প্রীতি পোদ্দার, কলকাতা: মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) কথা দিয়েছিলেন যে বিধানসভায় তৃণমুলের আমলের দুর্নীতির রিপোর্ট পেশ করবেন, আর সেই অনুযায়ী গত শনিবার রাজ্য বিধানসভায় পেশ করা হয়েছে তৃণমূল জমানার পাঁচ বছরের দুর্নীতির হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত CAG রিপোর্ট (CAG Report During TMC Regime)। এদিন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ এই চার অর্থবর্ষের মোট ২৮টি ক্যাগ রিপোর্ট পেশ করেছিলেন। আর তাতেই তৃণমূল আমলের আমফান দুর্নীতি থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সাথী, যুবসাথী সহ যা যা দুর্নীতি হয়েছে, সবটাই তুলে ধরা হয়েছে।
আমফানে ফান্ড দুর্নীতি রাজ্যের
২০২০ সালের জুনে, করোনার সময়, রাজ্যের উপকূলীয় জেলাগুলি তছনছ করে দিয়েছিল অতি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আমফান। ঝড়ের দাপটে বিধ্বস্ত অবস্থায় পরিণত হয়েছিল সুন্দরবন এলাকা। আর সেই বিপর্যয় সামলাতে রাজ্য সরকার ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স ফান্ড থেকে ৩৫ হাজার ১৮ কোটি টাকার কেন্দ্রীয় সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গিয়েছে, রাজ্য মাত্র ২,৭০৭ হাজার ৭৭ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় সহায়তা পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং সেই অর্থই বরাদ্দ হয়েছিল রাজ্যের জন্য। ৯,২২৬ উপভোক্তাকে একাধিকবার বাড়ি তৈরির টাকা দেওয়া হয়েছে। যার অঙ্ক ১৮.০৭ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রের নির্দেশিকা লঙ্ঘন করে ২১৮.০৪ কোটি টাকা এসডিআরএফে’র বাইরে রাখা হয়েছিল, যার ফলে ৪.৫১ কোটি টাকার সুদের ক্ষতি হয়।
স্বাস্থ্যসাথী কার্ডের বিরুদ্ধে রয়েছে অজস্র অভিযোগ
জনসেবার নামে পূর্বতন সরকার যে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড নিয়ে এসেছিল সেখানেও ভুরি ভুরি দুর্নীতির (CAG Report During TMC Regime) অভিযোগ উঠে এসেছে। জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে ৩১টি প্রাইভেট হাসপাতালকে বিধিবহির্ভূতভাবে ‘এমপ্যানেলড’ করা হয়েছিল। এতে অতিরিক্ত খরচ হয় ১৪ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা। রাজ্যের মোট ২ কোটি ৪৩লক্ষ পরিবারকে এই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য ৩ হাজার ৩৮টি হাসপাতালকে নথিভুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে নথিভুক্ত হয়েছে মাত্র ২ হাজার ৬০৫টি হাসপাতাল। ফলে বহু হাসপাতালে স্বাস্থ্যসাথী কার্ড দেখিয়েও চিকিৎসা পাননি আমজনতা। এমনকি ক্যাগের রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, বিমা সংস্থাগুলোর কাছে রাজ্য সরকারের বকেয়া ছিল ৭ কোটি ২৬ লক্ষ টাকার মতো। পরে জরিমানা-সহ সেই অঙ্ক ৩১ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু তাও সেই টাকা বিমা সংস্থাগুলোকে মেটানো হয়নি।
যুব সাথী প্রকল্পে ছিল দুর্নীতির ছায়া
এছাড়াও পূর্বতন সরকারের চালু করা অন্যতম প্রকল্প যুবশ্রী নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে একাধিক প্রশ্ন। যেখানে যুব সাথীতে ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত আবেদনকারীদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাপ্রাপ্তই বছরের পর বছর ধরে যুবশ্রীর সুবিধা পাচ্ছিলেন। আবেদনের কোনওরকম যাচাইয়ের ব্যবস্থাই করেনি। যার ফলে বিপুল সংখ্যক ভুয়ো আবেদনকারী তালিকায় থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েই যাচ্ছে। সিএজি-র ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের স্টেট ফিনান্সেস অডিট রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ সালে রাজ্যে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ৭২৭ কোটি টাকা, যা জিএসডিপির ২.১৯ শতাংশ। এই প্রসঙ্গে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের অভিযোগ, “তৃণমূল সরকারের আমলে ঋণ বাড়লেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি।”
আরও পড়ুন: দুর্গাপুরে NIA-র অভিযান, বাড়ি ঘিরে তল্লাশি, কী অভিযোগে তদন্ত?
প্রসঙ্গত, রাজ্যের জেলা হাসপাতালগুলির চিকিৎসা পরিকাঠামো নিয়েও ক্যাগ রিপোর্টে ধরা পড়েছে উদ্বেগের ছবি। ৬৩ শতাংশ চিকিৎসকের পদ ফাঁকা রয়েছে। ৪৪ শতাংশ প্যারা মেডিক্যাল কর্মীর পদেও লোক নেই। জেলা সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রশাসনিক আধিকারিকদেরও ৮০ শতাংশ পদই ফাঁকা। শুধু স্বাস্থ্যসাথী, যুবশ্রী নয়, জল জীবন, আমফান, পূর্ত দপ্তর, সমগ্র শিক্ষা মিশন, অঙ্গনওয়াড়ির মতো প্রকল্পেরও বহুস্তরীয় দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে ক্যাগ রিপোর্টে।