অনন্যা সরকার, কলকাতা: ভারতবর্ষের ধনীরা অন্যান্য উন্নত দেশের গরীবদের থেকেও কম আয় করেন! এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে বিশ্ব ব্যাংক (World Bank)। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ‘দারিদ্র্য ও অসাম্যের প্ল্যাটফর্ম’-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশ মানুষের দৈনিক মাথাপিছু আয় বা ভোগ-ব্যয় (Consumption Expenditure) প্রায় ৩ ডলার। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে এই সংখ্যা ২৫ ডলার, কানাডায় ৩১ ডলার এবং জার্মানি ও অস্ট্রেলিয়া – উভয় দেশেই অঙ্কটি ২৮ ডলার। ভারতের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের দৈনিক আয় বা ভোগ-ব্যয় প্রায় ১০ ডলার, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে তা ১৭৩ ডলার, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় ১২৯ ডলার এবং জার্মানিতে ১২৮ ডলার। ভারতের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, মাসিক ৮০,০০০ টাকা আয় থাকলে একজন ব্যক্তি দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ উপার্জনকারী গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে।
ভারতের সর্বস্তরের মানুষের আয় নিয়ে উদ্বেগ
‘ফাউন্ডেশন ফর ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট’-এর প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট অহনা দত্তগুপ্ত সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, এই তুলনাটি কেবল দারিদ্র্যের বিষয় নয়, এটি সমগ্র অর্থনীতিতে আয়ের নিম্নস্তরের প্রতিফলন। ভারতে দিনে ১০ ডলার খরচ করার সক্ষমতা থাকলে একজন ব্যক্তি সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের মধ্যে স্থান করে নেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাপানের মতো দেশে একই মাত্রার ব্যয়-ক্ষমতা একজন ব্যক্তিকে সবচেয়ে দরিদ্র ১০ শতাংশের কাছাকাছি রাখে। তাই কেবল দরিদ্রদের আয় বাড়ানো বা সম্পদের বৈষম্য কমানোই যথেষ্ট নয়, দেশের সব স্তরেই আয় বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
আয় বাড়ানোর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি। একই পরিমাণ জমি, শ্রম ও পুঁজি ব্যবহার করে যদি আরও বেশি পণ্য বা পরিষেবার সৃষ্টি করা যায়, তবে সময়ের সাথে সাথে কর্মসংস্থানের গুণমান, মজুরি এবং পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পেতে পারে। ব্যবসায়িক উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য উদ্ভাবন এবং নতুন ধারণা প্রয়োগ করে দেখার সুযোগ থাকা অত্যন্ত জরুরি বলে জানাচ্ছেন অহনা। উদ্যোক্তাদেরও নতুন উদ্যোগ পরীক্ষা করার, সফল ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং ব্যর্থতা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।
আরও পড়ুন: বছরে মিলবে ৫০ হাজার, স্বনাথ স্কলারশিপে পড়ুয়াদের দারুণ সুযোগ দিচ্ছে সরকার
ব্যবসায়িক উদ্যোগ নেওয়া ও তা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া সহজ করা, একটি যৌক্তিক কর ব্যবস্থা বজায় রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ কমানো – এই পদক্ষেপগুলি এমন পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। ভারতে ইতিমধ্যে আইনি বা প্রশাসনিক নিয়মকানুন পালনের প্রক্রিয়া সহজ করা ও কিছু ছোটখাটো অপরাধকে অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার (Decriminalisation) মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। তবে, আরও যেসব প্রয়োজনীয় সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিধিনিষেধ ও নিয়মগুলির নিয়মিত পর্যালোচনা, ডিলগুলির দ্রুত বাস্তবায়ন এবং প্রতিযোগিতামূলক ইন্ডাস্ট্রিয়াল-ক্লাস্টারের বিকাশ। দীর্ঘমেয়াদী সমৃদ্ধির জন্য শুধু আয়-বণ্টন কাঠামোতে নাগরিকদের অবস্থান পরিবর্তন করাই যথেষ্ট নয়, বরং পুরো কাঠামোটিরই আয়-স্তর বৃদ্ধি করা জরুরি।