India Hood Decode: ভারতের আসল ধুরন্দর, যার জন্য মিজোরাম ও সিকিম আজ ভারতের রাজ্য

Ajit Doval
Ajit Doval

ধুরন্দর – বর্তমানে যেমন বক্স অফিস কাঁপাচ্ছে, তেমনই মানুষের মনে তৈরি করেছে কৌতূহল। ভারতের ইতিহাসে এমন অনেক ধুরন্দরই রয়েছেন। কিন্তু, আপনি কি জানেন সেই ধুরন্দরের কথা, যিনি প্রায় ৭ বছর পাকিস্তানে ছিলেন ছদ্মবেশে! করেছেন একের পর এক অপারেশন। কখনও তাঁর ঠিকানা হত দরগা, আবার কখনও সেলুন। দুবার ধরা পড়তে গিয়েও, বেঁচেছেন কোনও মতে। দেশের বহু ধর্মীয় হিংসা রুখে দিয়েছেন কোনও বুলেট খরচ না করেই। মিজোরাম হোক বা সিকিম – এই দুটি রাজ্যই আজ ভারতের সাথে রয়েছে কেবলমাত্র তাঁর জন্যই। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক হোক কিংবা বালাকোট স্ট্রাইক – সবকিছুর পেছনে আসল মাস্টারমাইণ্ড তিনিই। কিন্তু, জানলে অবাক হবেন, একসময়ে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন কংগ্রেসের চোখের বিষ।

যদিও ৮০ বছর বয়সেও তাঁকেই দেশের চাণক্য মনে করেন অনেকে, অনেকে মনে করেন ভারতের জেমস বন্ড। হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন, তিনি আর কেউ নন – ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল (Ajit Doval)। আর, আমাদের মতে তিনিই আসল ধুরন্দর!

আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো অজিত ডোভালের এমন কিছু অপারেশন, এমন কিছু সিক্রেট ফাইলস, যা জানলে স্যালুট করতে বাধ্য হবেন আপনিও!

ছোট থেকেই বড় হয়েছেন সেনা ও রাজনীতির আঙিনায়!

দিনটা ১৯৪৫ সালের ২০শে জানুয়ারিউত্তরাখণ্ডের পরি গাড়োয়াল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন অজিত ডোভাল। বাবা ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মেজর জি.এন ডোভাল। তাঁর মা ছিলেন উত্তর প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এইচএন বাহুগুনা-র খুড়তুতো বোন। রাজস্থানের আজমের মিলিটারি স্কুল থেকে নিজের প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। এরপর ১৯৬৭ সালে আগ্রা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার ডিগ্রি লাভ করেন।

এরপর সালটা ১৯৬৮। বসেন UPSC পরীক্ষায়, আর প্রথম বারেই পাশ করে যান তিনি। এরপর আইপিএস-এর ট্রেনিং নিয়ে তিনি ওই বছরেই কেরলের কোট্টায়াম জেলার অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ হয়ে যান।

শুরু হল স্পাই ইউনিভার্সের যাত্রা!

এরপর দিনটা ১৯৭১ সালের ২৮শে ডিসেম্বরকেরালার কান্নুর জেলার থালাসেরায় হিন্দুদের একটি মিছিল বেরোয়। সেই মিছিল নুর জাহান নামের একটি হোটেলের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানে হঠাৎ করেই ওই হোটেলের প্রথম তলা থেকে জুতো  ফেলে দেয় এক ব্যাক্তি। যার কারণে শুরু হয় দাঙ্গা। পরিস্থিতি এক সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, যা পুলিশ থেকে শুরু করে বড় অফিসার কেউই সামাল দিতে পারছিলেন না। অবশেষে অনেক আলাপ-আলোচনার পর এই দাঙ্গা থামানোর জন্য বেছে নেওয়া হয় অজিত ডোভালকে। জানলে অবাক হবেন, ২৬ বছর বয়সের একজন অফিসার, মাত্র ৪ বছর সার্ভিসের অভিজ্ঞতা নিয়েই নিমেষে মিটিয়ে ফেলেন এই সমস্যা। যা দেখে অবাক হয়ে যান শীর্ষ অফিসাররাও। অজিত কোনও হিংসাত্মক উপায় অবলম্বন না করেই দুই ধর্মীয় গোষ্ঠীর নেতাকে চিহ্নিত করে, যারা এই দাঙ্গায় নেতৃত্ব দিচ্ছিল। এরপরে, তিনি তাদের সাথে কথা বলা শুরু করেন, শুরু করেন মধ্যস্ততা। আর  মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে কোনও বলপ্রয়োগ ছাড়াই দাঙ্গা থামিয়ে দেন।

নিয়োগ করা হয় গোয়েন্দা বিভাগে!

আর এর পরেই সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে অজিত ডোভালের এই কর্মকাণ্ডের কথা। নাম চলে যায় দিল্লিতেও। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। তিনি অজিতের গুরুত্ব বোঝেন, আর তাঁকে নিয়োগ করেন ইন্টালিজেন্স ব্যুরোর ডিরেক্ট অপারেশন উইংয়ে। নির্দেশ দেওয়া হয়, সারা ভারতে যা যা অপারেশন চলছে সবকিছুতে যেন অজিতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এভাবেই তাঁর প্রবেশ হয় গোয়েন্দা দুনিয়ায়।

Save Mizoram Operation

সালটা ১৯৬০। মিজোরাম ছিল আসামের অংশ। আর সেই সময় লাল ডেঙ্গা নামক এক ব্যাক্তির নেতৃত্বে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট অর্থাৎ MNF নামের একটি দল মিজোদের সমস্যা তুলে সরকারের সমালোচনা করতো। পাশাপাশি সেই সময়ে আসামে একটি নিয়ম করা হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল, যারা আসামি ভাষা বলতে পারে তারাই সরকারি চাকরি পাবে। অন্যদিকে, মিজো ব্যাটালিয়নদের সংখ্যা বেশি এমন দুটি আসাম রাইফেল রেজিমেন্টেকে ডিসমিস করে দেওয়া হয়। যার ফলে  রেগে গিয়ে এই দুটি গ্রুপের ৭ জন মুল কমান্ডো লাল ডেঙ্গার সাথে হাত মেলায়। ফলত আরও শক্তিশালী হয় MNF, এবং সাধারণ মানুষও এদের সমর্থন করতে শুরু করে। তারা আলাদা পতাকা নিয়ে নিজেদের আলাদা দেশ বলে দাবি করতে শুরু করে। আক্রমণ শুরু করে বিএসএফদের ওপর।

দীর্ঘ ১১ বছর ধরে সরকার কিছুই করতে পারছিল না। কিন্তু, অজিত ডোভাল এই সমস্যা সমাধান করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। তিনি প্রথমেই সমস্ত জায়গার রেকি করে নেন। খবর পান যে – লালডেঙ্গার মূল শক্তি ছিল ওই ৭ সেনা। আবার ওই ৭ সেনার সাথে লাল ডেঙ্গার বোঝাপড়ায় কিছু খামতি ছিল। এর সুযোগ নেয় অজিত। ধীরে ধীরে তিনি ওই ৭ কমান্ডের সাথে কথা বার্তা বলা শুরু করেন। এবং তাঁদের মদ খাওয়ার সঙ্গী হয়ে যান। এমনকি তাঁদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানান। এই সময় একটি মজার ঘটনা ঘটে। জানা যায়, ওই ৭ সেনার জন্য অজিতের স্ত্রী রান্না করছিলেন তখন তিনি জানতেন না যে তিনি মিলিট্যান্টের জন্য রান্না করছেন। এরপর অজিত প্রায় ২ বছর ধরে, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তাঁদের ব্রেন ওয়াশ করে। আর তাঁদের মধ্যে ৬ জনকে লাল ডেঙ্গার বিরুদ্ধে নিয়ে যান। যার ফলে লাল ডেঙ্গা ভারতের সাথে শান্তিচুক্তি করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীকালে সৈকত দত্ত নামের এক সাংবাদিক যখন লাল ডেঙ্গার সাক্ষাত নিয়েছিল, তখন লাল ডেঙ্গা জানিয়েছিলনে – অজিত আমার ৬ জন সেনা নিয়ে  নিয়েছিল, যার ফলে আমার কাছে আর কোনও রাস্তা ছিল না। এইভাবেই অজিত মিজোরামকে আলাদা দেশ হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল। পরে মিজোরামকে আলাদা রাজ্য করা হয় এবং লাল ডেঙ্গাকে ওই রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী বানিয়ে সেখানের সমস্যা সমাধানে সরকার সফল হয়। ভাবুন, ডোভাল যখন সার্ভিসে আসেনি, সেই থেকে চলা একটি সমস্যা, দায়িত্ব নিয়ে মাত্র দুই বছরের মধ্যে মিটিয়েছিলেন তিনি।

Save Sikkim Operation

এরপর সালটা ১৯৭৪। তখন সিকিম ছিল আলাদা একটি রাষ্ট্র। সেখানে রাজতন্ত্র চলছিল। রাজা ছিলেন পালদেন লামিয়াং। তিনি বিয়ে করেছিলেন হোপ ক্রুক নামের একজনকে অমেরিকানকে। বলা ভালো এটা ছিল আমেরিকার একটি হানি ট্র্যাপ। কারণ হোপ ছিল একজন সিআইএ এজেন্ট। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সিকিমকে আমেরিকার ইশারায় নাচানো। কিন্তু, ইন্দিরা গান্ধী সিকিমকে নিজেদের দিকে টানার জন্য R&W প্রধান আর.এন.কাও-কে সিকিমে পাঠান। তিনি দেখেন যদি সিকিমের ছোট ছোট পার্টিগুলোকে শক্তিশালী করে, মানুষের সমর্থন লাভ করা যায়, তবে রাজার বিরোধিতা করা যাবে এবং রাজতন্ত্র সরানো যাবে। আর এই কাজের জন্য ফের দায়িত্ব দেওয়া হওয়া অজিতকে। অজিত, প্ল্যান মাফিক সিকিম কংগ্রেস পার্টির প্রধান কাজী দর্জির সাথে মিলে সিকিমের মানুষকে নিজেদের দিকে আনা শুরু করে।

একসময় উদ্দেশ্য সফল হয়। মানুষ ধীরে ধীরে এই পার্টির সমর্থন করা শুরু করে। রাজার বিরোধিতা শুরু হয়। ফলত, চাপে পড়ে সিকিমে নির্বাচন করাতে বাধ্য হয় রাজা পালদেন। আর নির্বাচনে জিতে যান কাজী। আলাদা রাষ্ট্র হওয়ার কারণে সিকিমের প্রধানমন্ত্রী করা কাজীকে। এরপর প্ল্যান অনুযায়ী, কাজী রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রতিবেশী দেশ ভারতের কাছে সাহায্য চায়, জানায় – রাজা স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। ব্যাস, ইন্দিরা গান্ধী সৈন্য পাঠিয়ে রাজা ও রাজমহল সিজ করে দেয়। হোপ, পালদেনকে তালাক দিয়ে পালায়। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৪ই এপ্রিল সিকিমে রেফারেন্ডাম অর্থাৎ এক প্রকার ভোট করানো হয়। যেখানে ৯৭ শতাংশ মানুষ ভারতের সাথে জুড়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দেয়। এবং ১৯৭৫ সালের ১৬ই মে সিকিম, ভারতের সাথে জুড়ে যায়। রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হন কাজী। আর অজিত এই কাজের জন্য পায় প্রেসিডেন্ট পুলিশ মেডেল। ভারতে সাধারণত এই সম্মান ১৪ বছরের সার্ভিসের পর দেওয়া হয়। কিন্তু, অজিত মাত্র ৭ বছরেই সেই সম্মান পেয়ে যান।

Operation Kahuta

সালটা ১৯৭৪। ভারত নিউক্লিয়ার পরীক্ষা করে। দেখাদেখি পাকিস্তানও নিজেদের পাল্টা পরীক্ষা করার পদক্ষেপ নেয়। আর তাদের এই কাজে সহায়তা করতে শুরু করে চিন। দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এই পরীক্ষা আটকাতে বদ্ধ পরিকর হয়ে ওঠেন। আর ১৯৭৭ সালে শুরু হয় অপারেশন কাহুটা। লক্ষ্য – পাকিস্তানের সিক্রেট এই নিউক্লিয়ার মিশনের যাচাই করা। দায়িত্ব দেওয়া হয় – সেই অজিত ডোভালকে। তিনি বেশ কিছুদিন নিউক্লিয়ার প্লান্টের চারপাশে ঘুরে সমস্ত বিজ্ঞানীদের পরিচয় সংগ্রহ করেন। এবং তাঁদের পিছু নিয়ে তারা কোথায় যায়, কী করে, কোথায় সময় কাটায়, কোন দোকানে চুল কাটে, কোথায় খায় – সবকিছুর খোঁজ নেয়। এই ভাবেই একদিন অজিত এক বিজ্ঞানীকে ফলো করেন এবং একটি সেলুনে ঢুকে, কোনক্রমে ওই বিজ্ঞানীর চুল জোগাড় করে। আর পাঠিয়ে দেয় ভারতে। ভারতে সেই চুল পরীক্ষা করা হয়। এবং নিশ্চিত হওয়া যায় যে পাকিস্তানে নিউক্লিয়ার পরীক্ষা চলছে এবং ওই বিজ্ঞানি পরীক্ষার সাথে যুক্ত। কারন যে চুল পাঠানো হয়েছিল সেই চুলে রেডিয়েশনের চিহ্ন পাওয়া যায়। তবে তখন দেশের প্রধানমন্ত্রী আর ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন না, ছিলেন মোরারজি দেশাই। ভারত তখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিলেও, এই তথ্য লিক করে দেয়। আর এমন সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করার জন্য পাকিস্তানকে নিজেদের গবেষণা পিছোতে হয়।

এরপর আরও ৬ বছর পাকিস্তানে ছিলেন অজিত ডোভাল। তিনি ইসলামাবাদে ইন্ডিয়ান হাই কমিশনারের অফিসে অফিসার হিসাবে নিয়োগ হলেও, আদতে তিনি গুপ্তচর হিসাবেই কাজ করতেন। কারণ এই দীর্ঘ সময় ধরে তিনি পাকিস্তান থেকে ভারতে আরও অনেক তথ্য পাঠাতে শুরু করেন, যেমন জঙ্গি, আইএসআই, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কার্যকলাপ সম্পর্কে। তিনি যতদিন পাকিস্তানে ছিলেন, ততদিন পাকিস্তান আর নিউক্লিয়ার পরীক্ষা করতে পারেনি।

জানলে অবাক হবেন, পাকিস্তানে থাকাকালীন দুবার ধরা পড়তে পড়তে বেঁচে যান অজিত ডোভাল। প্রথমে একদিন তিনি লাহোরের একটি দরগায় কাওয়ালি শুনতে গিয়েছিলেন। সেখানে হঠাৎ করেই একজন তাকে পিছন থেকে বলেন – যে আপনার নকল দাড়ি খুলে যাচ্ছে। সেটা শুনে অজিত নিজের দায়িত্বহীনতার প্রতি লজ্জা পেয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান। এরপর আর একদিন একইরকমভাবে দরগায় গিয়েছিলেন অজিত। সেখানে একজন বয়স্ক মানুষ তাকে জিজ্ঞাসা করেন আপনি কি হিন্দু? অজিত বলে – না। তারপর ওই মুসলিম তাকে নিজের ঘরে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে বলে – তুমি একজন হিন্দু, কারণ তোমার কানে ফুটো রয়েছে। তখন অজিত ধামাচাপা দিতে বলে – ছোটবেলায় আমার কান ফুটো করা হয়েছিল, পরে মুসলিম হয়েছি। তখন ওই ব্যাক্তি বলে – তুমি এখনও মুসলিম হওনি, ভালো হয় যদি তুমি নিজের কানে প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে নাও। কারণ আমি নিজেও একজন হিন্দু।

Operation Black Thunder II

সালটা ১৯৮৪। স্বর্ণ মন্দিরে খালিস্তানে জঙ্গি অনুপ্রবেশ করে। আর সেই পরিপ্রেক্ষিতে ইন্দিরা গান্ধী চালান অপারেশন ব্লু স্টার। স্বর্ণ মন্দিরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় সেনা। যার ফলে শিখেরা ইন্দিরা গান্ধীর ওপর খুবই রেগে যান। আর ফল তো জানেনই, ইন্দিরা গান্ধীর দুই শিখ দেহরক্ষী তাঁকে হত্যা করেন।

কিন্তু, ১৯৮৮ সালেও এই একই সমস্যা আবার দেখা দেয়। খালিস্তান নামের আলাদা রাষ্ট্রের দাবি তোলে খালিস্তানি কমান্ডো ফোর্স, ভিন্ডারওয়ালের টাইগার ফোর্স অফ খালিস্তান, এবং বব্বর খালসার কিছু জঙ্গি। তারা সেই সময় আশ্রয় নেয় স্বর্ণ মন্দিরের ১৪ নং ঘরে। ইন্দিরার গান্ধীর মৃত্যুর পর দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন রাজীব গান্ধী। ইন্দিরা গান্ধীর পরিণতির কথা ভেবে রাজীব গান্ধী কিছুই করতে পারছিলেন না। একাধিক সিআরপিএফ মন্দির ঘিরে ফেললেও কেউই কোনও পদক্ষেপ নিতে পারছিল না। এই সময় ফের পাকিস্তান থেকে অজিতকে ডাকা হয়। আর সম্পূর্ণ মিশনের দায়িত্ব দেওয়া  হয় কেপিএস গিল এবং অজিত ডোভালকে। আর এই অপারেশনর নাম দেওয়া হয় অপারেশন ব্ল্যাক ঠাণ্ডার II

দায়িত্ব পেয়েই প্রথমে তথ্য জোগাড় করার জন্য একজন রিক্সাওয়ালার বেশে মন্দিরের আশেপাশে ঘুরে খবর জোগাড় করতে থাকে অজিত। এরপর সোজা ঢুকে যান মন্দিরের সেই ১৪ নং ঘরে। ইতিমধ্যেই পাকিস্তানে দীর্ঘদিন থাকার দরুন সেখানের টান আর উর্দু খুব ভালোভাবেই রপ্ত করেছিলেন অজিত। যার ফলে ভিতরে ঢুকেই জঙ্গীদের সাথে পাক আইএসআই এজেন্ট হিসাবে কথা বলা শুরু করেন তিনি। জানান, তাকে পাঠানো হয়েছে তাদের সাহায্য করার জন্য। তাঁদের বিশ্বাস জেতার জন্য অজিত বাইরে থাকা পুলিশদের সব অবস্থান জানিয়ে দেয়। এরপর তাঁদের বিশ্বাস যেমন অর্জন করে, তেমনই মাথায় কষে নেন তাঁদের বাগে আনার প্ল্যান। তিনি দেখেন যে মন্দিরের ভিতরে খুবই গরম ছিল। তাই বাইরে এসেই তিনি মন্দিরের জল, খাবার আর বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেন। প্ল্যান ছিল জল খাওয়ার বাহানায় জঙ্গিরা বাইরে এলেই তাদের নেতাকে মারা হবে। আর ১৫ই মে হয়েও গেল সেই কাজও। জঙ্গিদের শীর্ষ কমান্ডার জাগির সিং জল খাওয়ার জন্য বাইরে আসতেই পুলিশ স্নাইপার দিয়ে তাঁর মাথায় গুলি করে।

প্ল্যানের প্রথম অংশ সম্পন্ন হতেই ফের মন্দিরের ভিতরে যান অজিত। প্ল্যানের দ্বিতিয় অংশ হিসাবে এবার জঙ্গিদের আত্মসমর্পণ করতে বলেন। জানান – পর্যাপ্ত খাবার নেই, জল নেই, বিদ্যুৎ নেই, তাদের নেতাও আর নেই। তারা বেশিক্ষণ থাকতে পারবেন না। তাই তাদের আত্মসমর্পণ করার অর্ডার দেওয়া হয়েছে। যার ফলে ১৮ই মে বাকি জঙ্গিরা আত্মসমর্পণ করেন। ভাবুন কোনও অস্ত্র না তুলেই ফের একটি যুদ্ধ জয় করলেন অজিত। ভাবুন এর মধ্যে যদি একবারও জঙ্গিদের কেউ এই সন্দেহ করতো যে অজিত পাকিস্তানের কোনও এজেন্ট নয়, তাহলে কী হত! এই অপারেশনের জন্য, ১৯৮৯ সালে অজিতকে দ্বীতিয় সর্বোচ্চ পিস টাইম গ্যালান্ট্রি অ্যাওয়ার্ড কীর্তি চক্র দিয়ে সম্মানিত করা হয়।

এরপর কান্দাহার হাইজ্যাককারী পাকিস্তানি গ্রুপের সাথেও মধ্যস্থতা করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। এর মূল কারণ ছিল ১৯৭১ সাল থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে ১৫টি হাইজ্যাকের মধ্যস্ততাকারীর কাজ করেছিলেন অজিত ডোভাল। কিন্তু, কান্দাহার হাইজ্যাকে কিছুটা হলেও ব্যাকফুটে চলে যায় ভারত। ছাড়তে হয় মাসুদ আজহারকেও। যিনি এখন ভারত বিরোধী একাধিক আক্রমণ করে যাচ্ছে। অজিত ডোভাল এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে এই ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্যে একাধিক মাল্টি এজেন্সি সেন্টার, জয়েন্ট টাস্ক ফোর্স অন ইন্টালিজেন্স গঠন করেন।

এরপর হয়ে ওঠেন কংগ্রেসের চোখের বিষ

এরপর সালটা ২০০০। কাশ্মীরে তখন মুলত দুটি পার্টি ছিল – একটি শেখ আব্দুল্লাহর ন্যাশনাল কনফারেন্স। আর একটি মুফতি মহম্মদ সইদের ডেমোক্র্যাটিক ন্যাশনাল কনফারেন্স। কংগ্রেস চাইছিল কাশ্মীরে নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করতে। সেই লক্ষ্যে মুফতির সাথে হাত মিলিয়ে তাকে স্টেট ইউনিটের প্রেসিডেন্ট বানায় কংগ্রেস, এবং পরবর্তীতে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদ দেওয়া হয়। এছাড়া, কাশ্মীরে মুফতি জিতলে, তাকে মুখ্যমন্ত্রী করারও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

কিন্তু, সময় বেশি লাগছিল, আর কংগ্রেসের ধৈর্য ছিল না। যার ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই শেখ আব্দুল্লাহর সাথেও হাত মেলায় কংগ্রেস ও একসাথে নির্বাচনে লড়ে। আর এটা মুফতির ভালো লাগছিল না।

তখন দেশে ক্ষমতায় ছিল বিজেপি। আর বিজেপি দীর্ঘ সময় ধরেই চাইছিল কাশ্মীরে ফেরানোর। আর সেই জন্য চেস্তা চালাচ্ছিল ক্ষমতায় আসার। আর এই কঠিন কাজ সহজ করার জন্য, অজিতকে পাঠায় কাশ্মীরে। উদ্দেশ্য – এবার মুফতির মাধ্যমে কাশ্মীরে বিজেপির প্রসার ঘটানো। অজিত, মুফতির সাথে একাধিকবার মিটিং করে, বন্ধুত্ব করে এবং মুফতিকে জন মোর্চায় যোগদান করায়। আর কিছুদিন পরে কাশ্মীরে শুরু হয় নতুন পার্টি – পিপল’স ডেমোক্রেটিক পার্টি অর্থাৎ পিডিপি। যার ফলে কাশ্মীরের রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে যায়। যা কংগ্রেসের কাজে বাঁধা সৃষ্টি করে এবং কংগ্রেস রেগে যায় অজিতের ওপর। এই নিয়ে আইবি-র এবং R&W-র প্রাক্তন সেক্রেটারি নিজের বইতে লেখেন, কাশ্মীরে পিডিপি খোলার মুল মাথাই ছিল অজিত।

এরপর সময় আসে আইবি-র নতুন ডিরেক্টর করার। যার জন্য প্রথম পছন্দ ছিল অজিত ডোভাল। কিন্তু, সেই সময় দেশে বিজেপিকে হটিয়ে ফের ক্ষমতায় আসে কংগ্রেস। কংগ্রেস দেখে অজিত ছাড়া আর কাউকেই নতুন ডিরেক্টর করা যাবে না। কংগ্রেস সেটাই করে। কিন্তু, রাগ মেটানোর জন্য তাঁর মেয়াদ ২ বছরের জায়গায় ৮ মাস করে দেওয়া হয়। এরপর ২০০৫ সালে অজিত অবসর নেয়। কিন্তু, মজার বিষয় এর পরে যে ব্যাক্তি ডিরেক্টর হন, তাঁকে আবার দুই বছরের মেয়াদ দেওয়া হয়।

এরপর মোদীর নজরে পড়েন ডোভাল!

এরপর সালটা ২০০৮। গুজরাতের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অজিতকে প্রস্তাব দেন গুজরাতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় খোলার। যেখানে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, পুলিশ সায়েন্সের মতন বিষয়গুলি পড়ানো হবে। আর সেই উদ্দেশ্যে খোলা হয় রক্ষা শক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

এরপর ২০০৯ সালে ডোভালের পরিচয় হয়, আরএসএস-এর একনাথ রানাডের সাথে। যিনি স্বামী বিবেকানন্দের ভাবধারা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য চালাতেন বিবেকানন্দ কেন্দ্র। এর সাথেই বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউণ্ডেশন খোলেন অজিত। উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় নিরাপত্তা, কূটনীতি, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা, এবং বিশ্লেষণ করে ভারতকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করা।

২০১৪ সালে বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় এসে অজিত ডোভালকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদে বসায়। এরপর ওই বছরেরই জুন মাসে একটি চ্যালেঞ্জ আসে, যেখানে ইরাকে ৪৬ জন ভারতীয় নার্স আটক পড়ে যায়। অজিত সেখানে  গিয়ে তাঁদের ফিরিয়ে আনার প্ল্যানিং করে।

নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দাউদের মোকাবেলা হোক কিংবা মায়ানমার সমস্যা, উরির বদলা হোক কিংবা আর্টিকেল ৩৭০ – এখনও পর্যন্ত সব জিনিস নিজেই প্ল্যান করে এসেছেন তিনি।

তবে অজিত কিন্তু কোনও দিনই কোনও পার্টি ঘেঁষা ছিলেন না। কংগ্রেস তাঁকে জোর করে অবসর করানোর পরেও, তিনি বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসের সমর্থনে কথা বলেন। সেটা দেবযানী খোবড়াগড়ে হোক কিংবা বাংলাদেশের জমি সমস্যা।

কিন্তু, কংগ্রেস তার ওপর কালিমালিপ্ত করার সুযোগ ছাড়েনি কখনও।

আঙুল তোলে তার ছেলে শৌর্য ডোভালের দিকে। শৌর্য ছিলেন একজন ইনভেস্টার। তাঁর সিঙ্গাপুরে টর্চ ইনভেস্টমেন্ট নামের একটি কোম্পানি ছিল, যার কো-ফাউন্ডার ছিল সাইদ আলি আব্বাস। কংগ্রেস অভিযোগ জানিয়ে বলেন, বাবা একদিকে দেশের নিরাপত্তা সামলাচ্ছেন, আর ছেলে অন্যদিকে পাকিস্তানিদের সাথেই ব্যবসা করছে!

এছাড়া, অজিত ডোভালের সংস্থা বিবেকান্দ ফাউণ্ডেশনের বিভিন্ন সেমিনারের স্পন্সর আসত মূলত বিদেশ থেকে। যার মধ্যে ছিল – বোইং, ইজরায়েলের মগল সিকিউরিটি সিস্টেমের মতো বেশ কিছু কোম্পানি। যা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে যে এই সমস্ত কোম্পানি কোনও লাভ ছাড়াই  স্পন্সর কেন করবে? নিশ্চই কোনও দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে, কিংবা ভারতের কোনও লাভ নিচ্ছে তারা।

এরপর কংগ্রেস নেতা জয়রাম নরেশ, অজিতের আর এক ছেলে বিবেকের নামে অভিযোগ তোলেন। বলেন – নোটবন্দির ১৩ দিন পর, বিবেক কেম্যান আইল্যান্ডে গিয়ে একটি GNY এশিয়া নামের হেজ ফান্ড সংস্থা শুরু করেন। সেই আইল্যান্ডে ট্যাক্সের এত নিয়ম-কানুন নেই। কংগ্রেস নেতা পরোক্ষভাবে নোটবন্দী এবং হেজফান্ড সংস্থার শুরুর ঘটনাকে জুড়ে দেন। পরে ক্যারাভান ম্যাগাজিনেও এটা নিয়ে লেখা বেরোয়। যার পরে ওই ম্যাগাজিন এবং কংগ্রেস নেতার বিরুদ্ধে মানহানির কেস করেন অজিত। শেষ পর্যন্ত জয়রাম এবং ক্যারাভান দুজনকেই লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতে হয়।

একের পর এক অভিযোগ আসলেও, তিনি নিষ্ঠার সাথে সর্বদা দেশের হয়ে কাজ করে গিয়েছেম। একদিকে তিনি যেমন দেশকে বাঁচিয়েছেন বাইরের শত্রুদের থেকে আর একদিকে তিনি দেশকে বাঁচিয়েছেন ঘরের শত্রুদের থেকেও। সাথে রক্ষা করেছেন নিজের পরিবারকেও। তিনি দেশের জন্য বহুবার বাজি রেখেছেন নিজের প্রাণ। যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ঘটনা আমরা তুলে ধরেছি আপনাদের সামনে। অজিত ডোভালের জন্য অবশ্যই একবার কমেন্ট করুন “জয় হিন্দ” আর সঙ্গে জানান তাঁর সম্পর্কে আপনার গুরুত্বপূর্ণ মতামত।

Leave a Comment