সীমানা বিস্তৃত হয়েছিল বর্মা, অর্থাৎ আজকের মায়ানমার পর্যন্ত।

কিন্তু পমহৈবার মৃত্যুর পর মণিপুর দুর্বল হতে শুরু করে। আর ১৮১৯ সালে মণিপুর চলে যায় বর্মার দখলে। এরপর টানা সাত বছর ধরে মণিপুরে চলে বর্মার রাজত্ব, যা “মণিপুরের ধ্বংযজ্ঞের সাত বছর” বা চাহি টারেট কুন্টাকপা নামে পরিচিত।

এই পরিস্থিতিতে মণিপুরের তৎকালীন রাজা গম্ভীর সিং, ব্রিটিশদের সাহায্য চান। আর ১৮২৬ সালে, বর্মার কবল থেকে মণিপুর স্বাধীন হয়। তবে, ৯০ শতাংশ পর্বতে ঘেরা মনিপুরকে সরাসরি শাসন করার ঝুঁকি নেয়নি ব্রিটিশরা। তাই তারা মণিপুরকে একটি প্রিন্সলি স্টেট হিসাবে ঘোষণা করে। অর্থাৎ ব্রিটিশরা সরাসরি এই জায়গা শাসন করবে না, কিন্তু রাজা ব্রিটিশদের আনুগত্য থাকবে।

আর এর সাথেই ব্রিটিশরা প্রয়োগ করে সেই পুরানো কৌশল – ডিভাইড অ্যান্ড রুল। তারা মণিপুরকে পাহাড় আর সমতল এলাকা হিসাবে আলাদা করে, আর পাঠায় খ্রিস্টান মিশনারিদের। এরপর ওই মিশনারিরা, কুকি আর নাগাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ধর্মান্তর শুরু করে।

রিপোর্ট বলছে – ১৯০১ সালে, মণিপুরের খ্রিস্টান জনসংখ্যা ছিল ৮ শতাংশ। আর ২০২১ সালে তা বেড়েছে ৪৫ শতাংশে।

আর ইতিহাস বলছে, এই বিভাজনের বীজই ছিল আজকের মণিপুর সংঘাতের প্রথম এবং মূল কারণ।

স্বাধীনতার পর মণিপুর!

এরপর সালটা ১৯৪৭। স্বাধীনতার সময় ভারতের সাথে মণিপুরের অন্তর্ভুক্তির কথা উঠলে শুরু হয় নতুন টানাপোড়েন। কারণ মণিপুরের একাংশ তখন ভারতের সাথে জুড়তে চায়নি। তাদের আশঙ্কা ছিল – ভারত, মণিপুরের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি রক্ষা করতে পারবে না। তাই উঠতে থাকে একটি আলাদা দেশের দাবি।

কিন্তু, ভারতের কাছে মণিপুর ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একদিকে এই জায়গার ওপর ছিল বিদেশি শক্তির নজর, আর অন্যদিকে রাজ্যের প্রশাসন ছিল দুর্বল। তাই কোনওভাবে যদি বিদেশী শক্তি ওই জায়গা দখল করে নিত, তবে তা হত ভারতের জন্য এক বিরাট হুমকি।

তাই ১৯৪৯ সালে, মণিপুরের তৎকালীন রাজা বোধচন্দ্র সিং যখন শিলঙয়ে আসেন, তাঁকে হাউস অ্যারেস্ট করা হয়। আর ২১শে সেপ্টেম্বর তাঁকে চাপ দিয়ে স্বাক্ষর করানো হয় ভারতের সাথে মণিপুরের সংযুক্তি চুক্তিতে। এরপর ওই চুক্তি ১৫ই অক্টোবর কার্যকর হয়।

এরপর ১৯৫৬ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত মণিপুর ছিল ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হয়। আর ১৯৭২ থেকে এটি সম্পূর্ণ রাজ্য হয়ে যায়।

কিন্তু, মণিপুরের জনতা ভারতের সাথে এই বলপূর্বক অন্তর্ভুক্তির কারণে রেগে যায়। আর জন্ম নেয় একাধিক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর।

কংগ্রেসের সবথেকে বড় ভুল!

এরপর ভারতের সাথে মণিপুরের অন্তর্ভুক্তি হলে, মণিপুরের তৎকালীন রাজা বোধচন্দ্র সিং, নেহেরুর কাছে একটি অনুরোধ করেন। বলেন – ব্রিটিশদের মতো ভারতও যেন মণিপুরের সবাইকে ST-তে অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু, ১৯৫০ সালে ST তালিকা প্রকাশিত হলে দেখা যায়, সেখানে নাগা এবং কুকিরা থাকলেও, মেইতিরা নেই। যার ফলে মেইতিরা ভারত সরকারের ওপর রেগে যায়।

এরপর সালটা ১৯৬০। কংগ্রেস সরকার মণিপুরে লাগু করে ভূমি সংস্কার আইন। সেই আইন অনুযায়ী – সমতলের মানুষ অর্থাৎ মেইতিরা পাহাড়ে জমি কিনতে পারবে না, কিন্তু পাহাড়ি উপজাতি অর্থাৎ কুকি ও নাগারা সমতলের জমি কিনতে পারবে। এই আইন মেইতিদের রাগের আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে।

আর সেই থেকেই, এখনও পর্যন্ত বিভিন্ন দাবি নিয়ে লড়ে আসছে মণিপুরের এই তিন সম্প্রদায়।

প্রথমত, মেইতিরা চাইছে ST-র সংরক্ষণ – যাতে একদিকে তারা নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা ও অধিকার রক্ষা করতে পারে, আর অন্যদিকে নাগা আর কুকিদের মতো চাকরি এবং অন্যান্য অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে পারে। এছাড়াও, মেইতিদের অভিযোগ ছিল – ১৯৬০ সালের ভূমি সংস্কার আইনের দৌলতে বর্তমানে সমতলের ১০ শতাংশ জায়গাতেও কুকিদের জনসংখ্যা বেড়ে চলেছে।

এইসময়ে নাগাদের দাবি ছিল নিজেদের আলাদা দেশ – গ্রেটার নাগাল্যান্ডের। আর কুকিদের দাবি ছিল আলাদা কুকিল্যান্ডের

তবে প্রস্তাবিত এই গ্রেটার নাগাল্যান্ড আর কুকিল্যান্ডের অনেক জায়গা একে অপরের সাথে ওভারল্যাপ করে। ফলে একদিকে নাগা আর কুকিদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে, আর অন্যদিকে সমতল বনাম পাহাড় অর্থাৎ মেইতি বনাম কুকি-নাগা দ্বন্দ্ব বাঁধে।

এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে হিংসা এতটাই বেড়ে যায় যে ১৯৮০ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত এই এলাকায় ‘ডিস্টার্বড এরিয়া অ্যাক্ট’ লাগু করা হয়, সাথে লাগু করা হয় আর্মড ফোর্স স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট অর্থাৎ AFSPA। এই আইনের অধীনে সেনাবাহিনী শুধু সন্দেহের বশে যে কাউকে গুলি করতে পারতো। ১৯৬০ সাল থেকে অর্থাৎ ওই ভূমি সংস্কার আইন লাগু হওয়ার পর থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মণিপুরে ৯ বার রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে।

অর্থাৎ, একদিকে জোর করে ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্তি আর অন্যদিকে ST তালিকায় বৈষম্য — মণিপুরের বর্তমান সংকটের দ্বিতীয় ও সবচেয়ে বড় কারণ।

এবার একটু থামুন, আর ভেবে কমেন্ট করে জানান কি মনে হচ্ছে – এই গোটা অশান্তির জন্য কারা মূলত দায়ী – ব্রিটিশ? নাকি কংগ্রেস সরকার?

বিজেপি আসতে বাড়ে সমস্যা!

এরপর একাধিকবার ভারত সরকার বিভিন্ন গোষ্ঠীকে শান্ত করার চেষ্টা করলেও, সমস্যা ছিল একটাই। এক পক্ষের সঙ্গে কথা বললেই অন্য পক্ষ অশান্তি শুরু করত। ফলে মণিপুরকে কখনোই সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।

এরপর সালটা ২০০৮। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং কুকিদের সাথে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি, সাসপেনশন অফ অপারেশন অর্থাৎ SoO করে। এই চুক্তির ফলে বিদ্রোহীরা অস্ত্র ছেড়ে দেবে, আর সরকার তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান স্থগিত রাখবে। এটা কোনও স্থায়ী শান্তিচুক্তি ছিল না, বরং ছিল আলোচনার একটি কৌশল। আর এরপর থেকে প্রতি বছর এই চুক্তির মেয়াদ বাড়িয়ে কুকিদের শান্ত রাখা হয়।

এরপর সালটা ২০১৭। মণিপুরে প্রথমবার ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এর আগে প্রত্যেকবারই কংগ্রেস জিতে আসছিল। ক্ষমতায় এসে বিজেপিও কংগ্রেসের পথেই হাঁটা শুরু করে এবং SoO চুক্তির মেয়াদ বাড়াতে থাকে।

এরপর ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে বিজেপি প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা ক্ষমতায় ফিরলে কুকিদের সব সমস্যা মেটাবে। কিন্তু, বিজেপি জেতার পর শুরু হয় সমস্যা।

মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বীরেন সিং বলেন, কুকিদের জনসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। ১৯০১ সালে যেখানে কুকিরা ছিল ১ শতাংশ, এখন তারা হয়েছে ২৬ শতাংশ। তিনি আরও দাবি করেন, ড্রাগ ট্রাফিকিংয়ে গ্রেফতার হওয়াদের বড় অংশ মায়ানমারের কুকি-চিন গোষ্ঠীর, আর আফিম চাষে এগিয়ে রয়েছে কুকিরাই।

এই মন্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন কুকিরা। তাদের অভিযোগ — বীরেন সিং নিজে মেইতেই, তাই পক্ষপাতদুষ্ট।

মূল কী কী সমস্যা রয়েছে মণিপুরে?

মণিপুরে কোনও এক নয় রয়েছে একাধিক সমস্যা। এবার আমরা সেগুলোই জানার চেষ্টা করবো।

বর্তমানে মণিপুরের সবথেকে বড় সমস্যা – গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল!

মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস – এই তিন দেশের সীমান্ত জুড়ে চলে আফিম আর ব্রাউন সুগারের বিশাল বড় ব্যবসা, যা সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গাল নামে পরিচিত। আর ধীরে ধীরে মণিপুরের কিছু শহর এই ড্রাগ ট্রেডের এক্সচেঞ্জ হাবে পরিণত হয়েছে। একসময় যে রাজ্য ছিল শুধু রিসিভার, তা ক্রমে উৎপাদক হয়ে ওঠে। বিশেষ করে চুরচান্দপুর জেলা হয়ে ওঠে মণিপুরের সবচেয়ে ড্রাগ-আক্রান্ত এলাকা।

মণিপুরের দ্বিতীয় বড় সমস্যা – মায়ানমার!

২০২১ সালে মায়ানারে সেনা অভ্যুত্থান হয়, ভেঙে পড়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়, বেড়ে যায় অনুপ্রবেশ, অস্ত্র ও ড্রাগ পাচার। উপরন্তু, মায়ানমারের ওপর চিনের বিশাল প্রভাব ভারতের জন্য বাড়তি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মায়ানমারের জন্য মণিপুর আজ ততটাই সংবেদনশীল, যতটা কাশ্মীর পাকিস্তানের জন্য।

আর এই দুই বাস্তবতা থেকেই শুরু হয় বর্তমান অশান্তির মূল ট্রিগার।

ড্রাগ ট্রেড আটকাতে চলে জঙ্গল খালি করার অভিযান!

ড্রাগ ট্রেড ঠেকাতে ২০২২ সালের পর থেকে সরকার মণিপুরে শুরু করে জঙ্গল খালি করার অভিযান। জানা যায়, মায়ানমার থেকে আসা অনুপ্রবেশকারীরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে আশ্রয় নিয়ে ড্রাগ ব্যবসায় সাহায্য করছে। তাই মণিপুর বন আইন ২০২১-এর ৭৩ নম্বর ধারা প্রয়োগ করে সরকার রিজার্ভ ও প্রটেক্টেড ফরেস্ট থেকে নতুন অবৈধ দখলদারদের সরাতে শুরু করে।

হাইকোর্টের রায়!

এরপর ২০২৩ সালের মার্চ মাসে এই বিতর্কে প্রবেশ করে মণিপুর হাইকোর্ট। ২০শে এপ্রিল, আদালতের তরফ থেকে সরকারকে মেইতিদের ST মর্যাদার দাবি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করার নির্দেশ দেয়।

আর এই নির্দেশ কুকিদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে যে হয়তো এবার মেইতিরাও তাদের চাকরি ও জমিতে ভাগ বসাবে। আর সেই ভয়ই ধীরে ধীরে আগুনে পরিণত হয়।

কিন্তু হাইকোর্ট কি কোনও ভুল করল?

এবার আমরা জানবো – আদৌ কি হাইকোর্টের কোনও ভুল করেছিল। আর সেটা জানার জন্য আমাদের জানতে হবে – আসলে কোনও সম্প্রদায় কীভাবে ST তালিকায় ঢোকে?

এর জন্য রাজ্য সরকারকে প্রথমে ট্রাইবাল অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রক বা ORGI-র কাছে একটি প্রস্তাব পাঠাতে হয়। ORGI অনুমোদন দিলে সেই প্রস্তাব যায় ন্যাশনাল কমিশন ফর শিডিউল ট্রাইবস-এর কাছে। সেখান থেকেও ছাড়পত্র মিললে তবেই সংবিধান সংশোধন করে ST তালিকা বদলানো সম্ভব।

তবে মেইতি সম্প্রদায় এর কোনটিই করেনি। মণিপুর হাইকোর্ট শুধু রাজ্যকে একটি নির্দেশনা দিয়েছিল, তাদের ST হিসাবে বিবেচনা করার। অর্থাৎ হাইকোর্টের রায় কিন্তু খুব একটা ক্রোধ জন্ম দেওয়ার মতো কিছু ছিল না।

আর যদি কারোর আপত্তি থাকতো, তাহলে তারা – সুপ্রিম কোর্টে যেতে পারতো। কিন্তু, সেটা না করে বেছে নেওয়া হয় প্রতিবাদ এবং হিংসার পথ।

তাই প্রশ্নটা আরও গভীর হয়—কুকি ও নাগারা কি এখনও ভারতকে নিজেদের দেশ হিসেবে পুরোপুরি মেনে নিতে পারছে না? নাকি রাষ্ট্রই ব্যর্থ হয়েছে তাদের আপন করে নিতে? এই হিংসার দায় কার? সরকার, প্রশাসন, নাকি পুরনো ইতিহাসের? আদৌ কি ১৩ই ফেব্রুয়ারি উঠে যাবে মণিপুরের রাষ্ট্রপতি শাসন? জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত কমেন্ট করে।

Leave a Comment