ঠিক যে যে ভুল করে নিজেদের ভবিষ্যত নষ্ট করেছিল স্পেন, ব্রিটেন, আর রাশিয়া, এবার ঠিক সেই একই ভুল পর পর করে চলেছে আমেরিকা। ঠিক যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি। যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে আমেরিকাকে। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে – আমেরিকার সুপার পাওয়ার তকমার মেয়াদ আর মাত্র কিছু দিনের (Fall Of America)।
১৫০০ সালে যে স্পেন ছিল সারা বিশ্বের সবচেয়ে ধনী সাম্রাজ্য, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি সোনা আর রূপো ছিল যাদের নিয়ন্ত্রণে, সমগ্র ইউরোপ চলত যাদের অঙ্গুলি হেলনে – সেই স্পেনই মাত্র ৮০ বছরের মধ্যে হয়ে যায় দেউলিয়া। আর সেই থেকে তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি।
১৯১৪ সালে যে ব্রিটেন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য, অধিকাংশ দেশকে বানিয়েছিল উপনিবেশ, যাদের পাউন্ড রাজত্ব করত সারা বিশ্বে – সেই ব্রিটেন মাত্র ৪০ বছরের মধ্যে হারিয়ে ফেলে নিজেদের ক্ষমতা।
১৯৯১ সালে যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তি, যাদের কাছে ছিল সর্বোচ্চ নিউক্লিয়ার অস্ত্র, মহাকাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক – সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন মাত্র ৯০০ দিনের মধ্যে মিশে যায় মাটির সাথে, হারিয়ে ফেলে সুপার পাওয়ার তকমা।
শুনলে চমকে যাবেন, এই সমস্ত সুপার পাওয়ার দেশের পতন, কোনও বাইরের শত্রুর আক্রমণে কিংবা যুদ্ধের কারণে হয়নি। হয়েছে নিজেদের ভুলেই, নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যার কারণে, বেশ কিছু প্যাটার্ন মেনে।
আর সেই একই প্যাটার্ন বর্তমানে দেখা যাচ্ছে আমেরিকায়। ধীরে ধীরে সেই একই পথে এবার নিজের কবর খুঁড়ছে আমেরিকা।
আর একথা আমরা বলছি না, বলছে ইতিহাসের বেশ কিছু তথ্য।
ঠিক কীভাবে নিজেদের ভুলে ধ্বংস হয়েছিল বিশ্বের ৩ সুপার পাওয়ার দেশ? কী কী কমন প্যাটার্ন ছিল তিনটি দেশের মধ্যে? ঠিক কোন ভুলগুলো এখন করছে আমেরিকা? আর কতদিন সময় রয়েছে আমেরিকার হাতে? আমেরিকা যদি সুপার পাওয়ার তকমা হারিয়ে ফেলে, তাহলে কারা হবে পরবর্তী সুপার পাওয়ার?
আজকের India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো ইতিহাসের এমন কিছু তথ্য, যা প্রত্যেককে শিক্ষা দেবে – অহংকারই পতনের মূল কারণ।
১। স্পেনের পতন
সালটা ১৪৯২। সাম্রাজ্য বিস্তার করতে করতে প্রথমবার আমেরিকা আবিষ্কার করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস, আর তারপর থেকেই স্পেন দ্রুত গতিতে গ্লোবাল সুপার পাওয়ারে পরিণত হয়। এরপর আজটেক ও ইনকা সাম্রাজ্য দখল করে বিশ্বের বৃহত্তম সোনা ও রূপোর খনিগুলিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনে স্পেন।
এরপর ১৫৫০ সাল নাগাদ প্রতি বছর স্পেন প্রায় ২০০ টন সিলভার, আর ১৬০০ সাল নাগাদ প্রায় ৪০০ টন সিলভার নিজেদের দেশে আনতো। স্প্যানিশ রিয়াল ছিল তৎকালীন বিশ্বের রিজার্ভ কারেন্সি।
১৫৫৬–১৫৯৮ সময়কালে, রাজা দ্বিতীয় ফিলিপের শাসনকালে, স্পেন ইতিহাসের সবচেয়ে ধনী রাজতন্ত্রে পরিণত হয়। কিন্তু, এরপরই ধীরে ধীরে ছয়টি ধাপে ধ্বংসের মুখে ঢলে পড়ে স্পেন।
স্টেজ ১: সামরিক শক্তির অতিরিক্ত বিস্তার
রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ মনে করতেন সম্পদ অফুরন্ত। আর এই সম্পদের ওপর নির্ভর করেই তিনি সারা বিশ্বে স্পেনের সাম্রাজ্য বিস্তার করতে এগিয়ে যান। অটোমান সাম্রাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, ইংল্যান্ড সহ একাধিক উপনিবেশে একযোগে যুদ্ধ শুরু করেন। ১৫৮০ সাল নাগাদ, বিশ্বের চারটি মহাদেশে স্পেনের সেনাবাহিনী মোতায়েন ছিল। দেশের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হত সামরিক খাতে। যে কারণে সাম্রাজ্য বাড়লেও, ধ্বসে পড়ে অর্থনীতি।
স্টেজ ২: কারেন্সির মান অবমূল্যায়ন
যুদ্ধের খরচ মেটাতে সরকার রুপোর কয়েনে তামা মেশাতে শুরু করে। প্রথমে ৫০%, এবং পরে ৭৫% তামা মেশানো হয়। ১৬০০ সাল নাগাদ স্প্যানিশ রিয়ালে কার্যত আর রুপোই থাকত না। আর এটাকেই বলা হয় কারেন্সি ডিবেসমেন্ট অর্থাৎ কারেন্সির মান অবমুল্যায়ন। এই প্রক্রিয়ায় কারেন্সির ফেস ভ্যালু তো একই থাকল, কিন্তু আসল মূল্য কমে গেল। ফলে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে, ব্যবসায়ীরা কয়েন নিতে অস্বীকার করে।
স্টেজ ৩: ঋণের ফাঁদ ও বারবার দেউলিয়া হওয়া
যুদ্ধের খরচ মেটাতে কারেন্সির মান অবমূল্যায়ন করা ছাড়াও ইতালি ও জার্মানির ব্যাঙ্ক থেকে মোটা-মোটা ঋণ নিতে শুরু করে স্পেন। একসময় ঋণ মেটাতে না পেরে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করতে বাধ্য হয় স্প্যানিশ সরকার। আগের ঋণ মেটাতে নেওয়া হয় নতুন ঋণ, ফের একইভাবে নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা। এইভাবে ১৫৫৭, ১৫৭৫, ১৫৯৬, ১৬০৭ – মোট ৫০ বছরে ৪ বার নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করে স্পেন।
স্টেজ ৪: উৎপাদন ক্ষমতার পতন
দেশের কোষাগারে বিপুল পরিমাণে সোনা-রুপো থাকার কারণে স্পেন কর্মবিমুখ হয়ে পড়ে। কৃষি ও শিল্প উৎপাদন কমে যায়। ১৬০০ শতকে স্পেন প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। এরপর সোনা-রুপোর উত্তোলন কমতেই দেশের অর্থনীতি ধসে পড়তে থাকে।
স্টেজ ৫: সামাজিক ক্ষয়
অর্থনীতির পতনের সঙ্গে দেশের মধ্যে বাড়ে অপরাধ ও দারিদ্রতা। শিক্ষিত ও দক্ষ জনগণ দেশ ছাড়তে শুরু করে। সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে থাকে।
স্টেজ ৬: উপনিবেশ হারানো ও চূড়ান্ত পতন
দেশের কোষাগার শূন্য হওয়ার সাথে সাথেই সেনাবাহিনীর অর্থ যোগানেও ব্যর্থ হয় স্পেন। যার ফলে ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে তারা। ১৬৪০ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে হারাতে থাকে একের পর এক উপনিবেশ। বর্তমানে তারা সুপারপাওয়ার থেকে ইউরোপের একটি সাধারণ অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষিত দেশ হলেও বিশ্ব রাজনীতিতে স্পেনের বর্তমানে কোনও প্রভাব নেই। তারা মূলত একটি টুরিস্ট ডেস্টিনেশন হিসেবেই পরিচিত।
মূলত এই সকল কারণেই নিজেদের সুপারপাওয়ার তকমা হারায় স্পেন।
২। ব্রিটেনের পতন
সালটা ১৯১৪। একের পর এক দেশ দখল করতে করতে ব্রিটেন হয়ে ওঠে মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য। জানলে অবাক হবেন, তখন বিশ্বের মোট ভূমির প্রায় ২৫%-ই ছিল ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। পাউন্ড স্টার্লিং ছিল বিশ্বের গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি। লন্ডন ছিল বিশ্বের প্রধান ফিনান্সিয়াল সেন্টার। বলা হত— “The sun never sets on the British Empire” অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনোই অস্ত যায় না। কিন্তু, মূলত পাঁচটি ভুলে ডুবতে থাকে ব্রিটেনের সূর্য।
স্টেজ ১: সামরিক শক্তির অতিরিক্ত বিস্তার
ভারত, আফ্রিকা, মিডল ইস্ট, চিন, ক্যারিবিয়ান, তখন এই সমস্ত দেশে ব্রিটেনের সেনা মোতায়েন ছিল। ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ব্রিটেন নিরপেক্ষ না থেকে যুদ্ধে নামে। যার কারণে খরচ হয় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। অবস্থা এমন হয় যে খাবার এবং অস্ত্রের জন্য আমেরিকার কাছ থেকে ভারী ঋণ নিতে শুরু করে ব্রিটেন। যে দেশ বাকী বিশ্বকে ঋণ দিত, সেই নিতে থাকে ঋণ।
স্টেজ ২: গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ত্যাগ ও কারেন্সির অবমূল্যায়ন
তৎকালীন সময়ে বিশ্বের অধিকাংশ দেশে কারেন্সি ব্যবস্থা ছিল গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ভিত্তিক। অর্থাৎ, কোনও দেশে যত পরিমাণ সোনা রয়েছে, তত পরিমাণ মুল্যের টাকা থাকবে, তার বেশি মূল্যের নয়। যুদ্ধের সময় ব্রিটেন তাদের অধিকাংশ সোনা আমেরিকাকে দিয়ে দেয়। যার ফলে ১৯১৪ সালে ব্রিটেনের কাছে যা সোনা ছিল, ১৯২০ সালে তা হাফ হয়ে যায়। টাকার পরিমাণ ও সোনার মধ্যে ফারাক বাড়তে থাকে। ১৯৩১ সালে ব্রিটেন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ত্যাগ করে। ফলে রাতারাতি পাউন্ডের মূল্য ২৫% পড়ে যায়।
স্টেজ ৩: ঋণের ফাঁদ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ঋণ সামলাতেই শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে খরচ হয় প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার, যা আগের চেয়ে ৩ গুণ বেশি। ফলে ব্রিটেন আরও বেশি ঋণ নেয় আমেরিকার কাছ থেকে। এমনকি ১৯৪৫ সালে ব্রিটেনের মোট ঋণ তাদের GDP-কে ছাড়িয়ে যায়। সাম্রাজ্য রক্ষা করার মতো আর্থিক শক্তি আর অবশিষ্ট ছিল না।
এবার একবার ভেবে দেখুন আমরা কোন সময়ের কথা বলছি। আমরা কথা বলছি সেই সেই সময় নিয়ে, যখন ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল খোদ ব্রিটিশরাই। বড় কোনও যুদ্ধ ছাড়াই তারা ত্যাগ করেছিল ২০০ বছরের রাজত্ব। তাহলে সত্যিই কি ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল? নাকি আর্থিক কারণের জন্য ভারতকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়েছিল ব্রিটিশরাই? যদি এই বিষয়ে বিস্তারিত ভিডিও চান, তাহলে কমেন্ট করুন – INDIA। যদি ৫০০ জন কমেন্টে INDIA লেখেন, তাহলে আমরা এই বিষয়ে আলাদা একটি ডিকোড ভিডিও করবো।
স্টেজ ৪: একের পর এক উপনিবেশ হারানো
এরপর ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে ভারত, আফ্রিকা, মিডল ইস্ট, সাউথ-ইস্ট এশিয়া, ক্যারিবিয়ানের একাধিক উপনিবেশ হারায় ব্রিটেন। ফলে সেই দেশগুলি থেকে আয় এবং সম্পদের আমদানি বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। যার ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কার্যত ইতিহাসে পরিণত হয়।
স্টেজ ৫: পাউন্ড স্টার্লিংয়ের পতন
১৯৪০ সালে ১ পাউন্ডের মূল্য ছিল ৪ ডলারেরও বেশি। কিন্তু, ১৯৭০ সালে ১ পাউন্ডের মূল্য পড়ে যায় ২.৪৫ ডলার। পাউন্ড গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি থেকে সাধারণ আঞ্চলিক কারেন্সিতে নেমে আসে। বিশ্ব অর্থনীতির নেতৃত্ব চলে যেতে থাকে আমেরিকার হাতে।
৩। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন
সালটা ১৯৯১। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বৃহৎ শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে খুব কম সময়ের মধ্যেই তারা বানিয়ে ফেলে নিউক্লিয়ার অস্ত্র, বাড়াতে থাকে বিশ্বব্যাপী প্রভাব, আর মহাকাশ জুড়ে ছেয়ে যায় স্যাটেলাইটের নেটওয়ার্ক। কিন্তু, মাত্র ৯০০ দিনের মধ্যে এই সবকিছুই ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দী সুপারপাওয়ার হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত – কমিউনিজম বা সাম্যবাদ হবে ভবিষ্যতের একমাত্র পথ এবং পুঁজিবাদ ধ্বংস হয়ে যাবে।
স্টেজ ১ – সামরিক শক্তির অতিরিক্ত বিস্তার
দেশের জিডিপি-র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ সেনার পিছনে খরচ করত সোভিয়েত ইউনিয়ন। যা ছিল আমেরিকার খরচের তিন গুণ। সারা বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব কমাতে তারা আফগানিস্থান থেকে কিউবা, ভিয়েতনাম থেকে পূর্ব ইউরোপ, উত্তর কোরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, ইথিওপিয়া সবজায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যা তাদের অর্থনীতির ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি করতে থাকে।
স্টেজ ২ – উৎপাদন ক্ষমতার পতন
স্পেন আর ব্রিটেনের মতো, একটা পর্যায়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের মানুষও হয়ে ওঠে কর্ম বিমুখ। অন্যদিকে, ১৯৭০ সালে সরকারের প্ল্যানিং শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়। তেলের টাকা ছাড়া আর কিছুই ছিল না তাদের। কারণ কিছুই উৎপাদন হত না সেই দেশে, কৃষি ব্যর্থ হতে থাকে, প্রযুক্তি পিছিয়ে যেতে থাকে। ফলে, বাড়তে থাকে আমদানি, আর পড়তে থাকে কারেন্সির মান।
স্টেজ ৩ – ধ্বংস হয় অর্থনীতি
স্পেনের রিয়াল হোক বা ব্রিটেনের পাউণ্ড – সবই একটা সময়ে গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সি ছিল। কিন্তু রাশিয়ার রুবেল কোনওদিনই তা ছিল না। তাই তারা বিদেশী পণ্য কেনার জন্য দেশের সোনা আর তেল ব্যবহার করতো। এরপর ১৯৮৫ সালে বিশ্ববাজারে তেলের দামে পতন ঘটলে তাদের হাতে প্রকৃত অর্থের টান পড়ে এবং অর্থনীতি এক প্রকার ধ্বংস হয়ে যায়।
স্টেজ – ৪ – হারাতে থাকে একের পর এক দেশে প্রভাব
১৯৮৯ সালে, আর্থিক কারণে ধীরে ধীরে ইস্টার্ন ইউরোপ সহ পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোশ্লোভিয়া, রোমানিয়া, ইস্ট জার্মানি সব জায়গায় নিজেদের প্রভাব হারাতে শুরু করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। ফলে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতা কমতে থাকে।
স্টেজ – ৫ – চূড়ান্ত পতন
এরপর ১৯৯১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর, সোভিয়েত ইউনিয়ন সুপারপাওয়ার থেকে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ে। কোনও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ নয়, কোনও বিদেশী আক্রমণ নয়, নিছক অভ্যন্তরীন দেউলিয়ার কারণে ৩০,০০০ পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক এই শক্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আর তারপরেই জন্ম হয় রাশিয়া, ইউক্রেনের মতো একাধিক দেশের।
এবার পতনের মুখে আমেরিকা!
জানলে অবাক হবেন, বর্তমানে আমেরিকাও হুবহু সেই একই প্যাটার্ন অনুসরণ করছে।
আগের যে তিন সাম্রাজ্যের কথা আমরা বললাম, তাদের পতন হয়তো আপনাদের চোখের সামনে ঘটেনি। কিন্তু আমেরিকার পতন হয়তো আপনি চাক্ষুষ দেখতে পাবেন। বর্তমানে আমেরিকা সারা বিশ্বের মূল সুপার পাওয়ার দেশ।
স্টেজ ১ – সামরিক শক্তির অতিরিক্ত বিস্তার
আমেরিকা বরাবরই সারা বিশ্বে কমিউনিজম আটকানোর চেষ্টা করে এসেছে। তাই কমিউনিস্ট রাষ্ট্র রাশিয়া আর চিন বরাবরই তাদের চক্ষুশূল। তাই, কমিউনিজম ঠেকাতে, আর নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারাও নিজেদের সামরিক খাতে ঢেলেছে অফুরন্ত অর্থ।
বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে আমেরিকার ৭৫০টি মিলিটারি বেস রয়েছে। যা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যখন শক্তির শিখরে ছিল তার থেকেও বেশি।
কিন্তু, তাদের অস্ত্র পুরানো হচ্ছে, সৈন্য সংকট দেখা দিচ্ছে, এমনকি নিজেদের প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করতে পারছে না। একদিকে চিন–রাশিয়া–ইরানকে ঠেকানো, অন্যদিকে ইউরোপ ও এশিয়াকে রক্ষা—দুটোই একসাথে করা প্রায় অসম্ভব।
আমেরিকার বর্তমান সেনা বাজেট বার্ষিক ৮৫০ বিলিয়ন ডলার। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক পল কেনেডির মতে, সামরিক ব্যয়ের ধারাবাহিকতা একটি বড় শক্তির পতনের প্রধান কারণ। ২০১৭ সালে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধে আমেরিকার খরচ হয়েছিল আনুমানিক ৪.৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মার্কিন পতনের একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হবে ইতিহাসের পাতায়।
স্টেজ ২ – কারেন্সির মান অবমুল্যায়ন
সালটা ১৯৭১। আমেরিকার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিক্সন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড বাতিল করেন, আর ডলার পুরোপুরি ফিয়াট কারেন্সি হয়ে যায়। ফিয়াট কারেন্সি ব্যবস্থায়, দেশের কারেন্সি আর সোনার ওপর নয় বরং সরকারের ওপর নির্ভরশীল হয়। সরকার নিজের মতো টাকা ছাপাতে পারবে ঠিকই, কিন্তু, যথেচ্ছ টাকা ছাপালে তার মূল্য পড়তে শুরু করবে।
১৯৭১ থেকে আজ পর্যন্ত ডলারের ক্রয়ক্ষমতা ৯৮% কমেছে। ২০২০ সালের পর থেকে ৬ ট্রিলিয়ন ডলার নতুন টাকা ছাপানো হয়েছে। গ্লোবাল রিজার্ভ কারেন্সিতে ডলারের অংশ ২০০০ সালে ছিল ৭০%, বর্তমানে তা নেমেছে ৫৩%-এ।
স্টেজ ৩ – ঋণের ফাঁদ
বর্তমানে আমেরিকার ঋণের পরিমাণ রয়েছে ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার। যা দেশের জিডিপি-র ১২০ শতাংশ। আমেরিকা প্রতি বছর ঋণের সুদ বাবদ খরচ করে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। যা তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়েও বেশি। এরাও আগের সুপারপাওয়ার দেশগুলির মতো পুরানো ঋণ মেটাতে নতুন ঋণ নিচ্ছে আমেরিকা।
স্টেজ ৪ – উৎপাদন ক্ষমতার হ্রাস
আমেরিকা এখন আর উৎপাদন করে না, তারা শুধু ভোগ করে। তাদের উৎপাদন ভারত, চিন, মেক্সিকো, আর ভিয়েতনামের উপর নির্ভরশীল। ২০২৪ সালে আমেরিকা আমদানি করেছে ৪.১ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর রপ্তানি করেছে মাত্র ২.০৬ ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য। আর এই অসমতা মেটাতেই বর্তমানে শুল্ক যুদ্ধ শুরু করেছে আমেরিকা। কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হচ্ছে বেশি।
স্টেজ ৫ – সামাজিক ক্ষয়
আমেরিকার আজ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর মানুষের বিশ্বাস তলানিতে। অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে, বাড়ছে গৃহহীনতা। মাদকের প্রকোপে মৃত্যুর সংখ্যা বার্ষিক ১ লক্ষ ছাড়িয়েছে। রাজনৈতিক মেরুকরণ দেশের লোকের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করছে। যার ফলে ভেঙে পড়েছে সামাজিক অবকাঠামো।
স্টেজ ৬ – স্ট্যাটাস হারাচ্ছে রিজার্ভ কারেন্সি
বিশ্বের অন্যান্য দেশ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডলারের বিকল্প খুঁজছে। অন্যদিকে, BRICS শক্তিশালী হচ্ছে। সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কগুলো ডলারের পরিবর্তে সোনা কিনছে। জ্বালানি বাণিজ্যে ইউয়ানের ব্যবহার বাড়ছে। আর সেটা হয়ে গেলে ডলারও একটি আঞ্চলিক কারেন্সিতে পরিণত হবে। সব দেশ যখন ডলার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, ঠিক তখন আমেরিকাতেই জমা হবে ডলারের পাহাড়। ফলে ডলারের মূল্য আরও কমে যাবে।
সম্প্রতি ট্রাম্পের নির্বিচার এবং খামখেয়ালি নিষেধাজ্ঞা অন্য দেশকে ভাবতে বাধ্য করেছে – ডলার রিজার্ভ নিয়ে। এমনকি রাশিয়ার ৬০০ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যান করে দেওয়া হয়েছে। তাই অন্যান্য দেশ ভাবছে যদি তাদের সাথেও এমন হয়? তাই তারা নিজেদের ডলার রিজার্ভ কমাচ্ছে আর বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা খুঁজছে।
স্টেজ ৭ – সম্পূর্ণ ধ্বংস
দেশের রিজার্ভ কারেন্সি ব্যর্থ হলে, ঋণ পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, পুরানো ঋণ শোধ হয় না, সেনাদের বেতন কিংবা রসদ দেওয়া যায় না, দেশ দেউলিয়ার মুখে যায়, আর তখন পতন আর ধীর গতিতে হয় না। আকস্মিকভাবেই হুরমুড়িয়ে ধসে পড়ে একটি সুপারপাওয়ার।
তবে ব্রিটেন আর স্পেনের পতনের ক্ষেত্রে যা দেখা যায়নি, সেই জিনিস দেখা যাচ্ছে আমেরিকার ক্ষেত্রে।
ব্রিটেন, স্পেন বা রাশিয়া তারা কখনোই নিজের বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক খারাপ করেনি। কিন্তু, আজ ট্রাম্পের খামখেয়ালিপোনায় আমেরিকার বন্ধুত্ব নষ্ট হচ্ছে ভারত সহ ইউরোপ এবং NATO-র দেশগুলির সাথে। কারণ একদিকে আমেরিকা দখল করতে চাইছে গ্রিনল্যান্ড, আর অন্যদিকে NATO-র আট দেশ করছে এর বিরোধিতা। এছাড়া, কখনও ট্যারিফ চাপিয়ে এবং আবার কখনও জোট দেশগুলিতে বেস রাখার জন্য টাকা দাবি করছে আমেরিকা। যার ফলে, একসময়ের ভালো সম্পর্ক আজ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
তথ্য বলছে –আমেরিকার সামগ্রিক অর্থনীতি বড় মনে হলেও সাধারণ আমেরিকানদের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। দেশের সামাজিক কাঠামো এমনভাবে ভেঙে পড়েছে যা আর মেরামত করা সম্ভব নয়। আমেরিকায় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয়ের বৈষম্য এখন সর্বোচ্চ।
প্রথমে পতন দেখা যায় না, কারণ টাকার পাহাড় থাকে, সেনাবাহিনী সব যুদ্ধে জয়ী হতে থাকে, আর সরকার নিজেদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। কিন্তু তলে তলে পতন হতে থাকে। সম্পদের ব্যাপক অপব্যবহার হচ্ছে, ঋণ বাড়ছে, উৎপাদন ক্ষমতা কমছে, দেশের মেধাবী আর জ্ঞানী লোকেরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে দেশ ছাড়ছে, মিত্র দেশগুলো দূরত্ব বাড়াচ্ছে, পক্ষ বদলাচ্ছে। ট্রেড পার্টনাররা নতুন বিকল্প খুঁজছে। আর রিজার্ভ কারেন্সির ক্ষয় হচ্ছে।
তাই আমেরিকার পতন এখন সময়ের অপেক্ষা – হয়তো ১০ বছর, নয়তো ৫ বছর, কিংবা ৩ বছর, সেই দিন আসছে কেউ দেখতে না পেলেও।
মাথা চাড়া দিচ্ছে বিশ্বের পরবর্তী সুপারপাওয়ার দেশ!
ঠিক আমেরিকা যখন সুপারপাওয়ার হারাতে বসেছে, ঠিক একই সময়ে বিশ্বের দরবারে এক ইতিহাস তৈরি করছে চিন। গত ৪০-৫০ বছরে চিন একটি দরিদ্র দেশ থেকে যেভাবে দ্বিতীয় অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, সেই যাত্রা খুব একটা সহজ নয়। চিন বিশ্ববাণিজ্য আর অর্থনৈতিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমেরিকাকে ইতিমধ্যেই পিছনে ফেলেছে। ১৯৯০ সালে বিশ্ব বাণিজ্যে আমেরিকার শেয়ার ছিল চিনের দ্বিগুণ। আর আজ চিনের শেয়ার আমেরিকা চেয়েও বেশি।
যার ফলে পতনশীল আর উদীয়মান শক্তির সংঘাত দেখা যাচ্ছে ভূ-রাজনীতিতে। ট্রেড ওয়ার থেকে শুরু করে টেকনোলজিক্যাল ওয়ার সবক্ষেত্রে চলছে লড়াই। আর সেই লড়াই ততদিন টিকবে, যতদিন ডলারের আধিপত্য থাকবে।
আর বিশ্বের সমস্ত সুপার পাওয়ারই ভেবেছিল তারা ব্যাতিক্রম। ভেবেছিল ইতিহাসের এই প্যাটার্ন তাদের ওপর খাটবে না। কিন্তু, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আর এই প্যাটার্ন চলে গাণীতিকভাবে। যেমন অঙ্কে হিসাবের বাইরে কিছু করা যায় না, তেমনই দেশের ক্ষেত্রেও আপনি সীমার বাইরে খরচ করতে পারবেন না। উৎপাদন বাদ দিয়ে দেশ চালাতে পারবে না।
তাই আপনাদের কী মনে হয় – আমেরিকা কী আর সুপারপাওয়ার তকমা ধরে রাখতে পারবে? নাকি খুব শীঘ্রই তারা ভেঙে পড়বে? আর আমেরিকা ধংস হলে তার সবচেয়ে বেশী দায় কার -ট্রাম্পের না অন্য কারোর? জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত কমেন্ট করে।