আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: পুলিশ বা তদন্তকারী সংস্থার পরিচয় দিয়ে ভিডিও কল, গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়! দেশজুড়ে বাড়তে থাকা ডিজিটাল অ্যারেস্ট (Digital Arrest) প্রতারণা নিয়ে এবার কড়া অবস্থান নিল সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)। বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের (Surya Kant) নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়। বিচারপতি সূর্যকান্ত প্রশ্ন তোলেন, সংবাদমাধ্যমে বারবার প্রচার, সচেতনতা অভিযান এবং আদালতের নির্দেশের পরেও শিক্ষিত মানুষ কীভাবে এই প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন? তাঁর মন্তব্য, মোবাইল ফোনে কাউকে গ্রেফতার করা যায় বলে কেউ বিশ্বাস করলে ফোনটাই দেওয়ালে আছড়ে ফেলুন, তা হলেই গ্রেফতারের ভয় শেষ! সূত্রের খবর, সম্প্রতি এক মহিলা এই ধরনের প্রতারণায় ২.৫ কোটি টাকা খুইয়েছেন।
ব্যাঙ্কের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আদালতের
ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা ঠেকাতে ব্যাঙ্কের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত। সন্দেহজনক লেনদেন বা টাকা চেয়ে পাঠানোর মতো অস্বাভাবিক মেসেজ সামনে এলেই তৎক্ষণাৎ সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা সক্রিয় হয় না কেন? প্রশ্ন প্রধান বিচারপতির। তাঁর বক্তব্য, প্রতারণা ঘটে যাওয়ার পরে রিপোর্ট তৈরি করে লাভ নেই। আগে থেকেই অপরাধ আটকানোর ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনও গ্রাহকের অতীতের লেনদেনের ধরন থেকে সম্পূর্ণ আলাদা অস্বাভাবিক লেনদেন হলে ব্যাঙ্ক কেন তা সাময়িকভাবে আটকে রাখবে না? লেনদেনটি সত্যিই গ্রাহকের করা কি না, তা যাচাই না হওয়া পর্যন্ত টাকা স্থানান্তর স্থগিত রাখা, সংশ্লিষ্ট থানাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খবর দেওয়া এবং স্থানীয় পুলিশকর্মীর মাধ্যমে যাচাইয়ের প্রস্তাব আলোচনায় উঠে আসে। প্রধান বিচারপতি আরও প্রশ্ন করেন, গ্রাহকদের লেনদেনের সম্পূর্ণ ইতিহাস ব্যাঙ্কের কাছে থাকা সত্ত্বেও সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করা যায় না কেন?
অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি জানান, আগের তুলনায় ব্যাঙ্কগুলি এখন সন্দেহজনক লেনদেন চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নিজেদের উন্নত করেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া বা আরবিআইয়ের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে এবং ভারতীয় সাইবার অপরাধ সমন্বয় কেন্দ্র (I4C) দিনরাত কাজ করছে বলেও তিনি জানান।
আরও পড়ুন: ৭ মাস ধরে পাকিস্তানে আটকে রাখা হয়েছে ৬ জন ভারতীয় নাবিককে, দেওয়া হচ্ছে না খাবারও!
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত জানান, ব্যাঙ্কের ব্যর্থতার কারণে ডিজিটাল অ্যারেস্ট বা সাইবার প্রতারণা ঘটলে সংশ্লিষ্ট আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যাঙ্কের উপর দায় চাপানোর বিষয়ে আপত্তি জানান এবং বলেন, বিষয়টি আরবিআইয়ের নিয়মের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত। আদালত চায়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিতে প্রতারণা হলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির হারানো অর্থের সমপরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকুক। পরবর্তী শুনানিতে অনুমোদিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির তালিকা জমা দেওয়ার জন্যও আরবিআইকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৮ অক্টোবরও সুপ্রিম কোর্ট ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছিলেন। সেই শুনানিতে এই ধরনের অপরাধকে ‘ডিজিটাল ডাকাতি’ বলে উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত। প্রবীণ নাগরিক ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের নিশানা করার বিষয়টি নিয়েও আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে। ওই মামলায় গৌরব কুমার সাহা ও নিধি ভাণ্ডারী নামে দুই আবেদনকারী তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যে দায়ের হওয়া ৩৫টি সাইবার অপরাধের মামলা এক জায়গায় এনে বিচার করার আবেদন করেছিলেন। অভিযোগ, তাঁদের সংস্থার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ডিজিটাল অ্যারেস্ট-সহ সাইবার অপরাধের টাকা গ্রহণের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, একটি অ্যাকাউন্টে ৮০ লক্ষ টাকা এবং অন্যটিতে ১.২ কোটি টাকার অভিযোগ রয়েছে। অ্যাকাউন্টের অপব্যবহার সম্পর্কে জানার পরে তাঁরা সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও জানিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত তাঁদের আবেদন গ্রহণ করেনি। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী প্রশ্ন তোলেন, অভিযুক্তদের সুবিধার জন্য প্রতারণার শিকার মানুষকে কেন দিল্লিতে যেতে হবে?
ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা রুখতে আগেও একাধিক পদক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০২৫ সালের অক্টোবরে হরিয়ানার আম্বালার ৭৩ বছর বয়সি এক মহিলার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েছিল আদালত। অভিযোগ ছিল, প্রতারকেরা সুপ্রিম কোর্ট, বম্বে হাই কোর্ট এবং এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের জাল নথি ব্যবহার করে তাঁকে ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেছিল।