আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: উৎসবের ঘোর এত তাড়াতাড়ি কি কাটানো যায়? তার উপর বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব বলে কথা। দুর্গাপুজো (Durga Puja), লক্ষ্মীপুজো পেরিয়ে কালীপুজো, এমনকি ভাইফোঁটা পর্যন্ত ছুটি (Holidays) আর উৎসবের আনন্দে মশগুল থাকার পরিকল্পনা করেছিলেন কলেজের বহু শিক্ষক (College Teachers)। কিন্তু সেই আনন্দে ভাঁটা পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে শিক্ষামহলে। পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী সেমিস্টারের নির্ধারিত ক্লাস সম্পূর্ণ করার লক্ষ্যেই পুজোর ছুটি কমিয়ে লক্ষ্মীপুজোর পরেই কলেজে পঠনপাঠন শুরু করা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গিয়েছে।
কী দাবি জাতীয় শিক্ষা নীতির?
বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজের ছুটির সময়সূচি কিন্তু সমান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় স্তরে লক্ষ্মীপুজোর পর ক্লাস শুরু হওয়ার রীতি থাকলেও বহু কলেজেই এর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে ষষ্ঠী থেকে একেবারে কালীপুজো পর্যন্ত দীর্ঘ ছুটি থাকে। সেই ব্যবধান কমিয়ে এবার কলেজগুলিকে যত দ্রুত সম্ভব খুলিয়ে পঠনপাঠন শুরু করার বিষয়ে প্রশাসনিক স্তরে আলোচনা চলছে। রাজ্যের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বিষয়টি এখনও বিবেচনাধীন। শিক্ষা দফতরের এক আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, আগে ছুটির তালিকা ঘোষণা করা হলেও প্রয়োজনে তাতে সংশোধন করে পুনরায় তালিকা প্রকাশ করা হবে।
ছুটি কমানোর পিছনে মূল যুক্তি হিসেবে উঠে আসছে জাতীয় শিক্ষানীতির নির্ধারিত পঠনপাঠনের হিসাব। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আশুতোষ ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কাঠামোয় প্রতি সেমিস্টারে প্রায় ৭০-৮০ দিন ক্লাস নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সেই লক্ষ্যে দীর্ঘ ছুটির সময় কমানোর কথা ভাবছে প্রশাসনের একাংশ। তবে নির্ধারিত ক্লাসের সংখ্যা পূরণ করতে গিয়ে উৎসবের ছুটিতেই কেন কাটছাঁট করা হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে শিক্ষামহলের একাংশে।
পুজোর ছুটিতে টান পড়লে সমস্যা তো হবেই। তাই ছুটি কমানোর সম্ভাবনায় তীব্র আপত্তি রয়েছে কলেজ শিক্ষকদের একাংশের। তাঁদের বক্তব্য, পুজোর ছুটি শুধু বিশ্রামের সময় নয়, বহু শিক্ষক এই ছুটিকে কাজে লাগিয়েই বহুদিন পর নিজের বাড়ি ফেরেন, কেউ পরিবারকে সময় দেন আবার কেউ ঘুরতে যান। আগে থেকে ঘোষিত ছুটির সূচি শেষ মুহূর্তে বদলে গেলে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে। পাশাপাশি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির বিধি এবং কলেজ পরিচালন সমিতির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকরা। তাঁদের দাবি, নির্দিষ্ট বিধি ও নিয়ম মেনে ছুটি নির্ধারিত হলে প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে তা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আইনগত দিকটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
পশ্চিমবঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বা ওয়েবকুটার সভাপতি শুভোদয় দাশগুপ্তের বক্তব্যেও উঠে এসেছে বাস্তব সমস্যার ছবি। তাঁর মতে, কলেজগুলির পরিকাঠামো এবং পরীক্ষার চাপের মধ্যে সব জায়গায় প্রত্যাশিত সংখ্যক ক্লাস করানো সহজ নয়। তাই শুধু ছুটি কমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। বরং কলেজের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং পঠনপাঠনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি বলে মনে করছেন তিনি।
আরও পড়ুন: ধর্মের নামে গণপিটুনি, হাসপাতালে ভর্তি করলেও ফের হামলা, মৃত ৩৮-এর শামীম
সব মিলিয়ে, কলেজের পুজোর ছুটি কমানো নিয়ে প্রশাসনের একপ্রকার চিন্তাভাবনা এবং শিক্ষকদের সেই নিয়ে তীব্র আপত্তি, এই দুইয়ের মধ্যে টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। অনেকের দাবি, কলেজ খুললেই যে পড়ুয়ারা কলেজে আসবে তার কোনও মানে নেই। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই পরিকল্পনা চলছে সেই উদ্দেশ্য তো পূরণ হবেই না, উল্টে ছুটিটাও নষ্ট হবে। তবে লক্ষ্মীপুজোর পরেই কলেজ খুলবে কি না, কিংবা ঘোষিত ছুটির তালিকায় আদৌ কোনও পরিবর্তন আসবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।