২০০ বা ৫০০ কোটি নয়, পশ্চিমবঙ্গের বুকেই হয়েছে এক বিশাল বড় দুর্নীতি, অঙ্কটা ২৭৪২ কোটি! আর এই স্ক্যামের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গিয়েছে তৃণমূলের বর্তমান মেরুদন্ড তথা আইপ্যাক (IPAC)-এর নাম।
ফাইল বা প্রতীক জৈন নয়, আসল খেলাটা যে আরও অনেক বড় – সেটা প্রকাশ্যে এল কয়েকদিন গড়াতেই!
আসলে ভোটের স্ট্রাটেজি নয়, বরং দুর্নীতির টাকা নয়-ছয়ের তথ্য লোপাট করতেই এত কাণ্ড!
আর একথা আমরা বলছি না, বলছে রিপোর্ট!
ঠিক কী, এই ২৭৪২ কোটি টাকার স্ক্যাম? কারা যুক্ত রয়েছে এই স্ক্যামের সাথে? কীভাবে এই স্ক্যামের সাথে নাম জড়াল আইপ্যাকের? আইপ্যাককে বাঁচাতে গিয়ে কি এবার সত্যি ফেঁসে গেলেন মমতা?
জানলে অবাক হবেন সংবিধান অনুযায়ী, ED-র কাজে বাঁধা দেওয়ার জন্য জেল হতে পারে মুখ্যমন্ত্রী মমতার! গ্রেফতার হতে পারেন অরবিন্দ কেজরিওয়ালের স্টাইলেই!
একবার ভাবুন তো, এত কিছু জেনেও কেন এত বড় ঝুঁকি নিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
আজ India Hood ডিকোডে আমরা তুলে ধরবো এমন কিছু তথ্য, এমন কিছু সত্য যা জানলে চমকে যাবেন আপনিও!
প্রথমেই জানবো, কী এই ২৭৪২ কোটি টাকার স্ক্যাম?
যুগ যুগ ধরেই ভারতের ইতিহাসে অবৈধভাবে হয়ে আসছে কয়লার পাচার! আর সেই কয়লা পাচার থেকে রেহাই পায়নি পশ্চিমবঙ্গও। বছরের পর বছর ধরে বাংলার বুকে চলছিল কয়লার কালোবাজারি! আর সেই কালোবাজারি রুখতেই বহু বছর ধরে উঠে পড়ে লেগেছে ED! তদন্ত শুরু হতেই জানা যায় –
পশ্চিমবঙ্গের এই কয়লা স্ক্যামের কেন্দ্রে রয়েছে ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেড অর্থাৎ ECL, যেটি কোল ইন্ডিয়ার একটি সাবসিডারি কোম্পানি। আর এখানেই অবৈধভাবে চলছে কয়লার উত্তোলন, এবং কালোবাজারি। এই কাজ পরিচালিত হচ্ছে একটি সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে, যার নেতৃত্বে ছিলেন অনুপ মাজী।
এরপর ২০২০ সাল নাগাদ এই কেসে প্রথম সফলতা পায় ED, গ্রেফতার করা হয় অনুপ মাজীকে। আর ED-র তথ্য অনুযায়ী, এই গোটা স্ক্যামের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৭৪২.৩২ কোটি টাকা। কিন্তু একা কি এই কাজ করা সম্ভব ছিল অনুপের পক্ষে?
তদন্ত হতেই উঠে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য, এই কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে ছিলেন রাজ্য সরকারের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় পুলিশের বড় বড় মাথা, CISF কর্মী। শুধু তাই নয়, বেসরকারি সংস্থা সহ রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাও ছিল এই কালোবাজারির পেছনে।
যদি আপনারা পশ্চিমবঙ্গের এই কয়লা স্ক্যাম সম্পর্কে একটি বিস্তারিত জানতে চান,তাহলে কমেন্টে লিখুন – COAL SCAM। যদি ২০০ জন কমেন্টে COAL SCAM লেখেন আমরা এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত কন্টেন্ট করবো।
কিন্তু এখন প্রশ্ন, এই স্ক্যামের সাথে I-PAC জড়াল কীভাবে?
ED-র অভিযোগ অনুযায়ী – কয়লা পাচার কাণ্ডে যে ২৭৪২.৩২ টাকার স্ক্যাম হয়েছে, তার মধ্যে থেকে ২০ কোটি টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে I-PAC-কে দেওয়া হয়েছে।
আর অনুমান করা হচ্ছে, সেই টাকা ২০২১-২২ সালে গোয়া নির্বাচনে I-PAC ব্যবহার করেছে। আর এই টাকা আইপ্যাকের কাছে পৌঁছানোর জন্য জটিল হাওয়ালা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে R. Kanti Lal নামক এক সংস্থাকে পাঠানো হয়েছিল। আর সেখান থেকেই আইপ্যাকের সূত্র পায় ED।
আর এরপরেই I-PAC-এর অফিস, ও কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে রেড করার সিদ্ধান্ত নেয় ED।
এরপর ৮ই জানুয়ারি, এক বিরল ঘটনার সাক্ষী থাকল গোটা বাংলা!
সকাল ৬টা বেজে ৫ মিনিটে ED-র বেশ কয়েকজন অফিসার পৌঁছে যান কলকাতার সল্টলেকে। গন্তব্য – I-PAC-এর অফিস, ও কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি। ঠিক একইসাথে রেড চলছিল পশ্চিমবঙ্গের আরও ১০ জায়গায়। বেশ সুষ্ঠভাবেই চলছিল তল্লাশি।
কিন্তু, ঠিক কিছুক্ষণ পর, শুধু বাংলা নয় সারা ভারতে ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। এই রেডের মাঝেই রাজ্যের পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা এবং কলকাতা পুলিশের ডিজিপি রাজীব কুমারকে সঙ্গে নিয়ে সশরীরে পৌঁছে গেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। ED-র অফিসারদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিলেন বেশ কিছু ফাইল, হার্ডড্রাইভ আর ল্যাপটপ। এমনকি দেখা গেল – পুলিশ অফিসাররাও ফাইলের গোছা এনে রাখছেন মমতা বন্দ্যয়াপাধ্যায়ের গাড়িতে।
তবে, এখানেই শেষ হয়না ঘটনা। ওই সমস্ত জিনিস হাতে নিয়ে সটান মিডিয়ার সামনে উপস্থিত হন মুখ্যমন্ত্রী। বলেন – এগুলি আমার তথ্য। তদন্তের নামে আমার পার্টির তথ্য চুরি করা হচ্ছে। এবং এই তদন্তকে তিনি রাজনৈতিক রঙ দিয়ে বলেন, বিজেপি এই রেড করাচ্ছে।
এরপর, ED-র তরফ থেকে “নথি ছিনতাই করার অপরাধে” মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে একটি মামলা দায়ের করা হয়। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করা হয় ED-র তরফ থেকে। অন্যদিকে, ED-র বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেন মুখ্যমন্ত্রী। পরবর্তীকালে সেই মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টেও।
কিন্তু একবার ভেবে দেখুন তো – মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি বেসরকারী সংস্থার ফাইলের জন্য এত তামাশা করলেন কেন?
এর জন্য আপনাদের জানতে হবে আজকের দিনের নির্বাচনের সমীকরণ। বর্তমানে নির্বাচন কেবল ভাষণ দিয়ে নয়, বরং তথ্য দিয়ে জেতা হয়। আর সেই উদ্দেশ্যেই ২০২১ বিধানসভা নির্বাচনের আগে আইপ্যাক-এর সাথে জোট বাঁধে তৃণমূল। বর্তমানে আইপ্যাক-ই তৃণমূলের আসল নির্বাচন কৌশলী এবং উপদেষ্টা। একরকমভাবে বলা যায় আইপ্যাক হল তৃণমূলের ব্রেন।
যাদের কাছে থাকতে পারে ৭ কোটি ভোটারের তথ্য, অর্থাৎ কারা দলের কোন কাজে রেগে আছে, কোন গ্রামে কোন জাতির কত ভোটার রয়েছে? কাদেরকে কোন প্রতিশ্রুতি দিলে ভোট পাওয়া যাবে? আইপ্যাক-এর কাছে আরও থাকতে পারে দলের দুর্বলতা, দলের সবলতা, এমনকি কাকে আসন্ন নির্বাচনে টিকিট দেওয়া হবে, কাকে দেওয়া হবে না। কারা দলের কাজে রেগে আছে! ভোটের আগে দলের মাস্টারস্ট্রোক কী কী হতে চলেছে, কি স্কিম আনতে চলেছে, ঠিক একই রকম ভাবে থাকতে পারে – তৃণমূল কোথায় বিজ্ঞাপন চালাবে, কত টাকার বিজ্ঞাপন চালাবে, কোন ক্যাম্পেনে কত টাকা দেওয়া হবে – একরকমভাবে বলা যায় ২০২৬ সালের নির্বাচনের ব্লু প্রিন্ট থাকতে পারে আইপ্যাকের দপ্তরে ও তার কর্ণধারের বাড়িতে।
অর্থাৎ, এক রকমভাবে যদি তৃণমূল সুপ্রিমোর অভিযোগ মেনে নেওয়া হয়, তাহলে বলা যেতেই পারে – এই অফিস বিজেপির কাছে সোনার খাদানের থেকে কম কিছু ছিল না। আবার ED-র কথা মানলে, যেহেতু কয়লা কেলেঙ্কারির টাকা ব্যবহার করেই তৃণমূলের প্রচার চালাচ্ছিল I-PAC। তাই সেই সমস্ত টাকার খরচ, হিসাব, লেনদেন I-PAC-এর অফিস এবং কর্ণধারের বাড়িতেই পাওয়া সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, এর আগেও বহু ভোটে বাজিমাত করেছে আইপ্যাক-এর এই সমস্ত তথ্যই! এই আইপ্যাকের মূল কর্ণধার প্রশান্ত কিশোর হলেও, বর্তমানে তৃণমূলের নির্বাচন কৌশলী হয়ে কাজ করছেন এই সংস্থার অন্যতম কর্ণধার প্রতীক জৈন!
সারা দেশে এখন যত রাজনৈতিক উপদেষ্টা সংস্থা রয়েছে তাদের মধ্যে সবথেকে বড় এই আইপ্যাক। তারা কীভাবে এত বড় হল? অধিকাংশ ভোটে কীভাবে তারা বাজিমাত করে – যদি সেটি জানতে চান, তাহলে আই বাটনে ক্লিক করে দেখে নিন আমাদের – প্রশান্ত কিশোর স্পেশাল ডিকোড।
ভিডিওর শুরুতেই আমরা বলেছিলাম, ED-র কাজে বাঁধা দিয়ে সংবিধান অমান্য করেছেন মুখ্যমন্ত্রী! তাই এবার জেনে নেবো –
সত্যিই কী গ্রেফতার করা যেতে পারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে?
ED একটি কেন্দ্রীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, তাই সাংবিধানিকভাবে তারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত একজন মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করার জন্য। কিন্তু, সেদিন দেখা গেল, ED অফিসারদের হাত থেকে ফাইল ছিনিয়ে নিলেও তাঁকে কোনওভাবেই গ্রেফতার করল না ED
এখানেই আপনাকে জানতে হবে, বেশ কিছু বিষয়।
রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু একদমই ঘাসে মুখ দিয়ে চলা কোনও ব্যাক্তি নন। তিনি এটা জেনেই গিয়েছেন – এটা সেই ED যারা দিল্লির সিটিং মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করেছিল, যারা যে কোনও মুখ্যমন্ত্রীকে PMLA-র অধীনে গ্রেফতার করতে পারে।
আর মুখ্যমন্ত্রী এও জানতেন – PMLA মামলায় তল্লাশি চললেও, তদন্তকারীদের শারীরিকভাবে বাধা দেওয়া, তল্লাশির সময় নথি জোর করে কেড়ে নেওয়া, এবং তল্লাশি বা জেরায় বলপ্রয়োগ করা – PMLA-র অধীনে নয়, বরং এগুলো সাধারণ ফৌজদারি অপরাধ।
মুখ্যমন্ত্রী ভালোভাবেই জানতেন, যদি কোনও কাগজ মানি লন্ডারিং অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়, তাহলে তাঁকে PMLA-র অধীনে গ্রেফতার করা সম্ভব। তাই এখানে দুটো জিনিস হতে পারে –
১। তিনি জানতেন সেখানে মানি লন্ডারিংয়ের কাগজ আছে, আর তাই সেগুলো ED দেখার আগেই মুখ্যমন্ত্রী নিজের গাড়িতে তুলেছিলেন, অথবা
২। তিনি জানতেন এখানে কোনও মানি লন্ডারিংয়ের কাগজই নেই। তাই এটাকে রাজনৈতিক ঘটনা করে ফায়দা তোলা যাবে –
আর সেই জন্যই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন।
এখানে মুখ্যমন্ত্রী দোষ করেছেন, এটা সত্যি। আর তাই তাঁর বিরুদ্ধে খুব বেশি হলে IPC 186 অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীর কাজে বাধা, IPC 353 অর্থাৎ সরকারি কর্মচারীর ওপর বলপ্রয়োগ, IPC 379/378 অর্থাৎ নথি/জিনিস জোর করে নেওয়া, এবং IPC 201 অর্থাৎ প্রমাণ লোপাটের মতো ফৌজদারি অভিযোগ করা যাবে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে গ্রেফতার করতে পারে রাজ্য পুলিশ, ED নয়। ED শুধু অভিযোগ জানাতে পারবে ও আদালতে রিপোর্ট জমা দিতে পারবে।
কিন্তু্, এবার যদি ED আদালতে প্রমাণ করতে পারে, যেসমস্ত নথি কেড়ে নেওয়া হয়েছে সেগুলো কয়লা কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত, এবং প্রমাণ লোপাট বা তদন্ত ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে নথি কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী নিজেই মানি লন্ডারিং ষড়যন্ত্রের অংশ, তখন বিষয়টি PMLA ধারা 3-এর মধ্যে ধরা হবে।
তখন ED লিখিতভাবে PMLA ধারা 19 অনুযায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতার করতে পারবে।
অর্থাৎ এই মামলা নিয়ে বর্তমানে সরগরম রাজ্য রাজনীতি। একদিকে – কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা – সিবিআই এবং ED-র দাবি – কয়লা পাচার সহ পুরানো বিভিন্ন স্ক্যামের টাকা ব্যবহার করেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার আই-প্যাকের কনসাল্টেন্সি ফিস জোগাড় করেছে।
অন্যদিকে, বিশ্লেষকদের দাবি – এই রেডের আসল উদ্দেশ্য ছিল আইপ্যাকের ফান্ডিং লাইন কাটা। যাতে আইপ্যাকের কাছে রণনীতি তো থাকবে, কিন্তু মাঠে নেমে কাজ করার টাকা থাকবে না।
আপনার কী মনে হয় – তৃণমূল কী সত্যি কয়লা পাচারের সাথে যুক্ত? পাচারের টাকা লেনদেনের তথ্য লোপাট করার জন্যই কী ফাইল চুরি করলেন মমতা? সত্যি কী জেল হতে পারে মমতার? জানাতে ভুলবেন না কমেন্ট করে।