আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দিল্লিতে (Delhi) মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিয়ে হওয়া বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে বেশ কিছুদিন ধরেই উত্তেজনা তুঙ্গে। এর আগে জুলাই মাসে দিল্লিতে বিক্ষোভের সময় পুলিশের পদক্ষেপ, গণ-আটক, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছিল। সেই ঘটনাগুলিকে ঘিরে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court) একাধিক মামলা দায়ের হয়। পাশাপাশি, রামলীলা ময়দানে চলা বিক্ষোভের জেরে ব্যবসায়িক ক্ষতির অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হন দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠনগুলিও। সেই মামলাগুলির শুনানিতেই এবার প্রতিবাদস্থল অনির্দিষ্টকালের জন্য দখল করে রাখা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant)।
প্রতিবাদের অধিকার সবার, কিন্তু অনির্দিষ্টকালের জন্য নয়
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বলেন, কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন চিরদিনের জন্য একটি প্রতিবাদস্থল দখল করে রাখতে পারে না। কারণ, সেখানে অন্যদেরও নিজেদের দাবি ও অভিযোগ জানানোর অধিকার রয়েছে। তাঁর কথায়, কৃষক, সাংবাদিক-সহ বিভিন্ন শ্রেণির মানুষেরও প্রতিবাদ জানানোর প্রয়োজন হতে পারে। তাই নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া উচিত। একজন প্রতিবাদ করছেন বলে অন্য কেউ সেখানে প্রতিবাদ করতে পারবেন না, এমনটা হতে পারে না।
এই শুনানিতে শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতির বিষয়টিই নয়, সাধারণ মানুষের জীবিকার প্রসঙ্গও উঠে আসে। দীর্ঘক্ষণ ধরে কোনও এলাকায় বিক্ষোভ চললে আশপাশের দোকানপাট, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং পরিবহণ ব্যবস্থার উপরেও তার প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে সমস্যায় পড়েন দিন আনা দিন খাওয়া শ্রমিকরাও। তাঁদের প্রতিদিনের উপার্জনের উপরেই সংসার চলে। ফলে কোনও প্রতিবাদের কারণে দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকলে তাঁদের দিনযাপন অনিশ্চয়তায় ডুবে যায়। আদালতের পর্যবেক্ষণে এই বিষয়টি বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উৎসবের মরশুমে ব্যাপক ক্ষতি
অন্যদিকে, দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠনগুলির তরফে আইনজীবী মুকুল রোহতগি আদালতে জানান, রামলীলা ময়দানে বিক্ষোভের কারণে আশপাশের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তাঁর দাবি, প্রতিবাদস্থলের আশপাশে প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের বসবাস। অথচ বিক্ষোভের জেরে দোকানপাট বন্ধ থাকছে এবং কনট প্লেসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাতেও লোকজনের উপস্থিতি কমে গিয়েছে। বিশেষ করে উৎসবের মরশুমে ব্যবসার ক্ষতি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দু’মাস দিল্লিতে কোনও ধরনের বিক্ষোভ বা ধরনায় নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদনও জানান তিনি।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ শোনার পর সুপ্রিম কোর্ট জানায়, যে সংগঠনগুলি বিক্ষোভের আয়োজন করেছে, তাদেরও নিজের মতামত রাখার সুযোগ দিতে হবে। কারণ, সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলিকে নিজেদের মতামত জানানোর সুযোগ না দিয়ে ব্যবসায়ীদের অভিযোগের ভিত্তিতে আদালত কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে না। সেই কারণে কিরানা কমিটি-সহ দিল্লির ব্যবসায়ী সংগঠনগুলিকে বিক্ষোভের আয়োজকদের মামলায় যুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বিক্ষোভের কারণে ঠিক কতটা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, তার হিসাবও আদালতে জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: দীপাবলিতে আকাল! মিলবে না ১০, ২০, ৫০ টাকার নোট? RBI-র সার্কুলার ঘিরে শোরগোল
আদালতের বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রতিবাদ করার অধিকার যেমন গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তেমনই সাধারণ মানুষের ব্যবসা-বাণিজ্য ও রোজগারের অধিকারকেও কোনওভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিক্ষোভ চললে অন্যরা সেই জায়গা ব্যবহার করতে পারে না। তাই প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান ও সময়সীমা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করছে শীর্ষ আদালত। এদিকে, এই মামলার পাশাপাশি বিক্ষোভ ঘিরে পুলিশের পদক্ষেপ, গণ-আটক, মেট্রো পরিষেবা বন্ধ রাখা এবং ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলিও খতিয়ে দেখছে আদালত। এ বিষয়ে কেন্দ্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির কাছ থেকে জবাব চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।