আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: অনেকের পক্ষেই এক ধাক্কায় বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ (Investment) করা সম্ভব হয় না। তবে আর চিন্তা নেই, এবার দীর্ঘমেয়াদে অল্প অল্প করে টাকা জমিয়ে বিরাট অঙ্কের অর্থ লাভের সুযোগ করে দিচ্ছে SIP (Systematic Investment Plan)।
গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয়
- অল্প কিন্তু নিয়মিত টাকা বিনিয়োগ,
- দীর্ঘ সময় ধরে তা চালিয়ে যাওয়া
- এবং কম্পাউন্ডিংয়ের সুবিধা
এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কাজ করলে মিউচুয়াল ফান্ডের SIP-তে আপনিও বড় অঙ্কের ফান্ড তৈরি করতে পারেন। মাসে মাত্র ২,০০০ টাকা বিনিয়োগ করে ২ কোটি টাকার লক্ষ্যে পৌঁছোনোও সম্ভব। তবে এই গোটা বিষয়টি রিটার্নের হার এবং বিনিয়োগের সময়ের ওপর নির্ভরশীল।
২,০০০ টাকা মাসিক SIP-তে ২ কোটি টাকার হিসাব
প্রতি মাসে ২,০০০ টাকা বিনিয়োগ করলে বছরে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪,০০০ টাকা। এই বিনিয়োগ নিয়মিত চালিয়ে গেলে এবং নির্দিষ্ট বার্ষিক রিটার্ন ধরে হিসাব করলে ২ কোটি টাকার লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য সময় লাগতে পারে যথাক্রমে,
- ১০% আনুমানিক বার্ষিক রিটার্ন: প্রায় ৪৬ বছর সময় লাগতে পারে। এই সময়ে নিজের পকেট থেকে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হবে প্রায় ১১.০৬ লক্ষ টাকা। সম্ভাব্য ফান্ডের বাকি অংশ আসবে বিনিয়োগের উপর অর্জিত রিটার্ন থেকে।
- ১২% আনুমানিক বার্ষিক রিটার্ন: প্রায় ৪০ বছর সময় লাগতে পারে। এই ক্ষেত্রে নিজের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হবে প্রায় ৯.৬৮ লক্ষ টাকা।
- ১৫% আনুমানিক বার্ষিক রিটার্ন: প্রায় ৩৪ বছর সময় লাগতে পারে। মোট নিজের বিনিয়োগ হবে প্রায় ৮.২০ লক্ষ টাকা।
এই হিসাবগুলি মাসের শেষে নিয়মিত বিনিয়োগ এবং বার্ষিক রিটার্নকে মাসিক ভিত্তিতে কম্পাউন্ড করে করা আনুমানিক গাণিতিক হিসাব। বাস্তবে বাজারের ওঠানামার ফলে লক্ষ্যে পৌঁছনোর সময় কিছুটা আলাদা হতে পারে।
কম্পাউন্ডিং কীভাবে বিনিয়োগের অঙ্ক বাড়ায়?
কম্পাউন্ডিংয়ের অর্থ হল, বিনিয়োগ থেকে যে রিটার্ন পাওয়া যায়, পরবর্তী সময়ে তার থেকে আরও রিটার্ন পাওয়ার ব্যবস্থা। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে বিনিয়োগ চালিয়ে গেলে ফান্ডের বৃদ্ধি শুধু নিজের জমা টাকার উপর নির্ভর করে না, আগের রিটার্নও ভবিষ্যতের বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
প্রথম কয়েক বছরে এই বৃদ্ধি তুলনামূলক ধীর মনে হতে পারে। কারণ, তখন বিনিয়োগের মোট পরিমাণ কম থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে টাকা বিনিয়োগ করতে থাকলে এবং তার উপর রিটার্ন জমতে থাকলে পরবর্তী পর্যায়ে ফান্ডের বৃদ্ধি তুলনামূলক দ্রুত হয়।
১৫ ও ৩০ বছরে কত টাকা হতে পারে?
উল্লিখিত অনুমানের ভিত্তিতে, ১২% আনুমানিক বার্ষিক রিটার্ন ধরে ২,০০০ টাকা মাসিক SIP-তে সম্ভাব্য ফলাফল হবে,
- ১৫ বছরে: মোট নিজের বিনিয়োগ হবে ৩.৬০ লক্ষ টাকা। সম্ভাব্য রিটার্ন প্রায় ৬.৪৯ লক্ষ টাকা এবং মোট ফান্ড প্রায় ১০.০৯ লক্ষ টাকা হতে পারে।
- ৩০ বছরে: মোট নিজের বিনিয়োগ হবে ৭.২০ লক্ষ টাকা। সম্ভাব্য রিটার্ন প্রায় ৬৩.৪০ লক্ষ টাকা এবং মোট ফান্ড প্রায় ৭০.৬০ লক্ষ টাকা হতে পারে।
এই তুলনা থেকে বোঝা যায়, বিনিয়োগের সময়সীমা বাড়লে কম্পাউন্ডিংয়ের প্রভাব উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠবে। তবে ৩০ বছর বিনিয়োগ করলেই যে প্রত্যেকে একই অঙ্কের ফান্ড পাবেন, তা নয়।
দীর্ঘমেয়াদে সম্পদ তৈরির আরেকটি উপায় হল আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে SIP-র পরিমাণ বাড়ানো। একে বলা হয় স্টেপ-আপ SIP। উদাহরণস্বরূপ, প্রতি বছর মাসিক বিনিয়োগের পরিমাণ ১০% বাড়ানো হলে দীর্ঘমেয়াদে মোট বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য ফান্ড, দুটিই বাড়তে পারে। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। প্রতি মাসে নির্দিষ্ট ২,০০০ টাকা বিনিয়োগ করা এবং প্রতি বছর বিনিয়োগের অঙ্ক বাড়ানো এক বিষয় নয়। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে নিজের পকেট থেকে জমা দেওয়া টাকার পরিমাণও বেশি হবে।
SIP-তে বিনিয়োগের আগে কোন বিষয়গুলি মাথায় রাখা দরকার?
১. রিটার্ন নিশ্চিত নয়:
১০%, ১২% বা ১৫% বার্ষিক রিটার্ন কেবল হিসাবের সুবিধার জন্য ধরা হয়েছে। মিউচুয়াল ফান্ড বাজার-নির্ভর এবং প্রকৃত রিটার্ন কম বা বেশি হতে পারে।
২. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা জরুরি:
দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। মাঝপথে বিনিয়োগ বন্ধ করা বা টাকা তুলে নেওয়া কম্পাউন্ডিংয়ের সুবিধা কমিয়ে দিতে পারে।
৩. বাজারের ঝুঁকি বুঝতে হবে:
বিশেষ করে ইকুইটি মিউচুয়াল ফান্ডে বাজার পড়লে বিনিয়োগের মূল্য কমতে পারে। তাই নিজের ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা ও আর্থিক লক্ষ্য অনুযায়ী ফান্ড বেছে নেওয়া প্রয়োজন।
৪. মুদ্রাস্ফীতির প্রভাবও রয়েছে:
কয়েক দশক পরে ২ কোটি টাকার ক্রয়ক্ষমতা আজকের ২ কোটি টাকার সমান থাকবে না। ফলে ভবিষ্যতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের সময় মুদ্রাস্ফীতির বিষয়টিও বিবেচনা করা দরকার।
৫. রুপি কস্ট অ্যাভারেজিং লাভের নিশ্চয়তা দেয় না:
নিয়মিত SIP-তে বাজারের বিভিন্ন সময়ে ইউনিট কেনা হয়। এতে ক্রয়মূল্যের গড় তৈরি হতে পারে, কিন্তু বাজারের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা বা নিশ্চিত লাভ পাওয়া যায় না।
আরও পড়ুন: বাংলার ডিএ মামলায় বড় আপডেট! ২৭ অক্টোবর কী হবে সুপ্রিম কোর্টে?
SEBI এবং AMFI-র বিনিয়োগ-সংক্রান্ত নির্দেশিকাতেও মিউচুয়াল ফান্ডের রিটার্ন নিশ্চিত নয় এবং অতীতের পারফরম্যান্স ভবিষ্যতের রিটার্নের নিশ্চয়তা দেয় না বলে সতর্ক করা হয়েছে। তাই বিনিয়োগ করার আগে ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নিন। একটা ভুল সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে অনেক বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।