আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দীর্ঘদিন ধরেই টলিউডের কর্মপরিবেশ নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। কখনও শুটিংয়ে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কর্মী নিয়োগের চাপ, কখনও পারিশ্রমিক নিয়ে বিবাদ, আবার কখনও দীর্ঘ সময় কাজ করেও প্রাপ্য টাকা না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গিল্ড বা ফেডারেশনের সদস্যপদ না থাকলে কাজের সুযোগ পাওয়া নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ প্রযোজকদের একাংশের। এমনকী ব্যক্তিগত বা পেশাগত বিবাদকে কেন্দ্র করে শুটিং বন্ধ রাখা কিংবা কাউকে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ইন্ডাস্ট্রির অচলাবস্থা বাড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতে টলিউডের (Tollywood) কাজের পরিবেশে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বিনোদন জগতের উন্নতির লক্ষ্যে একগুচ্ছ নতুন নীতিনির্দেশিকা প্রকাশ করল শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) তথা নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার।
কী কী বলা হলো নির্দেশিকায়?
নতুন নির্দেশিকায় প্রথমেই প্রযোজক ও প্রযোজনা সংস্থাগুলির স্বাধীনতার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কোনও প্রযোজনায় কতজন শিল্পী, টেকনিশিয়ান বা অন্যান্য কর্মীর প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট প্রযোজকই ঠিক করতে পারবেন। ছবির বাজেট, শুটিংয়ের ধরন এবং প্রযুক্তিগত প্রয়োজন বুঝে কর্মী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে। কোনও গিল্ড, ফেডারেশন বা বেসরকারি সংগঠন অপ্রয়োজনীয়ভাবে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মী নিয়োগের জন্য চাপ দিতে পারবে না। একইভাবে সংগঠনের সদস্যপদ বা কার্ড না থাকলেও যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবেন শিল্পী ও কলাকুশলীরা।
লিখিত নথিকে প্রাধান্য প্রদান
অন্যদিকে, কাজ শুরুর আগে লিখিত চুক্তি বা নিয়োগপত্র দেওয়ার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে পারিশ্রমিক, কাজের দায়িত্ব, সময় এবং টাকা মেটানোর নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করতে হবে। শ্রম দফতরের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি বজায় রাখার পাশাপাশি বিভিন্ন ভাষার ছবির ক্ষেত্রেও স্বচ্ছ পারিশ্রমিক কাঠামো রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রযোজকদের টাকা মেটানোর ক্ষেত্রে গাফিলতি বা বকেয়া রাখার অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখার ব্যবস্থাও রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে কোনও আর্থিক বিবাদকে কেন্দ্র করে কাউকে কাজ থেকে বাদ দেওয়া বা গোটা ইন্ডাস্ট্রিতে তাঁর কাজের সুযোগ বন্ধ করে দেওয়ার অনুমতি থাকবে না।
কাজের সময় নিয়েও নির্দিষ্ট সীমা বেঁধে দিয়েছে রাজ্য। ফিচার ফিল্ম, ওটিটি এবং ওয়েব সিরিজের ক্ষেত্রে দুটি ধরনের শিফটের প্রস্তাব রয়েছে। প্রথমটি হল ১০ ঘণ্টার শিফট, যার সঙ্গে সর্বাধিক চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজ করা যাবে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে আট ঘণ্টার শিফটের পর সর্বাধিক ছয় ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজের সুযোগ থাকবে। টেলিভিশন মেগা সিরিয়ালের জন্য আট ঘণ্টার শিফটের পাশাপাশি সর্বাধিক চার ঘণ্টা অতিরিক্ত কাজের কথা বলা হয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য শ্রম আইন ও বিশ্রামের নিয়ম মানতে হবে। বিশেষ করে আট ঘণ্টার স্বাভাবিক কাজের সময়ের বাইরে ওভারটাইমের জন্য প্রতি ঘণ্টায় নির্ধারিত সাধারণ মজুরির দ্বিগুণ হারে টাকা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি একটি শুটিং শিফট শেষ হওয়ার পর পরবর্তী শিফট শুরুর আগে কর্মীদের অন্তত ছয় ঘণ্টা একটানা বিশ্রাম দেওয়ার নিয়মও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ইচ্ছেমতো দীর্ঘ সময় কাজ করিয়ে নেওয়ার প্রবণতায় লাগাম টানতে চাইছে সরকার।
শুধু কাজের সময় বা পারিশ্রমিক নয়, শুটিংয়ের পরিবেশ এবং কলাকুশলীদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি প্রযোজনা সংস্থাকে কর্মীদের জন্য পানীয় জল, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, পরিষ্কার শৌচাগার, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং বিশ্রামের জায়গার ব্যবস্থা রাখতে হবে। রাতের শুটিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ করে মহিলা কর্মীদের নিরাপদে বাড়ি ফেরার জন্য প্রয়োজনীয় যাতায়াতের বন্দোবস্ত করার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে কোনওরকম হেনস্থা, হুমকি, অপমানজনক আচরণ, বৈষম্য বা বুলিংয়ের অভিযোগ উঠলে তা মোকাবিলার জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়াও স্বচ্ছ ও গোপনীয় রাখতে বলা হয়েছে। প্রতিটি প্রযোজনা সংস্থাকে কাজের নিয়ম, পারিশ্রমিক, ওভারটাইম, নিরাপত্তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তি সংক্রান্ত লিখিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর বা SOP তৈরি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
নতুন নির্দেশিকায় আরও যে বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে:
- ব্যান কালচারে নিষেধাজ্ঞা: ব্যক্তিগত বা আর্থিক বিবাদের জেরে কোনও শিল্পী কিংবা টেকনিশিয়ানকে ঢালাওভাবে কাজ থেকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না।
- ন্যূনতম পারিশ্রমিক: শ্রম দফতরের নির্ধারিত মজুরির চেয়ে কম টাকা দেওয়া যাবে না। বকেয়া পারিশ্রমিক মেটানোর ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা রাখতে হবে।
- ডিজিটাল পোর্টাল: শিল্পী ও টেকনিশিয়ানদের নামের তালিকা, অনলাইনে সদস্যপদ সংক্রান্ত পরিষেবা, অভিযোগের অগ্রগতি এবং শুটিংয়ের অনুমতি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার জন্য ডিজিটাল ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
- স্বাস্থ্যবিমা: বিনোদন জগতের কর্মীদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনার জন্য সচেতনতা ও নথিভুক্তিকরণ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
- প্রভিডেন্ট ফান্ড: যোগ্য কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রভিডেন্ট ফান্ডের মতো সুবিধা পাওয়ার পথও প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- অভিযোগ নিষ্পত্তি: গিল্ড, ফেডারেশন এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলিকে নিয়ে বিরোধ মেটানোর একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: শান্তি চুক্তিতে ‘না’ নেহা বোরার, সিজেপির নেতাদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন AISA প্রেসিডেন্ট?
তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক দফতরের সচিব সৌমিত্র মোহনের স্বাক্ষরিত এই নির্দেশিকায় প্রস্তাবিত নিয়মগুলির বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির সঙ্গে পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনার কথাও বলা হয়েছে। তবে শুধু নির্দেশিকা প্রকাশ করলেই টলিউডের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধান হবে না, এমনটাই দাবি ইন্ডাস্ট্রির একাংশের। পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী এবং অভিনেতা গৌরব চট্টোপাধ্যায় কাজের সময়সীমা ও কর্মী নিয়োগের স্বাধীনতার মতো পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে স্বাগত জানিয়েছেন। গৌরবের কথায়, দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁদের রয়েছে। ফলে নতুন নিয়মগুলি বাস্তবে কার্যকর হলে শিল্পী ও কলাকুশলী উভয় পক্ষই উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এবার এই নতুন নির্দেশিকা কতটা কার্যকরী হয় সেটাই দেখার বিষয়।