অনন্যা সরকার, আলিপুরদুয়ার: কথায় বলে, ইচ্ছাশক্তির জোরে সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকেই জয় করা যায়। যেমনটা করে দেখিয়েছেন আলিপুরদুয়ার শহর থেকে অন্তত ১২ কিলোমিটার দূরের তপসিখাতা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পাটকাপাড়া গ্রামের আদিবাসী তরুণী, বাবলি এক্কা। দারিদ্র্য এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে থাকার নানা প্রতিকূলতাকে জয় করে তিনি আজ ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণের পথে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেছেন (NEET UG Success Story of Babli Ekka)। ২৩ হাজার মানুষের এই ছোট গ্রামে গত ১৫ বছরে আর কোনো আদিবাসী ছাত্রী ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাননি। ইউটিউবের সাহায্য এবং নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে বাবলি সফলভাবে নিট (NEET) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এমবিবিএস (MBBS) কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। সোমবার থেকে বারাসত সরকারি মেডিকেল কলেজে তাঁর ক্লাস শুরু হয়েছে।
চরম আর্থিক সংকট ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে বাবলির স্বপ্নপূরণ
বাবলির এই সাফল্যে পাটকাপাড়া গ্রামের বাসিন্দারা অত্যন্ত আনন্দিত। তারা তাঁর সম্মানে একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করেছিলেন। স্থানীয় জমদ্বীপ ইউনিট ক্লাব বাবলিকে পড়াশোনার জন্য আর্থিকভাবে সাহায্য করবে বলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ক্লাবের সভাপতি ভূপেন বর্মন জানান, বাবলির এই সাফল্য ওই অঞ্চলের তরুণ-তরুণীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে। তিনি এ-ও বলেন যে, বাবলির পড়াশোনার পথে অর্থের অভাব যেন কোনো বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে ক্লাব তাঁর পাশে থাকবে।
বাবলির বাবা বিজয় এক্কা পেশায় একজন গাড়িচালক। তাঁর একার উপার্জনেই পুরো পরিবারের খরচ চলে। আর্থিক অনটনের কারণে বিজয় নিজে দশম শ্রেণির বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি, তবে মেয়ের জন্য তিনি শুরু থেকেই বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন। রবিবার ৬৫০ কিলোমিটার দূরে বারাসত সরকারি মেডিকেল কলেজের উদ্দেশ্যে যখন বাবলি রওনা দিচ্ছেন, তখন আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাবা। তিনি জানান, তাঁর সন্তান এমন কিছু অর্জন করেছে, যা তিনি নিজে কখনো করতে পারেননি।
আরও পড়ুন: স্কুলের ফি দেওয়ার ছিল না টাকা, আধপেটা খেয়ে বস্তির ছেলে জয়কুমার আজ নাসার ইঞ্জিনিয়ার
বাবলি পাটকাপাড়া হাই স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। তারপর জিতপুর হাই স্কুল থেকে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণি সম্পন্ন করেন। বড় কোনো কোচিং সেন্টারে পড়ার সামর্থ্য ছিল না, তাই তিনি বাড়িতে নিজেই পড়াশোনা করতেন। ইউটিউব ভিডিওর সাহায্য নিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছেন। এমন অনেক সময় এসেছে, যখন কোনো কঠিন বিষয় বুঝতে না পেরে তিনি কেঁদে ফেলেছেন, কিন্তু তাও তিনি কখনো হাল ছাড়ার কথা ভাবেননি। বাবলি এক্কা তাঁর এই সাফল্যের কৃতিত্ব বাবা-মা ও শিক্ষকদের দিয়েছেন। এখন তাঁর লক্ষ্য হল একজন দক্ষ ডাক্তার হয়ে আদিবাসী সম্প্রদায় ও অসহায় মানুষদের সেবা করা।
উল্লেখ্য, বনচুকামারির বাসিন্দা মতিলাল কুজুর জানান যে, গত ১৫ বছরে আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের কেউ ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পাননি। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষেই বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। আর বহু আদিবাসী মেয়েকেই মাঝপথেই পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হতে হয়। তাই বাবলির এই সাফল্য তাঁর নিজের গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী চা বাগান এলাকার বহু ছেলেমেয়ের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।