আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) শিক্ষা ব্যবস্থাকে (Education System) আরও উন্নত করতে এবার প্রাথমিক শিক্ষার (Primary Education) ভিত মজবুত করার দিকে নজর দিচ্ছে রাজ্য সরকার। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই প্রাথমিক স্তরে বড় পরিবর্তন আনার কথা জানিয়েছেন স্কুল শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মন। নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি ক্লাসের দায়িত্বে থাকবেন একজন নির্দিষ্ট শিক্ষক। তিনিই সংশ্লিষ্ট শ্রেণির সমস্ত বিষয় পড়াবেন। রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য প্রাথমিক স্তর থেকেই পড়ুয়াদের শিক্ষার মান উন্নত করা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে আরও ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলা।
কী কী থাকবে এই নতুন শিক্ষা ব্যবস্থায়?
নতুন ব্যবস্থায় একজন শিক্ষককে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি সারা বছর ধরে সেই ক্লাসের পড়ুয়াদের পড়াশোনার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। কোন পড়ুয়া কোন বিষয়ে পিছিয়ে রয়েছে, কার শেখার ক্ষমতা কেমন এবং কোথায় অতিরিক্ত যত্ন ও মনোযোগের প্রয়োজন, সে সম্পর্কে শিক্ষকের স্পষ্ট ধারণা তৈরি হবে। সেই অনুযায়ী পড়ানোর পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে বলে মনে করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যেকের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিলে কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা বাড়তে পারে। সেই ভাবনা থেকেই প্রাথমিক শিক্ষার পদ্ধতিতে এই পরিবর্তনের উদ্যোগ।
শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের উপর!
শুধু পড়ানোর দায়িত্ব নির্দিষ্ট করাই নয়, শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্টের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের কথা সামনে এসেছে। নতুন ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট ক্লাসের পড়ুয়াদের উন্নতির সঙ্গে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্টকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, এবার থেকে পড়ুয়াদের শিক্ষাগত অগ্রগতি শিক্ষকদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই উদ্যোগ কার্যকর হলে শিক্ষকরা পড়ুয়াদের ফলাফল ও শিক্ষার মান উন্নত করার দিকে আরও বেশি মনোযোগ দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। সরকারি স্কুলে পড়াশোনার মান নিয়ে অভিভাবকদের একাংশের মধ্যে যে প্রশ্ন রয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে এই পদক্ষেপ শিক্ষার গুণগত মান বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
আরও পড়ুন: বঙ্গোপসাগরে তৈরি নিম্নচাপ, অর্ণবের পর ফের আসছে নতুন ঘূর্ণিঝড়
রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ কাজী মাসুম আখতার। তাঁর মতে, প্রাথমিক শিক্ষাই গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি। প্রতিটি শ্রেণির জন্য নির্দিষ্ট শিক্ষক থাকলে তিনি নিজের পড়ুয়াদের যত্ন নিয়ে গড়ে তুলতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বুঝে তাদের উন্নতির জন্য কাজ করাও সহজ হবে। তাই প্রাথমিক স্তরে এই ধরনের দায়িত্ব নির্ধারণকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর তরফেও এই উদ্যোগকে স্কুলশিক্ষার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে এই নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন্দিনী মুখোপাধ্যায়। তাঁর মতে, রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে ইতিমধ্যেই পর্যাপ্ত শিক্ষকের অভাব রয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষককে একটি শ্রেণির সমস্ত বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে তৃতীয় শ্রেণি থেকে বিজ্ঞানের বিষয়গুলি ধীরে ধীরে যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি ভাষা, অঙ্ক, ইতিহাস ও ভূগোলের মতো বিষয়ও একজন শিক্ষককে সামলাতে হলে শিক্ষার মান বজায় রাখা কতটা সম্ভব হবে, তা নিয়ে তিনি আশাবাদী নন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু একজন শিক্ষকের উপর সব বিষয়ের দায়িত্ব চাপিয়ে দিলেই প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যার সমাধান হবে না। এই পদক্ষেপ শিক্ষার্থীদের জন্য আদৌ ঠিক কতটা কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে, সেটা ভবিষ্যতই বলবে।