“বাঙালী সমাজে জন স্টুয়ার্ট মিলের বলা পাল-পাল সুখী শুয়োর তৈরী হচ্ছে” : আবার বিস্ফোরক লেখক নীলোৎপল রায়

নীলোৎপল রায়ের (Nilotpal Roy) মহাকাব্যিক ব্যঙ্গ-উপন্যাস ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মৌলিক মহাকাব্য এর আগে কেউ কখনো লেখেন নি। এই মহাগ্রন্থ আসলে এক আধুনিক cornucopia — এমন এক সব-পেয়েছির ঝুলি, যেখানে হাত ঢুকিয়ে যা চাওয়া হয় তাই-ই পাওয়া যায়। যারা তাঁর বিগত ঊনত্রিশ বছরের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অবহিত আছেন, তাঁরা সম্যকভাবেই জানেন যে একবিংশ শতাব্দীর একজন অন্যতম বিশিষ্ট লেখক ও চিন্তক হিসেবে বাংলার, ভারতের, এবং আন্তর্জাতিক সাহিত্যের প্রাঙ্গণে ও পরিসরে নীলোৎপল রায়ের নিজস্ব মনন আর তাঁর স্বকীয় আত্মবীক্ষা বর্তমান সময়ে কতখানি মূল্যবান, তাৎপর্যপূর্ণ, তথা অভিঘাতপ্রবণ। আজ আমরা ফের একবার তাঁর সঙ্গে কথোপকথনে, তাঁর সদ্যপ্রকাশিত গ্রন্থ নিয়ে আলোচনায়।

প্রশ্ন : এখন মার্চ মাস; ছ’মাস আগে গত বছর আপনার নতুন উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে। আপনি তার্কিক, বাগ্মী, এবং বিপ্লবী; আর আপনার কাজ মানেই নতুন কিছু, এমন কিছু যা আপনার আগে কেউ কখনো করেন নি। এই বইটিতে তেমন কোন নতুনত্ব আছে?

নীলোৎপল রায় : না, না, প্রথমেই ভুল ধারণাগুলি ভেঙ্গে দেই। “তার্কিক” কিংবা “বাগ্মী” আমি নই; প্রকৃত অর্থে “তার্কিক” ছিলেন যেমন ধরুন এপারে নীরদ সি. চৌধুরী আর ওপারে বার্ট্রাণ্ড রাসেল; আবার প্রকৃত

অর্থে “বাগ্মী” ছিলেন ধরুন এপারে হীরেন মুখার্জী আর ওপারে জাঁ-পল সার্ত্র — এইটি হলো আমার কাছে মানদণ্ড বা স্ট্যাণ্ডার্ড, আমি এঁদের ভাবশিষ্য; কিন্তু, “তার্কিক” অথবা “বাগ্মী” হিসেবে সেই স্তরে তো আমি নিজেকে এখনো নিয়ে যেতে পারি নি, যদি আদৌ কোনোদিন পেরে উঠি, সেই দিন হয়তো আমি ঐ বিশেষণগুলির যোগ্য হয়ে উঠবো। আর, “বিপ্লবী” শব্দটির ওজন, গভীরতা, তথা ব্যাপ্তি অনেক অনেক বড়, যত্রতত্র ব্যবহার করে শব্দটির মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবেন না; “বিপ্লবী” হওয়ার যোগ্যতা আমার মোটেও নেই, বরং আপনি বলতে পারেন যে আমি ধর্মদ্রোহী, রাজদ্রোহী, সমাজদ্রোহী। যাই হোক, এইবার বইটির প্রসঙ্গে আসি। আধুনিক বাংলা গদ্য বিগত সোয়া-দু’শো বছর ধরে যেভাবে বিবর্তিত হতে হতে আজকের স্তরে এসে পৌঁছেছে, এবং এই সুদীর্ঘ যাত্রাপথের বিভিন্ন বাঁকে বাঁকে বাংলা গদ্যসাহিত্যের যে যে stalwart-রা মাইলফলক হয়ে উঠে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে ঋদ্ধ করে তুলেছেন, সেই সব কিংবদন্তী গদ্যলেখকদের স্বকীয় স্বাক্ষর বহনকারী নিজস্ব গদ্যশৈলীগুলিকে এই উপন্যাসের কথন-ক্রিয়ার বিভিন্ন পরতে পরতে আমি নির্মিত, বিনির্মিত, ও পুনর্নির্মিত করেছি। বাংলা সাহিত্যে এটা আগে কখনো হয় নি। আমি এই মহাগ্রন্থে বাংলা গদ্যের বিবর্তনকে দেখিয়েছি প্রতীকীভাবে, এই উপন্যাসের ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ন্যারেটিভের মধ্যে দিয়ে; শ্রেষ্ঠদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম প্রায় আড়াই-ডজন বাঙালী গদ্যলেখকের স্বকীয় গদ্যশৈলীর অনন্যসাধারণ কিছু নিদর্শন এই উপন্যাসে দেখানো হয়েছে, যেন বাংলা গদ্যের বিবর্তনের এক প্রদর্শনী, যেন বাংলা গদ্যশৈলীর জাদুঘর পরিক্রমা! এটা জয়েসীয়ান কনসেপ্ট। ‘ইউলিসিস’-এর চোদ্দতম অধ্যায়ে — Oxen of the Sun — এটা জয়েস করেছেন। তবে জয়েস তাঁর মতো করে করেছেন, আমি অন্যভাবে করেছি, আমার মতো করে। জয়েস ইংরাজী গদ্যের বিবর্তনকে ধরেছেন, আমি বাংলা গদ্যের বিবর্তনকে ধরেছি। ‘ইউলিসিস’-এর ঐ অধ্যায়টিতে মোট ষাটটি প্যারাগ্রাফ আছে, যার মধ্যে দিয়ে জয়েস মোট বত্রিশ রকমের আলাদা আলাদা ন্যারেটিভ টেকনিক দেখিয়েছেন, প্রায় দু’হাজার বছর ধরে ঘটা ইংরাজী ভাষার কথনশৈলীর ক্রমবিবর্তন। বাংলাতে আজ অবধি কেউ এভাবে ভাবেই নি, করা তো দূরের ব্যাপার। এই উপন্যাসে প্রথম সেকাজ করেছি আমি। আর একটি কথা। যেকোনো ভাষার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সেই ভাষায় প্রচলিত বিভিন্ন বাগধারা। বাংলা ভাষায় বহুকথিত ও সকলের জানা এরকম বেশ কিছু বাগধারাকে আমি নতুন রূপ দিয়েছি, সম্পূর্ণ নতুনভাবে পুনর্নির্মাণ করেছি এই গ্রন্থে; যা, এক অর্থে, ভাষারও পুনর্নির্মাণ, যাকে দেরিদা আবার বলেছেন Deconstruction বা বিনির্মাণ। সেগুলি জানতে হলে, বইটি পড়তে হবে।

প্রশ্ন : আপনার উপন্যাসের নাম ‘নীলোৎপলবধ কার্নিভাল’ — এই “বধ” বলতে এখানে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন? আর “কার্নিভাল” শব্দটির অর্থ তো আমরা জানি “উৎসব”; তাহলে “বধ” কেমন করে “উৎসব” হতে পারে?

নীলোৎপল রায় : এই প্রসঙ্গে, এই উপন্যাসটির শিরোনামখানি, অর্থাৎ ‘নীলোৎপল কার্নিভাল’, এবং সহ-শিরোনাম বা subtitle, মানে ‘তেত্রিশ ভূতের কেত্তন’ — এ দু’টিকেও খেয়াল করতে হবে। ঐ তেত্রিশ ভূত যে আসলে তেত্রিশ সমান্তরাল স্বর, আর ঐ কার্নিভাল যে আসলে Carnivalesque, তা তো সহজেই বোঝা যায়। আরো যে দু’টি ব্যঞ্জনা এখানে নিহিত রয়েছে — একটি শিরোনামে ও আরেকটি সহ-শিরোনামে, সেগুলো একটু ধরিয়ে দেওয়া দরকার। সহ-শিরোনামের ‘ভূতের কেত্তন’ শব্দবন্ধটি, প্রকৃত প্রস্তাবে, ‘ছুঁচোর কেত্তন’ বাগধারাটির প্রতিধ্বনিত বিনির্মাণ, অর্থাৎ, তেত্রিশটি সমান্তরাল স্বর মিলে তৈরী করা যে ডামাডোলের অবস্থা। আর, শিরোনামের ‘নীলোৎপলবধ’ শব্দখানি যে দ্যোতনার ইঙ্গিতবাহী, তা হলো, কেন্দ্রীয় চরিত্র ও/বা স্বর ‘ন’-এর ইতিপূর্বে ঘটে যাওয়া spiritual death বা আত্মার মৃত্যুর পর, এই মহাগ্রন্থে এসে তাঁর spiritual resurrection বা আত্মিক পুনর্জন্ম। এখন আপনার প্রশ্ন হলো, ‘বধ’ কী করে ‘কার্নিভাল’ হতে পারে? ঠিক কথা, এ তো আর ভিলেন বা খলনায়ক হনন নয়! তবে, কেন্দ্রীয় চরিত্রের হত্যা কেমন করে আমোদ-আহ্লাদ-উৎসব হয়ে উঠতে পারে? নায়কের মৃত্যু কি কখনো কার্নিভালেস্ক হয়? এখানে বুঝতে হবে, যে এই কার্নিভাল আসলে অন্য কার্নিভাল; সাধারণ অর্থে আমরা যা বুঝি, তা নয়। মনে করা যাক প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের নিজের লেখা সেই বিখ্যাত গানের লাইনগুলি :
“জন্মিলে মরিতে হবে, জানে তো সবাই;

তবু মরণে মরণে অনেক ফারাক আছে ভাই;

সব মরণ নয় সমান।”

অর্থাৎ, সকল মৃত্যু ধারে ও ভারে সমান ওজনদার হয় না; অধিকাংশ মৃত্যুই হয় সাধারণ; কিন্তু তারই মাঝে কোনো কোনো মৃত্যু অসাধারণ হয়ে ওঠে, কার্নিভালেস্ক হয়ে ওঠে। মনীন্দ্র গুপ্ত-র অনন্যসাধারণ স্মৃতিকথা ‘অক্ষয় মালবেরি’-র দ্বিতীয় পর্বে ছোট্ট একটি অধ্যায় আছে যার শিরোনাম হলো ‘কার্নিভাল’। তার অন্তিম বাক্যটি এইরকম : “মাস তিনেক পর খবর পাওয়া গেল, কোথায় যেন খেলা দেখাতে গিয়ে পি. সি. পাল লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে চৌবাচ্চার কিনারায় পড়ে দু’-আধখানা হয়ে গেছেন।” এই পি. সি. পাল চরিত্রটি, নিজের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে আশি ফুট উঁচু ডাইভিং বোর্ড থেকে নিচের জলভরা লোহার পাতের চৌবাচ্চায় ঝাঁপ দেওয়ার খেলা দেখাতো, সার্কাসে। কার্নিভাল মানে দুর্ঘটনাও হতে পারে! কার্নিভাল মানে মৃত্যুও হতে পারে! কার্নিভাল মানে বৃত্তাসুরকে বধ করার উদ্দেশ্যে বজ্র নির্মাণের জন্য, দধিচীর ন্যায় স্বীয় অস্থি-বিসর্জনের মতো চরম আত্মত্যাগও হতে পারে! তুষার রায়-এর ‘শেষ নৌকা’ মনে পড়ছে না কি আবার? — “ভাষা নিয়ে ম্যাজিক, শব্দ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা, এইসবের বাইরেও আর একটা ম্যাজিক আছে, সে ম্যাজিক নিজেকে হত্যা করার ম্যাজিক, লোকের সামনে দেখানো যে দেখুন আমি আগুন খাচ্ছি, সেই এক ধরণের ভোজবাজি আছে না, অথচ সে আগুন খাওয়ায় জিভ বুক পুড়ে যায়, সেইরকম ম্যাজিক আধুনিক গদ্য বা পদ্যে দেখাই আমরা, যার ভিতর নিজেকে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, জ্বালিয়ে দিতে হয়।” — এও এক ধরণের কার্নিভাল! আর, ‘নীলোৎপলবধ কার্নিভাল : ৩৩ ভূতের কেত্তন’ শীর্ষক এই মহাকাব্যিক উপন্যাসটিও সেরকমই এক কার্নিভাল।

প্রশ্ন : এখনকার বিভিন্ন বাংলা সংবাদপত্রে যেসব গ্রন্থ-সমালোচনা লেখা হয়, সেগুলি যারা লেখেন, তাঁরা আপনার এই বইটি পড়ে এসব বুঝতে পারবেন?

নীলোৎপল রায় : সেকথা আমি বলবো কেমন করে! সে তো তাঁরা বলবেন। যাদের সেই স্তরের পড়াশোনা আছে, মনন আছে, তাঁরা ধরতে পারবেন; আর যাদের শুধুই ডিগ্রী আছে অথচ পড়াশোনা নেই, মনন নেই, তাঁরা পারবেন না। সার্বিকভাবে বাঙালীর মেধাচর্চার আর সৃজনশীলতার মান এমন তলানিতে এসে ঠেকেছে, যে এখনকার চাটুকার সমালোচকদের দেখলে আমার মনে পড়ে, আজ থেকে একশো-আটত্রিশ বছর আগে ১৮৮৮ খ্রীস্টাব্দে রাজকৃষ্ণ রায়-এর লেখা ‘কাণাকড়ি’ শীর্ষক একটি প্রহসনে যা বলা হয়েছে সমালোচকদের সম্পর্কে — (আপনার পড়া না থাকলে অবশ্যই পড়ে নেবেন) — আমি সেই অংশটি উদ্ধৃত করছি : “এই জিনিসটির নাম সমালোচক, কিন্তু কাজে লোচন শূন্য নিরেট পেচক! এঁদের বিদ্যেশূন্য ইয়ার বন্ধুরা ছাইভষ্ম মাথামুণ্ডু যা লিখুক, এঁরা তাদের স্বর্গে তুলে দেন। কেউ কিছু ঘুষ-ঘাস দিলে তাকেও মাথায় করে ঢাক বাজান। কিন্তু এক গ্লাসের ইয়ার না হলে, বা যারে দেখতে নারি, তার চলন বাঁকা গোছের গ্রন্থকারেরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, ভাল ভাল পুস্তকাদি লিখলে এঁরা কঞ্চিকলমের এক খোঁচায় সাত কুঁচি করে জবাই করে। … এক ছটাক মদ দাও, তুমি দশ বৎসর পরে যে বই লিখবে, আজ তার দেড়গজী লম্বা সমালোচনা করে পাঠককে তাক লাগিয়ে দেবেন। এই সকল গর্দ্দভরূপী সমালোচকেরা গরীব গ্রন্থকারদের গ্রন্থসকল না পড়ে — কেবল মলাটের এ পিঠ ও পিঠ দেখেই, যা খুশী তাই সমালোচনা করে, সুতরাং বাবাকে শালা আর শালাকে বাবা বলে সমালোচকত্ব ফলিয়ে বসে।” — এই তো চরিত্র, এখনকার সমালোচকদের।

Nilotpal Roy

প্রশ্ন : বর্তমান সময়ের সাহিত্য-সমালোচকরা, এবং জনপ্রিয় লেখকরা কি তাহলে সিরিয়াস সাহিত্য পড়ে না বলছেন?

নীলোৎপল রায় : বাঙালী সমাজে একটা সময় ছিলো, যখন মাষ্টারমশাইদের আর লেখকদের, সাধারণ মানুষ সত্যিকারের শ্রদ্ধা করতো। মানুষ অন্তর থেকে একথা বিশ্বাস করতো, যে মাষ্টারমশাইরা এবং লেখকরা হলেন প্রকৃত অর্থেই জ্ঞানী মানুষ তথা গুণী মানুষ; ও সেই জ্ঞানের জন্য আর গুণের জন্যই সমাজে তাঁদেরই সবচেয়ে বেশী সম্মান প্রাপ্য। এঁরা মানুষকে জ্ঞান দিতেন, মানুষ সাগ্রহে শুনতো ও পড়তো সেসব জ্ঞানের কথা; কেউ কখনো বলতো না : “এত জ্ঞান দেবেন না তো!” কেননা, জ্ঞানকে মানুষ তখন মূল্যবান মনে করতো। তখনও, মানুষ জ্ঞান আর তথ্যের ফারাক বুঝতো; এবং জানতো যে information বা তথ্য জানিয়ে দিতে যন্ত্রও পারে, কিন্তু যন্ত্র কখনোই knowledge বা জ্ঞান প্রদান করতে পারে না। এখন যে অর্বাচীনরা এটা বোঝে না, তারা ভাবে যে যেহেতু তাদের হাতে একটা করে স্মার্টফোন আছে, আর তাতে একটা করে ইণ্টারনেট সংযোগ আছে, তাই তারাও সবাই জ্ঞানী হয়ে গেছে; অতএব লেখকদের আর মাষ্টারমশাইদের জ্ঞান শোনার আর তাদের কোনো দরকার নেই। এর সঙ্গে আরেকটা বিষয়ও জড়িত। তখনও, মানুষের জ্ঞানের পাশাপাশি বিনোদনেরও প্রয়োজন ছিলো; কিন্তু, মানুষ ছ্যাবলামো আর বিনোদনের পার্থক্যটা খুব ভালো করে বুঝতো; তখন মানুষ রসিকতা পছন্দ করতো, ভাঁড়ামো নয়। এখন যারা মাষ্টারমশাইদের আর লেখকদের থেকে জ্ঞান শুনতে ও পড়তে নারাজ, তারাই কিন্তু ভাঁড়ামো আর ছ্যাবলামো দেখেশুনে হাততালি দেয়, তারাই ফেসবুক-টুইটার-ইন্সটাগ্রাম-টেলিগ্রাম-এ ভাঁড়ামোর আর ছ্যাবলামোর রিল-ভিডিওকে বিনোদন বলে ভাবে, আর তারাই লঘু-তরল-অগভীর

থ্রিলার-সাসপেন্স-ডিটেকটিভ বইকে সাহিত্য মনে করে বাহবা দেয়, আর বলে : “কী অসাধারণ সাহিত্য পড়লাম!” তাদের এখন ওসবই পছন্দ হয়, কেননা ঐ সব রিল-ভিডিওতে কোনো জ্ঞানের কথা থাকে না, কিংবা ঐসব বইতেও কোনো জ্ঞানের কথা থাকে না; কারণ যারা ওসব রিল-ভিডিও বানায় আর যারা ওসব বই লেখে, তাদের হাতে স্মার্টফোন আর তাতে ইণ্টারনেট সংযোগ থাকলেও, মগজে জ্ঞান নেই; আর যারা ওসব দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে, তাদের তো মগজই নেই। সুতরাং, বলাই বাহুল্য, যে যাদের মগজই নেই, তারা প্রকৃত মাষ্টারমশাইদের আর প্রকৃত লেখকদের জ্ঞান শুনতে ও পড়তে বিন্দুমাত্রও আগ্রহী হবে না; কেননা যেহেতু তাদের মগজই নেই, ঐ জ্ঞান নিয়ে তারা রাখবে কোথায়! তাই বিনোদনের নামে ভাঁড়ামো-ছ্যাবলামো, আর সাহিত্যের নামে জ্ঞানবর্জিত বালখিল্যতাই এইসব মগজহীন অর্বাচীনদের কাছে সেরা ও শ্রেষ্ঠ। সুতরাং, তারা সিরিয়াস বই পড়বে কেমন করে?

প্রশ্ন : আপনার রাগের কারণ কি তাহলে এটাই যে বাঙালী এখন ক্রমশই মা সরস্বতীর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে?

নীলোৎপল রায় : আপনিই বলুন না, বাঙালী পড়াশোনা করে এখন? ফর একজ্যাম্পল, ক’জন বাঙালী জন স্টুয়ার্ট মিলের ‘ইউটিলিটারিয়ানিজম’ বইটা পড়েছে? এই বইটার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ষষ্ঠ অনুচ্ছেদের শেষের দিকে একটা সাংঘাতিক বাক্য আছে — “It is better to be a human being dissatisfied than a pig satisfied; better to be Socrates dissatisfied than a fool satisfied.” — বাঙালী সমাজেও তো এখন আসলে ঐ জন স্টুয়ার্ট মিলের বলা পাল-পাল সুখী শুয়োরই তৈরী হচ্ছে, নগণ্যস্য নগণ্য কিছু ব্যতিক্রমী অসুখী মানুষ ছাড়া। এখনকার বাঙালী লেখকরাও অধিকাংশই এরকম এক-একটি সুখী শুয়োর; বইপত্র কিছু না পড়েই সব লেখক হয়ে গেছে। কিন্তু, আমার রাগের কারণ সেটা নয়। কে মানুষ হতে চায়, আর কে শুয়োর হয়ে থাকতে চায়, সেটা যার যার ব্যক্তিগত পছন্দের ব্যাপার। সমস্যাটা অন্য জায়গায়। গণিতে শূন্য পেয়ে পরীক্ষায় ডাহা ফেল করা ছাত্র যদি অঙ্কের মাষ্টার হয়ে স্কুলে-কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে যায়, তাহলে পরের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কেমন অঙ্ক শিখবে বুঝতে পারছেন? বাঙালী সমাজের সাহিত্য জগতেও ঠিক সেই ঘটনাটাই ঘটেছে। সংস্কৃত, তামিল, ফরাসী, স্প্যানিশ, রাশিয়ান, জার্মান, ইংরাজী ভাষায় লেখা ধ্রুপদী সাহিত্য, মানে ক্লাসিকস, কিংবা প্রাচ্যের আর পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দর্শন এবং সাহিত্য-তত্ত্ব — এসব তো ছেড়েই দিন, শুধুমাত্র নিজের মাতৃভাষায় লেখা সাহিত্য, মানে বাংলা সাহিত্যে বিগত সোয়া-দু’শো বছরে যেসব অমূল্য ও অসাধারণ কালজয়ী বই লেখা হয়েছে, সেগুলোই তো পড়া নেই, আপনারা যাদের বড় মাপের সাহিত্যিক বলে জানেন ও মানেন তাঁদের। পড়া তো দূর অস্ত, সেসব বইয়ের নাম পর্য্যন্ত শোনা নেই ঐসব জনপ্রিয় ও প্রথিতযশা লেখকদের। অথচ, তাঁরাই সব নাকি এখন লেখক পদবাচ্য! অঙ্কে ফেল করা ছাত্র অঙ্কের মাষ্টার হয়েছে আর কী! এর ফল হলো বাংলা সাহিত্যের চরম অবনমন, তথা বাঙালী পাঠককুলের মেধার ও রুচির চূড়ান্ত অধঃপতন। তাঁরা দুধের গ্লাস ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মদের গ্লাসে ডুবে যাচ্ছেন; সত্যিকারের উৎকৃষ্ট সাহিত্যকে ব্রাত্য করে রেখে নিকৃষ্ট পাঠ-অযোগ্য লেখাপত্রকে মাথায় তুলে নাচছেন। আপনাকে বুঝতে হবে, যে আমি রেগে যাই কেন? এবং সেই ক্রোধ আমার লেখায় প্রতিফলিত হয় কেন? যে কারণে সজনীকান্ত দাস রেগে যেতেন এবং সেই ক্রোধ তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হতো, যে কারণে নীরদ সি. চৌধুরী রেগে যেতেন এবং সেই ক্রোধ তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হতো, যে কারণে প্রমথনাথ বিশী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহ, সুভাষ ঘোষ, তুষার রায়, ফাল্গুনী রায়, সুবিমল মিশ্র, নবারুণ ভট্টাচার্য রেগে যেতেন, এবং সেই ক্রোধ

তাঁদের লেখায় প্রতিফলিত হতো, সেই একই কারণে আমিও ক্রুদ্ধ হই, এবং সেই ক্রোধ আমার লেখায় প্রতিফলিত হয়।

প্রশ্ন : পাড়ার মোড়ে মোড়ে যে আড্ডার জন্য বাঙালী বিখ্যাত, সেই আড্ডাতেও তো একসময় শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি নিয়ে তুমুল আলোচনা হতো, যা থেকে অনেক কিছু জানা যেতো, শেখা যেতো; সেটাও কি এক ধরণের মেধাচর্চা নয়?

নীলোৎপল রায় : অবশ্যই, কিন্তু সেই মানের আড্ডা, সেই গভীরতাসম্পন্ন আলোচনা এখন হচ্ছে কোথায়? এখন আড্ডার নামে যেটা হয়, তা হলো মূর্খের বাচালতা। যে উচ্চডিগ্রীধারী অর্ধশিক্ষিত বাঙালী লেখকরা ও পাঠকরা নিজেদের গোটা জীবনটা ধরে পাড়ার চায়ের দোকানে কিংবা বাড়ির এ.সি. ড্রইং-রুমের সোফায় বসে হেমন্ত বড় না মান্না বড়, রফি বড় না কিশোর বড়, উত্তম বড় না সৌমিত্র বড়, শচীন বড় না গাভাস্কার বড়, লতা বড় না আশা বড়, মোহনবাগান বড় না ইস্টবেঙ্গল বড়, পেলে বড় না মারাদোনা বড়, রোনাল্ডো বড় না মেসি বড়, সত্যজিৎ বড় না ঋত্বিক বড়, বচ্চন বড় না রজনীকান্ত বড় — এই ইতরামি করতে করতে জোয়ান থেকে বুড়ো হয় ও মরে যায়, সেই সব মূঢ় অর্বাচীনদের কি আদৌ একথা উপলব্ধি করার মতো মগজ আছে, যে প্রকৃত সাহিত্য কাকে বলে, আর প্রকৃত সাহিত্যিক কারা? যখন একদল অযোগ্য-অপরাধমনস্ক-অমানুষ একজোট হয়ে একটা লুম্পেন সরকার চালায়, এবং জঘন্যতম অপরাধীদের আইনের শাস্তি থেকে বাঁচানোর জন্য সাংবিধানিক পদের তথা প্রশাসনিক শক্তির অপব‍্যবহার করে, বারংবার করতেই থাকে, তখন এই অরাজক রাষ্ট্রব‍্যবস্থার ক্ষমতায় আসীন স্বৈরাচারী শাসকদের নিন্দা না করে, তাদের ধিক্কার না জানিয়ে, তাদের অন‍্যায়ের প্রতিবাদ না করে, সাংস্কৃতিক মহলের যে শিরদাঁড়াহীন ও নপুংসক পরজীবী বুদ্ধিজীবীর দল, নীরবতার সংস্কৃতি পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তারা কেউ আদৌ “শিল্পী” বা “সাহিত্যিক” নয়, আর তাদের সৃষ্টি আদৌ “শিল্প” কিংবা “সাহিত্য” পদবাচ‍্যই নয়। বিগত ঊনত্রিশ বছর ধরে আমি একথা বলে আসছি। ক্ষমতার গু-মুৎ লেহনকারী, উঞ্ছজীবী এইসব ধান্দাবাজ ভৃত‍্যমনস্ক লেখক-কবিরা শ্রদ্ধার যোগ্য নয়, ঘৃণার যোগ্য; এদের গোটা জীবনে এরা আজ অবধি “সাহিত্য” পদবাচ‍্য কিছু লিখতেই পারে নি। একজন প্রকৃত শিল্পী-লেখক-কবি-সাহিত্যিক-স্রষ্টা সবসময় তাঁর ঋজু মেরুদণ্ডটি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন সত্যের দিকে এবং মিথ্যার উল্টোদিকে, ন্যায়ের পাশে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে, যা ন্যায্য তার পক্ষে এবং যা অন্যায্য তার বিপক্ষে। তাঁকে হতে হবে অকুতোভয়। তিনি কখনোই কোনো ব্যক্তির, প্রতিষ্ঠানের, অথবা সিস্টেমের কেনা চাকরবাকর বা পদলেহনকারী চাটুকার হয়ে পড়বেন না; অথবা একপেশেভাবে শাসকের হুকুমমাফিক ল্যাজ নাড়তে নাড়তে শাসকের প্রোপাগাণ্ডা করার সুবিধার জন্য ভালোকে খারাপ আর খারাপকে ভালো বলবেন না। কিন্তু, হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া তেমন লেখক এখন কোথায় বাঙালী সমাজে!

প্রশ্ন : কিংবদন্তী লেখক সুবিমল মিশ্র আপনার সম্পর্কে বলেছিলেন, যে আপনি হলেন বাংলা সাহিত্যের জেমস জয়েস। আইরিশ সমাজে যেমন জয়েসের লেখা নিয়ে প্রভূত বিতর্ক ছিলো, ঠিক তেমনই বাঙালী সমাজে আপনার লেখাও তো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে এবং দিচ্ছে! জয়েসের ‘ইউলিসিস’ অশ্লীলতার অভিযোগে নিষিদ্ধ হয়েছিলো; আপনার এই বইটির ক্ষেত্রেও তো অভিযোগ উঠছে যে বাঙালী পাঠকের কাছে এটি খুবই দুষ্পাচ্য ও গুরুপাক ঠেকছে! কী বলবেন এ নিয়ে?

নীলোৎপল রায় : এই যে এখুনি আপনি বললেন, জয়েসের ‘ইউলিসিস’ নিষিদ্ধ হয়েছিলো, এটা কিন্তু অর্ধসত্য। বাকি অর্ধেকটা আপনি বললেন না, যে আদালতে এই নিয়ে হওয়া মামলার রায়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিলো যে ‘ইউলিসিস’ অশ্লীল নয়। সেকথা বলছি একটু পরে। তার আগে, এই সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রথমেই কয়েকটি গ্রন্থের কথা না বললেই নয়, যেগুলি পড়া তো অনেক পরের ব্যাপার, এগুলির নাম অবধি জানে না এখনকার বাঙালী পাঠকরা ও লেখকরা। বাস্তিল দুর্গের কারাগারে বসে লুকিয়ে লেখা ফরাসী ভাষার উপন্যাস ‘The 120 Days of Sodom’, মার্ক্যুইস দ্য সাদ-এর লেখা বীভৎস এ বইতে কী নেই! — ধর্ষণ, পায়ুমৈথুন, অজাচার, পশ্বাচার, শবসঙ্গম, শিশু-সহবাস, মলমূত্র-যৌনতা, এবং এমনকি শরীরের বাইরের অঙ্গচ্ছেদ, শরীরের ভিতরের অঙ্গচ্ছেদ, ও নারকীয় যন্ত্রণা দিতে দিতে হত্যা। ঐ বাস্তিলের কারাগারে বসেই, এই সাদ-এরই লেখা ‘Justine or the Misfortunes of Virtue’, যা লেখার জন্য নেপোলিয়ন সাদ-কে গ্রেপ্তার করেন, ও তারপর জীবনের শেষ তেরোটি বছর কারাগারেই কাটিয়ে সাদ-এর মৃত্যু হলে, প্যারিসের রয়্যাল কোর্ট বইটিকে ধ্বংস করে দেওয়ার হুকুমনামা জারি করে। অষ্ট্রিয়ান লেখক লিওপোল্ড ভন স্যাচার-ম্যাসোচ-এর জার্মান ভাষায় লেখা উপন্যাস ‘Venus in Furs’ — প্রসঙ্গতঃ বলি, এই সাদ-এর নাম থেকে ‘Sadism’, আর স্যাচার-ম্যাসোচ-এর নাম থেকে ‘Masochism’ পরিভাষা দুটির সূত্রপাত হয়, সাহিত্য-তত্ত্বে ও মনস্তত্ত্বে, এঁদের দুজনের লেখা এই বইগুলি থেকে প্রাপ্ত ধারণার সূত্র ধরে। ব্রিটিশ লেখক এডওয়ার্ড সেলন-এর চিঠির সংকলন আকারে লেখা ইংরাজী উপন্যাস ‘The New Epicurean’; এক অজ্ঞাতনামা বা Anonymous লেখক প্রণীত গ্রন্থ ‘The Yellow Room’; St. George Stock ছদ্মনামে প্রকাশিত বই ‘The Whippingham Papers’; Lord George Herbert ছদ্মনামে প্রকাশিত উপন্যাস ‘A Night in a Moorish Harem’ —  যারা সাহিত্যে অশ্লীলতার অভিযোগ নিয়ে বাচালতা করেন, সাহিত্যে ব্যবহৃত অমান্য-অমার্জিত-অপভাষা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁরা এই সাতটি বইয়ের একটিও পড়েছেন? নাম শুনেছেন এগুলির?? তাঁরা কি জানেন যে এগুলিকে বিশ্বসাহিত্যের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ বলে গণ্য করা হয়??? কিংবা, আমাদের রায়গুণাকর ভারতচন্দ্রের লেখা ‘রসমঞ্জরী’ গ্রন্থের ছয় পৃষ্ঠায় ‘অথ বিশ্রব্ধ নবোঢ়া’ শীর্ষক অংশে আছে :—

“স্তন দুটি করে ছ্যাঁদা,

উরু দুটি ভুজে বাঁধ্যা,

লাজে ভয়ে মুদিল নয়ন।

প্রথমেতে নিরুত্তর,

না না না তাহার পর,

টাল টোল এখন তখন।

যদি খায়্যা লাজ ভয়,

কিঞ্চিৎ সঞ্চিত হয়,

তবে আর না যায় ধরণ।

নবীন ভূষণ বাস,

নব সুধা হাস ভাষ,

নব রস কে করে গণন।”

সেকালে এই লেখাকেও অর্বাচীন বাঙালী পাঠক অশ্লীল বলে দেগে দিয়েছিলো! যারা একাজ করেছিলো, তাদের নাম আজ আর কেউ মনে রাখে নি; অথচ, ভারতচন্দ্রের নাম কিন্তু বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অক্ষয়, অমর হয়ে আছে। এখন, আমার এই উপন্যাসটির কথা যদি বলেন, তবে সে প্রসঙ্গে বলি, ভাষার ও বিষয়বস্তুর কারণে যদি বাঙালী সমাজে কেউ কেউ আমার বর্তমান গ্রন্থটিকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করতে চান, তবে তাঁরা একটুখানি ইতিহাস স্মরণ করুন। বেশী পিছনে যেতে হবে না, শুধুমাত্র গত শতাব্দীটাই যদি খানিক ফিরে দেখি, তাহলে ইউরোপ-আমেরিকা-এশিয়ার অন্ততঃ পাঁচজন এরকম লেখকের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ১৯৩৩ সালে জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’-কে, ১৯৪৪ থেকে ১৯৫৫ সালের মধ্যে মোট ছয়বার সাদাত হাসান মাণ্টোর ছয়খানি গল্পকে — (‘কালি সালওয়ার’, ‘ধুঁয়া’, ‘বু’, ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’, ‘উপর, নিচে অউর দরমিয়াঁ’, ‘খোল দো’), ১৯৬০ সালে ডি. এইচ. লরেন্সের ‘লেডি চ্যাটার্লীজ লাভার’-কে, ১৯৬১ সালে হেনরি মিলারের ‘ট্রপিক অফ ক্যানসার’-কে, আর ১৯৬২ সালে উইলিয়াম বারোজের ‘নেকেড লাঞ্চ’-কে অশ্লীলতার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলা হয়েছিলো। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই আদালত ঐসব অভিযোগকারীদের গালে ঠাস করে একটি করে প্রতীকী চড় মেরে, ‘লেখাগুলি অশ্লীল নয়’ এই মর্মে রায় দিয়েছিলো। ‘ইউলিসিস’-এর বিরুদ্ধে ওঠা অশ্লীলতার অভিযোগ প্রসঙ্গে নিজের কাকিমা Josephine Murray-র মেয়ে Kathleen-কে জয়েস বলেছিলেন : “If ‘Ulysses’ isn’t fit to read, life isn’t fit to live.” এই বিষয়ে মাণ্টোর বক্তব্যও প্রায় একইরকম : “If you find my stories dirty, the society you are living in is dirty. With my stories, I only expose the truth.” বর্তমান মহাগ্রন্থটির অজ্ঞাত ও অদৃশ্য গ্রন্থকারও নিজের স্বপক্ষে এই একই যুক্তিতে অটল। ঐ যে পাঁচজন লেখককে গত শতাব্দীতে অশ্লীলতার দায়ে হেনস্তা করার চেষ্টা করা হয়, তাঁরা প্রত্যেকেই বিশ্বসাহিত্যে নিজের নিজের কলমের জোরে অমরত্ব অর্জন করেছেন। বাঙালী সমাজের সমস্যাটা আসলে তাদের মননের ও ভাবনাচিন্তার গোঁড়ামোতে। রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতি অত্যন্ত মূল্যবান; কিন্তু মুশকিল হলো এই, যে রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতিকে তার প্রকৃত অর্থে অনুধাবন করতে বাঙালী আজও অক্ষম; যে চশমা দিয়ে বাঙালী জাতি গত দেড়শো বছর ধরে রবীন্দ্রনাথকে দেখছে, তার দু’টি কাচই আফিমের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয়ে আছে, একটি ন্যাকামোর আফিম, আর অপরটি রক্ষণশীলতার আফিম। এই আফিম আসলে ব্যক্তিপূজার ভক্তি। ঠাকুরবাড়ির সংস্কৃতি কিন্তু ন্যাকাও ছিলো না, রক্ষণশীলও ছিলোনা; বরং মুক্তমনা ছিলো, সমকালীন যুগের অগ্রদূতপ্রতিম ছিলো। আর রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তো ছিলেন তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় বিপ্লবী মানসিকতাসম্পন্ন মানুষ, যিনি সততই অচলায়তনের শৃঙ্খল ভাঙ্গার ডাক দিতে তৎপর ছিলেন। অথচ, সেই রবীন্দ্রনাথকে বাঙালী জাতি আজও বুঝতেই পারে নি। যেদিন বাঙালী এটা বোঝার মতো পরিণতমস্তিষ্ক হবে, সেদিন বাঙালী এটাও বুঝবে, যে বাঙালীর রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতি যতখানি মূল্যবান, বাংলা সাহিত্যের স্ল্যাং বা অপভাষা-সংস্কৃতিও ঠিক ততখানিই মূল্যবান; এবং এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। সেদিন আর ভাষার কিংবা বিষয়বস্তুর কারণে বাঙালী সমাজে কোনো বইকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করার মতো বালখিল্য দাবী উঠবে না। আর, যদি কেউ এই মহাগ্রন্থের ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে চান, তবে সর্বাগ্রে তাঁকে এটা উপলব্ধি করতে হবে, যে উৎসবের ভাষা আর বিলাপের ভাষা, প্রতিশোধের ভাষা আর ক্ষমার ভাষা, আশীর্বাদের ভাষা আর অভিশাপের ভাষা কখনোই এক নয়, এক হয় না, এক হতে পারে না। এই মহাগ্রন্থে যে সচেতনভাবেই অমার্জিত তথা অমান্য ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, এটাও এক ধরনের বিপ্লব, ভাষা-বিপ্লব।

Leave a Comment