India Hood Decode: তেল নয়, এই কারণেই ভেনেজুয়েলাকে কবজা করল আমেরিকা!

Venezuela
Venezuela

দিনটা ৩রা জানুয়ারি। ঠিক রাত্রি ২টোর সময়, হঠাৎ করেই বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল ভেনেজুয়েলার (Venezuela) রাজধানী কারাকাস। তারপরেই এক এক করে মোট ৭টি জায়গায় চলল বিস্ফোরণ। এর ঠিক কিছুক্ষণ পর হঠাৎ ডোনাল্ড ট্রাম্প টুইট করে জানালেন, ভেনেজুয়েলায় এয়ার স্ট্রাইক চালিয়েছে আমেরিকান সেনা। শুধু তাই নয়, বিশেষ অভিযান চালিয়ে বন্দী করে আমেরিকায় আনা হয়েছে ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। এবার ভেনেজুয়েলায় সরকার চালাবে আমেরিকা। এই টুইট দেখে এক প্রকার হতভম্ব হয়ে পড়ে সারা বিশ্ব। বড় কোনও যুদ্ধ নয়, বিশাল কোনও ধ্বংস নয়,  ২০২৬-এ এসে এক রাতেই একটি দেশকে সম্পূর্ণরূপে কবজা করে নিল আমেরিকা। মনে করিয়ে দিল ২০০ বছর আগের সেই ব্রিটিশ আধিপত্যকে। এই ঘটনায় যেমন নিন্দা জানাচ্ছে একাধিক দেশ, তেমনই অনেকেই বলছে – আমেরিকা যা করেছে বেশ করেছে!

কিন্তু যে দেশের অর্থনীতি একেবারে ধ্বংস, মানুষ খেতে পায় না ভালো করে, হঠাৎ সেই ভেনেজুয়েলাতেই কেন আক্রমণ করল আমেরিকা? কেনই বা বন্দী করল সেই দেশের রাষ্ট্রপতিকে? কেনই বা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরোকে পেশ করা হবে আমেরিকার আদালতে? এই সব নাটকের পেছনে আসল উদ্দেশ্যটা কী ট্রাম্পের?

আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো কীভাবে অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ একটি দেশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে শুধুমাত্র ভুল সিদ্ধান্তের কারণে! তুলে ধরবো একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে কালো অধ্যায় নিয়ে! আপনি যদি নতুন দর্শক হন তাহলে ঝটপট ক্লিক করে দিন সাবস্ক্রাইব বাটনে।

গোড়ার দিকে ভেনেজুয়েলা আর আমেরিকার সম্পর্ক ছিল খুবই মধুর!

শুরু থেকেই শুরু করা যাক, যখন আমেরিকা আর ভেনেজুয়েলার সম্পর্ক ছিল সারা বিশ্বের মধ্যে আলোচনার বিষয়। যখন ভেনেজুয়েলা ছিল বিশ্বের চতুর্থ ধনী দেশ।

সালটা ১৯২০। যখন ভেনেজুয়েলায় চলত একতন্ত্র সরকার। আর আমেরিকা ছিল ভেনেজুয়েলার সর্বোচ্চ তেল ক্রয়কারী দেশ। সম্পর্ক ছিল খুবই ভালো। ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি হচ্ছিল উন্নত। ১৯৫০-এর দিকে ভেনেজুয়েলার লোক এতটাই ধনী হয়েছিল, যে তারা শুধুমাত্র কেনাকাটা করার জন্য আমেরিকা যাত্রা করতো।

এরপর সালটা ১৯৫৮। তখন সারা বিশ্বে চলছে ঠাণ্ডা যুদ্ধ। আর ভেনেজুয়েলায় আসে গণতন্ত্র। কিন্তু, ভেনেজুয়েলার থেকে আমেরিকার তেল কেনা চলতে থাকে আগের মতোই। এমনকি দেখা যায়, আমেরিকা শুধু তেল কিনছেই না, বরং তেল উত্তোলনের জন্য সেখানের তেল খাত স্থাপনে আমেরিকা সাহায্যও করেছে। বেসরকারি আমেরিকান কোম্পানি সেখানে ঝড়ের গতিতে পাহাড়সম বিনিয়োগ করছে। ফলত, আমেরিকা আর ভেনেজুয়েলার মধ্যে বন্ধুত্ব আরও গাড় হতে থাকে। তখন লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশ যা কল্পনাও করতে পারতো না, তা করে দেখাচ্ছিল ভেনেজুয়েলা।

আমেরিকার মিলিটারি মিশন পরিচালিত হচ্ছিল ভেনেজুয়েলার বেস থেকে। ভেনেজুয়েলার পাইলট ও সেনাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল আমেরিকা। একযোগে চলছিল সেনা মহড়া, হচ্ছিল ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং, মাদক চক্রের বিরুদ্ধে অপারেশন। এমনকি সেই সময়ে ভেনেজুয়েলাকে উন্নত মানের ২৪টি এফ-১৬ যুদ্ধ বিমানও বেচে আমেরিকা।

কিন্তু, সমস্যা শুরু হয় এরপর থেকেই। চোখে কাপড় বেঁধে তেল বিক্রির ফলে দেশের মধ্যে ডলারের জোয়ার আসতে শুরু করে ঠিকই, কিন্তু পড়তে থাকে দেশীয় মুদ্রার দাম। দ্রুতবেগে হতে থাকে মূল্যবৃদ্ধি।

এসবের হাত থেকে বাঁচতে ১৯৭৬ সালে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন রাষ্ট্রপতি কার্লোস আন্দ্রেস পেরেজ তেল শিল্পকে সরকারি করে দেয়। ফলে আমেরিকা কিছুটা ধাক্কা খায়। তবে, সবকিছুই হচ্ছিল আমেরিকার ইচ্ছা মতোই। অন্যদিকে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি যেন চাঙ্গা হওয়ার নামই নিচ্ছিল না। আর এই সময়ে ত্রাতা হয়ে উঠে আসেন হুগো শ্যাভেজ

সম্পর্কে চিড় ধরা শুরু হয় আমেরিকা আর ভেনেজুয়েলার মধ্যে!

সালটা ১৯৯৮। দেশের রাষ্ট্রপতি হন হুগো শ্যাভেজ। ওয়াশিংটনের সাথে বন্ধুত্ব, বিদেশি প্রভাব – সবকিছুকেই প্রত্যাখ্যান করা শুরু করেন তিনি। যে মার্কিন সেনা এতদিন ভেনেজুয়েলার বেসে থাকতো, তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে বলেন। তাড়িয়ে দেয় আমেরিকান অ্যাম্বাসেডরকে। বন্ধ করে দেয় আমেরিকান চালিত এনজিও-কে। আর এই সমস্ত কর্মকাণ্ডের নাম দেন “বলিভেরিয়ান রেভোলিউশন”। কারণ, সিমন বলিভার নামের এক নেতা, লাতিনা আমেরিকার একাধিক দেশ যেমন – কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, পেরু, এবং বলিভিয়াকে স্পেনের উপনিবেশ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিলেন। ঠিক তেমনই শ্যাভেজ বলতেন তিনি ভেনেজুয়েলাকে আমেরিকার হাত থেকে বাঁচাচ্ছেন।

কিন্তু, এসবের উল্টো প্রভাব পড়তে থাকে। অস্ত্র হোক বা প্রযুক্তি – ভেনেজুয়েলার সমস্ত সরবরাহ বন্ধ করে দেয় আমেরিকা।

যার ফলে ভেনেজুয়েলা, বন্ধুত্ব শুরু করে রাশিয়া, চিন, ইরানের সাথে। কিন্তু, এরপর তেলের দাম বৃদ্ধি হতে থাকলে, ভেনেজুয়েলার অর্থনীতিতে জোয়ার আসে।

কিন্তু, সেই অর্থ দিয়ে জনতার সেবা করতে গিয়ে তিনি নিয়ে ফেলেন ভুল কিছু সিদ্ধান্ত।

প্রথমেই, তিনি অর্থ সঞ্চয় না করে, কোনও কাঠামো তৈরি না করে, উন্নতি না করে সমস্ত অর্থ খুলে দেয় দেশের মানুষের জন্য। ২০০৩ সালে দেশবাসীকে বিনামূল্যে খাবার, বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া শুরু করে। এইভাবে শ্যাভেজ মানুষের চোখে ভগবান হয়ে ওঠে। কিন্তু এর ফলে মানুষের মধ্যে কাজ করার প্রবণতা কমতে থাকে।

দ্বিতীয়ত, ২০০৮ সালে তিনি মূল্যবৃদ্ধি কমাতে ভেনেজুয়েলার কারেন্সি বলিভার থেকে তিনটি শূন্য বাদ দিয়ে দেন। আর নতুন কারেন্সির নাম দেন বলিভার ফুয়ের্তে (VEF)। যার ফলে সমান মুল্যে সেট হয়ে যায় ডলারের মূল্যও। আর এর ফলে, বিদেশি পণ্য জলের দরে বিক্রি হতে শুরু করে ভেনেজুয়েলায়। পরিস্থিতি এমন হয়ে যায়, যে বাইরের দেশ থেকে মাল কিনলে সস্তা পড়ত, কিন্তু দেশের মধ্যে তৈরি করলে তার দাম বেড়ে যেত। ফলত একের পর এক বন্ধ হতে থাকে কল-কারখানা, বন্ধ হতে থাকে কৃষি। বাড়তে থাকে বেকারত্ব। শত চেষ্টা করেও ধনী ও গরীবের মধ্যে দূরত্ব মেটাতে ব্যর্থ হয় সরকার।

তৃতীয়ত, শ্যাভেজ এই সমস্ত তেল রিফাইনারিজ থেকে প্রায় ১৮,০০০ কর্মচারী, ইঞ্জিনিয়ার, বিশেষজ্ঞ, ভৌগলিকদের কাজ থেকে সরিয়ে দেয়। কারণ ছিল, তারা শ্যাভেজের এই দান-খয়রাতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিল। শ্যাভেজ এদের সরিয়ে, এদের জায়গায় নিজের কাছের লোকেদের নিয়োগ করে। যাদের ছিল না কোনও অভিজ্ঞতা। ফলত, এক সময় যে তেল ছিল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতির মূল উৎস, তা পরিণত হয় দেশের ঋণের কারণ।

এরপর সালটা ২০১৩। ক্ষমতায় আসেন নিকোলাস মাদুরো। তার ক্ষমতায় আসার পরেই বিশ্বে তেলের মূল্য কমে যায়। ফলত ভেনেজুয়েলার কোষাগারে কমতে থাকে ডলার। কারণ, তেল ছাড়া আর কোন কিছুই বাইরে বিক্রি করতো না ভেনেজুয়েলা, যেহেতু আগেই কল-কারখানা, কৃষি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই দেশেও বাড়তে থাকে মন্দা। দেশে হাহাকার শুরু হয়।

২০১৭ সালে পরিস্থিতি এমন ছিল যে ১০টি পরিবারের মধ্যে ৯টি পরিবারের কাছে পর্যাপ্ত খাবার ছিল না। ফলত সরকার ২০১৮ সালে চোখ বন্ধ করে নোট ছাপানো শুরু করে। ফলে আরও বাড়তে থেকে মূল্য বৃদ্ধি। একসময় মূল্য বৃদ্ধি ১৭ লক্ষ শতাংশ বেড়ে যায়। অবস্থা এমন হয়ে গিয়েছিল, তখন ১ ডলারের সমান হয়ে উঠেছিল ভেনেজুয়েলার ৪১ লক্ষ বলিভার। আর এই সংকট থেকে বাঁচতে শ্যাভেজের দেখানো পথেই নিজেদের কারেন্সি থেকে আরও ৫টি শূন্য বাদ দেয় মাদুরো। আর নতুন কারেন্সির নাম দেন বলিভার সোবরানো (VES)। কিন্তু তাতেও লাভ হয় না কিছুই।

সরকার পড়তে পারে অনুমান করে, দেশের সেনাকে নিজের অধীনে নিতে শুরু করে মাদুরো। দেশের মধ্যে সেনা ছিল ১ লক্ষ ৩০ হাজার, যাদের মধ্যে ২০০০ জনকে জেনারেল পদ দিয়ে দেওয়া হয়। দেশের সেনাবাহিনীকে দেওয়া হয় অপরিসীম ক্ষমতা। ফলত জিনিসপত্রের উপরেও সেনাবাহিনীর অধিকার কায়েম হতে থাকে। জেনারেল পদে থাকা ব্যাক্তিরা সরকারী দামে বাইরে থেকে জিনিস আনাতো, আর সেগুলিকে কালোবাজারি করতো। দেশ ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছিল। ২০১৪ সালে জিডিপি ছিল -৩.৭ শতাংশ, ২০১৮ সালে তা হয় -১৯.৬ শতাংশ।

এরপর ২০২১ সালে ফের নিজেদের কারেন্সি থেকে আরও ৬টি শূন্য বাদ দেয় মাদুরো। আর নতুন কারেন্সির নাম দেয় বলিভার ডিজিটাল (VES)। এবার কারেন্সির নাম পরিবর্তন হলেও, সংকেত পরিবর্তন হয় না। ২০১৩ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে GDP ৭৫ শতাংশ পড়ে যায়। ২০২৪ সালে দেশে নির্বাচন এলে মাদুরো নিজের প্রতিপক্ষ মারিনা কোরিনা মাচাডোকে ভোটে লড়তে দেয় না।

এই অবস্থাকে আরও খারাপ করে, ভেনেজুয়েলা থেকে তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপায় আমেরিকা। ঠিক যেমনটা এখন রাশিয়ার ওপর চাপানো হচ্ছে। আবার অন্যদিকে, দেশের নিজস্ব কোনও প্রযুক্তি না থাকায় কমতে থাকে তেলের উত্তোলন। যেখানে ১৯৯৭ সালে দৈনিক ৩৫ লক্ষ ব্যারেল তেল উত্তোলন করতো ভেনেজুয়েলা, সেখানে এই সংখ্যা নেমে এসেছে দৈনিক ১০ লক্ষ ব্যারেলে।

কেন হঠাৎ রাগ বেড়ে গেল অ্যামেরিকার?

এর মধ্যেই ২০২০-র ২০শে মার্চ আমেরিকার বিচার বিভাগ, ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি মাদুরো এবং তাঁর ১৪ জন আধিকারিককে অভিযুক্ত করে। অভিযোগ, মাদুরো এবং ওই ১৪ জন ভেনেজুয়েলার ড্রাগ কার্টেল – কার্টেল ডে লস সোলেস-এর নেতৃত্ব দিচ্ছে। এবং এরা কলম্বিয়ার সাথে হাত মিলিয়ে আমেরিকায় কোকেন প্রবেশ করানোর চেষ্টা করছে। এরপরেই মাদুরোর ওপর ১৫ মিলিয়ন ডলারের মূল্য রাখা হয়।

পরবর্তীকালে ভেনেজুয়েলার নির্বাচনেও কারচুপি করার অভিযোগ ওঠে মাদুরোর বিরুদ্ধে। এমনকি ভেনেজুয়েলা ছেড়ে ভারী মাত্রায় লোক অবৈধভাবে আমেরিকায় প্রবেশ করছিল। যা আমেরিকার কাছে মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রিপোর্ট বলছে – ভেনেজুয়েলার জনসংখ্যা ৩ কোটি, কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে সেখান থেকে ৮০ লক্ষ মানুষ দেশ ছেড়েছে, বেশিরভাগ প্রবেশ করেছে আমেরিকায়।

এরপর ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মাদুরোর ওপর পুরস্কারের পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ মিলিয়ন ডলার করা হয়। এবং আগস্ট মাসে মূল্য বাড়িয়ে ৫০ মিলিয়ন ডলার করা হয়। এমনকি ওই মাসেই আমেরিকান ডিফেন্স – পেন্টাগনকে ট্রাম্প ক্ষমতা দেয় লাতিন আমেরিকার ড্রাগ কার্টেলের বিরুদ্ধে সরাসরি সেনা প্রয়োগের।

যার পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে এখনও পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার পার্শ্ববর্তী ক্যারিবিয়ান সাগরে প্রায় ২৬টি ভেসেলকে ড্রাগ পাচারে অভিযুক্ত করে হামলা চালিয়েছে আমেরিকা। যার ফলে নিহত হয়েছে প্রায় ১০০ জনেরও বেশি। কিন্তু,আশ্চর্যজনক বিষয় এদের মধ্যে কাউকেই ধরার চেষ্টা করেনি আমেরিকা, আর দিতে পারেনি ড্রাগ পাচারের কোনও প্রমাণ।

এরপর নভেম্বর মাসে, আমেরিকা বিশ্বের সবথেকে বড় এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ডকে ভেনেজুয়েলার কাছেই নিযুক্ত করে।

এরপর ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ট্রাম্প আর মাদুরোর মধ্যে ১৫ মিনিট ধরে ফোনে আলোচনা হয়। যেখানে ট্রাম্প, মাদুরোকে ভেনেজুয়েলা ছেড়ে চলে যেতে বলে। পরিবর্তে আমেরিকা মাদুরো ও তার পরিবারকে ছেড়ে দেবে। মাদুরো এসব মেনে নেওয়ার জন্য ট্রাম্পের সামনে তিনটি শর্ত রাখে। এক – ভবিষ্যতে মাদুরোর বিরুদ্ধে কোনও মামলা-মোকদ্দমা করা যাবে না। দুই, আন্তর্জাতিক ফৌজদারী কোর্ট যেন তাঁর ওপর থেকে সব চার্জ তুলে নেয়। আর তিন, যতদিন নির্বাচন না হবে, সরকার চালাবে তাঁর উপরাষ্ট্রপতি। কিন্তু ট্রাম্প এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেয়। এরপর ভেনেজুয়েলার ওপর বেসামরিক বিমানের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় অর্থাৎ নো ফ্লাই জোন ঘোষণা করা হয়। তেল বিক্রিতেও চাপানো হয় নতুন নিষেধাজ্ঞা।

আর নতুন বছরের শুরুতেই ৩রা জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় রাতের অন্ধকারে চালানো হয় অপারেশন অ্যাবসল্যুট রিসলভ। গ্রেফতার করা হয় মাদুরো আর তার স্ত্রী সিসিলিকে। তবে, এই কাজ কিন্তু সহজ ছিল না, কারণ ভেনেজুয়েলার কাছে ছিল রাশিয়ার সুখোই যুদ্ধ বিমান, উন্নতমানের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম আর লক্ষাধিক সেনা। এমনকি মাদুরো যে প্যালেসে থাকতেন তাও উন্নতমানের মিসাইল সুরক্ষা দিয়ে ঘেরা।

এই অসম্ভবকে সম্ভব করার জন্য আমেরিকা প্রয়োগ করেছে রাজনীতি, কূটনীতি আর প্রচুর পরিমাণ অর্থের। একদিনে বা কোনও একজন ব্যাক্তিকে দিয়ে এই কাজ সম্পন্ন হয়নি। পুরো ভেনেজুয়েলার সমস্ত শক্ত পিলারকে টার্গেট করে আমেরিকা। .

প্রথমে, আমেরিকা কিনে নেয় মাদুরো সরকারের নেতাদের। যারা কাল পর্যন্ত গালিগালাজ করছিল আমেরিকাকে, আজ তারা অনেকেই আমেরিকার পে-রোলে মুখ বন্ধ করে নেয়।

এরপরেই, মাদুরোর বিশ্বস্ত জেনারেল ও সেনাদের কিনে নেয় আমেরিকা। রিপোর্ট বলছে, আমেরিকা ভেনেজুয়েলার সেনাদের বোঝায় তারা আমেরিকার সেনার সামনে দাঁড়াতে পারবে না। হেরে যাওয়ার পর তাদের ওয়ার ক্রিমিনাল ঘোষণা করা হবে। কিন্তু যদি তারা চুপচাপ সরে যায়, আমেরিকা তাদের অনেক টাকা দেবে, আমেরিকায় অট্টালিকা দেবে।

আর সবশেষে, মাদুরোর বিশ্বস্ত সাংসদদের কিনে নেয় আমেরিকা।

অর্থাৎ এক কথায় যুদ্ধ না করে ছলে-বলে-কৌশলে সম্ভব করেছে ট্রাম্প

আদৌ কি সত্যি বলছে আমেরিকা?

এবার আমরা জানবো ভেনেজুয়েলার ওপর আনা আমেরিকার মাদক চক্রের অভিযোগ কতটা সত্য? ট্রাম্পের দাবি – মাদুরো কোনও বৈধ রাষ্ট্রপতি নয়, বরং তিনি একটি বিশাল মাদক পাচার চক্রের প্রধান। পাশাপাশি ট্রাম্পের দাবি – এই মাদকের জন্যই নাকি তার দেশের ৩০ কোটি মানুষ মারা গিয়েছে। (https://people.com/trump-incorrectly-claims-300-million-people-died-of-drug-overdoses-last-year-11812276)

একদিকে, আমেরিকার জনসংখ্যা ৩৪ কোটি, সেখানে ৩০ কোটি মানুষ ড্রাগের প্রভাবে মারা গিয়েছে এটা অসম্ভব।

অন্যদিকে, রিপোর্ট বলছে বিশ্বের বেশিরভাগ কোকেন তিন দেশে তৈরি হয়, কলম্বিয়া, পেরু, বলিভিয়া। অর্থাৎ ভেনেজুয়েলাকে এর জন্য দায়ী করা তথ্যের সাথে মেল খায় না। তথ্য বল্ছে বর্তমানে ভেনেজুয়েলা থেকে মাত্র ১০ শতাংশের কম ড্রাগ আমেরিকা আসে।

তবে, ২০২৫ সালের জুন মাসে, ভেনেজুয়েলার একজন প্রাক্তন জেনারেলকে আমেরিকায় অবৈধভাবে কোকেন পাচারের অভিযোগে অ্যামেরিকার আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়।

অর্থাৎ এই তথ্যটা কিছুটা হলেও অর্ধ সত্য কিংবা কম সত্য।

কিন্তু, অন্যদিকে যে সমস্ত দেশ যেমন – পেরু, বলিভিয়া, কলম্বিয়া, মেক্সিকো থেকে আদতে মাদক আসছে আমেরিকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নিল না কেন আমেরিকা?

তাহলে অ্যামেরিকার আসল উদ্দেশ্যটা কী? 

এতক্ষণ যা কিছু দেখলেন, এবার সেইসব বাদ দিয়ে আসা যাক মূল বিষয়ে।

প্রথমত, ভেনেজুয়েলা বিভিন্ন সম্পদে সমৃদ্ধ একটি দেশ। ভেনেজুয়েলায় সারা বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি তেল পাওয়া যায়। যার পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল। অন্যদিকে সৌদি আরবে রয়েছে মাত্র ২৬৭ বিলিয়ন ব্যারেল।

এছাড়াও, শুধু তেল নয়, লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে বেশি সোনা যদি কোনও দেশে থাকে সেটি হল ভেনেজুয়েলায়। সেখানের সেন্ট্রাল ব্যাঙ্কের কোষাগারে ১৬১ টন সোনা রাখা আছে। ভেনেজুয়েলায় এমন একটি সোনার ভাণ্ডার আছে যেখানে ৭০০০ টন সোনা চাপা পড়ে আছে। রয়েছে ১০০ বিলিয়ন ডলারের কোলটেন। যা ব্যবহৃত হয় মোবাইল, ল্যাপটপ এবং ইলেকট্রিক যানবাহনে। এবং এখানে ৩ বিলিয়ন ক্যারেটের হীরের উৎস আছে।

দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলা বারংবার গুয়ানার তেল ভাণ্ডারের কবজা নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল। কারণ সেই জায়গা নাকি আদতে ভেনেজুয়েলার। আর আমেরিকা নিজেদের হাত থেকে আরও একটি তেলে সমৃদ্ধ দেশ হারানো বরদাস্ত করতে পারতো না।

তৃতীয়ত, বিশ্বগুরু হওয়ার স্বপ্ন। ভেনেজুয়েলার এই তেল শিল্পের নিয়ন্ত্রণ পেলে, সারা বিশ্বের তেলের মুল্যের নিয়ন্ত্রণ পাবে আমেরিকা। যার ফলে লাতিন আমেরিকায় একদিকে কমবে চিন এবং রাশিয়ার প্রভাব। আর অন্যদিকে সারা বিশ্বে বাড়বে অ্যামেরিকার হুকুম।

চতুর্থত, আমেরিকার ডলার বাঁচানো। ভেনেজুয়েলা আমেরিকাকে তাড়ানোর পর নিজেদের তেলের ৮০ শতাংশই বিক্রি করতো চিনকে। আর তেলের দাম ডলারের পরিবর্তে চিনা ইউয়ান, রুশি রুবেল, পেট্রো এবং ক্রিপ্টোতে বেচা শুরু করেছিল, যা মেনে নিতে পারেনি ট্রাম্প।

পঞ্চমত, আমেরিকায় রয়েছে একাধিক ক্রুড তেল শোধন করার রিফাইনারিজ। আর এই ক্রুড তেলের ভাণ্ডার হচ্ছে ভেনেজুয়েলা। 

কিন্তু একটা দেশকে কবজা করে আদৌ কি ঠিক করছে আমেরিকা?

জাতি সংঘের সনদ ২-এর ধারা জানাচ্ছে, কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ বা বলপ্রয়োগের হুমকি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সনদের ধারা ৭ জানাচ্ছে, অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ। অপব্যবহার করা হয়েছে এই সনদের অনুচ্ছেদ ৫১ কেও। যেখানে বলা হয়েছে আগাম বা রাজনৈতিক অজুহাতে সশস্ত্র আক্রমণ করা যাবে না। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী – রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষার জন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চালানো যাবে না। পাশাপাশি আরও একাধিক আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করা হয়। অর্থাৎ, মাদুরো যতই খারাপ হোক জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতির এই গ্রেফতারি অবৈধ।

তবে, ট্রাম্প নিজের লক্ষ্যে কী আদৌ সফল হবে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পও নিজের লক্ষ্যে কিছুটা হলেও হোঁচট খাবে। কারণ এই ভেনেজুয়েলার যা অবস্থা সেখানে দৈনিক তেল উত্তোলন ৫ লক্ষ ব্যারেল বাড়াতে গেলেও, প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে, আর কাঠামো তৈরি করতে ২ বছর সময় লাগবে। দ্বিতীয়ত, সেই দেশের তেলের ওপর বর্তমানে সেনার অধিকার রয়েছে সেটাও তাদের থেকে ছিনিয়ে নিতে গেলে কিছুটা হলেও বেগ পেতে হবে ট্রাম্পকে। আর তৃতীয়ত, ভেনেজুয়েলার সব থেকে বড় তেল ক্রেতা এখন চিন। আর চিন সেখানের তেল খাতে বেশ কিছু বিনিয়োগ করেছে। তাই এখানে চিনের পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

তবে, ভারত ভেনেজুয়েলার থেকে ১ বিলিয়ন ডলার পায়। অনেকে মনে করছে, আমেরিকা যদি ভেনেজুয়েলা সরকার চালায় হয়তো সেই ঋণ শোধ করে দিতে পারে।

এখন আমেরিকা, ভেনেজুয়েলার সরকার চালানোর কথা বললেও, সেখানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে মাদুরোর উপরাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগেজ।

ভেনেজুয়েলার ওপর আমেরিকার এই আক্রমণ কতটা যুক্তিযুক্ত? আমেরিকা ঠিক করেছে না ভুল? আপনার কী মতামত?

Leave a Comment