অনন্যা সরকার, উত্তর দিনাজপুর: ধান, গম ও সর্ষের মতো ফসলের বিকল্প হিসেবে উত্তর দিনাজপুরে তেজপাতা চাষ (Bay Leaves Farming) জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তুলনামূলক কম জল ও কম পরিচর্যা প্রয়োজন হওয়া এবং বাজারে ব্যাপক চাহিদার কারণে কৃষকরা এই ফসল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। এই জেলার রায়গঞ্জ, কালিয়াগঞ্জ,ইসলামপুর এবং হেমতাবাদ ছাড়িয়ে এই চাষাবাদ পদ্ধতি এখন দক্ষিণ দিনাজপুরের কুশমান্ডিতেও ছড়িয়ে পড়ছে। সেখানকার কৃষকরাও তেজপাতা চাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন।
তেজপাতা চাষে সাফল্য রাজ্যের কৃষকদের
দ্য বেটার ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, রায়গঞ্জের উত্তর লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক সুকুমার বর্মন ২০০৭ সালে তেজপাতা চাষ শুরু করেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাঁর লাগানো ৬৫০টি গাছ থেকে প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ কুইন্টাল তেজপাতা সংগ্রহ করা হয়। নিজের বাগানটি ইজারা দিয়ে তিনি প্রতি তিন বছরে পাঁচ লক্ষ টাকা আয় করেন। কৃষক জানিয়েছেন, চারা লাগানোর দুই থেকে তিন বছর পর থেকে গাছগুলি সাধারণত পাতা সংগ্রহের উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
জেলা উদ্যানপালন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে উত্তর দিনাজপুরে ২৪০ হেক্টর জমিতে তেজপাতা চাষ হয়েছিল, যা থেকে প্রায় ৭৬৯ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়। ২০২৪ থেকে ২৫ সাল নাগাদ চাষের এলাকা বেড়ে ৩১৮ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে ও উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,০১৯ মেট্রিক টনে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, এই খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ১০,০০০ মানুষ যুক্ত রয়েছেন। ২০ বছর আগে উত্তর দিনাজপুরে কৃষি ক্ষেত্রে যে নীরব পরিবর্তন শুরু হয়েছিল, তা আজকে দাঁড়িয়ে ৪০০ কোটি টাকার এক সমৃদ্ধ শিল্পে রূপান্তরিত হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১০ বাক্সে শুরু, কেনাবেচা হচ্ছে ৩৫ লক্ষ লিটার মধু, মৌমাছি পালনেই কোটিপতি শশী কুমার
তেজপাতা শিল্পে নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পুরুষরা সাধারণত গাছের পরিচর্যা ও পাতা সংগ্রহের কাজ করলেও, মহিলারা ডাল থেকে পাতা আলাদা করা, বাছাই করা ও সেগুলো শুকানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি করেন। এক কর্মী জানাচ্ছেন, তিনি প্রতিদিন ডাল থেকে ৪০ থেকে ৫০ কেজি তেজপাতা আলাদা করতে পারেন। এই কাজের মাধ্যমে অনেক গৃহবধূ স্বনির্ভর হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।
উত্তর দিনাজপুরে তেজপাতা চাষের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেক কৃষক তাঁদের বাগানটিকে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের জন্য ব্যবসায়ীদের কাছে ইজারা দিয়ে দেন। এরপর ব্যবসায়ীরা শ্রমিক নিয়োগ, গাছের রক্ষণাবেক্ষণ, পাতা সংগ্রহ, প্যাকেজিং ও পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে থেকে উন্নত মানের তেজপাতা বিদেশে রপ্তানি করা হয় ও অন্যান্য মানের পাতাগুলি দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়।
তবে, তেজপাতা চাষে বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। প্রধান বাধাগুলির মধ্যে রয়েছে বর্ষাকালে পাতা শুকানোর ক্ষেত্রে অসুবিধা, কীটপতঙ্গ ও গাছের রোগ এবং অসংগঠিত শ্রম ব্যবস্থা। তা সত্ত্বেও, গত ২০ বছরে কৃষক, নারী শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সম্মিলিত প্রয়াসে উত্তর দিনাজপুরে তেজপাতা চাষ গ্রামীণ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হয়ে উঠেছে।