ভোট আসতে হাতে গোনা আর মাত্র ২০ দিন, আর এরই মধ্যেই ফের নতুন ৭টি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করল নির্বাচন কমিশন (Election Commission Of India)। SIR, কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, আমলা বদল – এসব এখন অতীত, কারণ সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করেছে এমন কিছু যা কল্পনাও করতে পারেনি তৃণমূল-বিজেপি-র মতো কোনও দল।
এবার কেন্দ্রীয় বাহিনীর ওপরেও নিয়ে নেওয়া হল কড়া অ্যাকশন, শুধু তাই নয়, এবার নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে AI-এর মতো প্রযুক্তি – যার ফলে একসাথে চার জনের বেশি বুথে ঢুকলেই মিলবে সিগন্যাল! এমনকি পান থেকে চুন খসলেই হবে পুনর্নির্বাচন!
গত কয়েকদিনেই ৭টিরও বেশি মোক্ষম পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন যা এক প্রকার চাপে ফেলতে পারে রাজ্য সরকারকে! ঠিক কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন? কোন চালেই বা বাজিমাত করবে ECI?
আজ India Hood ডিকোডে আপনাদের সামনে তুলে ধরবো নির্বাচন কমিশনের এমন কিছু কৌশল – যা বদলে দেবে গোটা বাংলার ভোটকে! যা এতদিন ধরে না আপনি দেখেছেন, না আপনি শুনেছেন! তাই ধৈর্য ধরে ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখুন, আর এখনও যদি চ্যানেলটিকে সাবস্ক্রাইব না করে থাকেন তাহলে ঝটপট ক্লিক করে ফেলুন সাবস্ক্রাইব বাটনে। আর টিপে দিন বেল আইকনটি।
গত ১৫ই মার্চ, বাংলায় ভোট ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন।
আর তারপর থেকেই একদিকে করা হয়েছে একাধিক শীর্ষ কর্তায় বদল, অন্যদিকে করা হয়েছে রাজ্যের পুলিশ অফিসারদের বদল। একদিকে ওয়েবক্যামের সাথে আনা হচ্ছে বডিক্যাম ও ড্রোন, আবার অন্যদিকে CRPF-দের ওপর দেওয়া হয়েছে অতিরিক্ত দায়িত্ব। আর এই নিয়ে ইতিমধ্যেই আমাদের একটি বিস্তারিত ভিডিও রয়েছে। এই ভিডিওর শেষে আপনি আই বাটনে ক্লিক করে দেখে নিতে পারেন সেই ডিকোড ভিডিওটি।
তবে এবার আসি নতুন কিছু পদক্ষেপ নিয়ে, যেগুলি বড় রকমভাবে এবার প্রভাব ফেলবে বাংলার ভোটে!
CRPF-দের ওপর অ্যাকশন!
সারা বাংলাজুড়ে চলছে সেনাবাহিনীর রুটমার্চ। আর এরই মধ্যে বীরভূমে দেখা গেল এক অভাবনীয় কাণ্ড। সিউরি তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ক্যারম খেলছে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা। আর সেই ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই, মাঠে নেমে পড়ে নির্বাচন কমিশন। ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করার পর, ওই তিন জওয়ানকে চিহ্নিত করে কমিশন, আর তারপরেই করে দেওয়া হয় সাসপেন্ড। আর নির্বাচনের দায়িত্বে থাকতে পারবেন না তারা।
শুধু তাই নয়, মুর্শিদাবাদের নিমতিতায় স্থানীয় তৃণমূল নেতার ইফতার পার্টিতে যোগ দেওয়ায় সাত জন BSF জওয়ানের বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে ঠিক একই পদক্ষেপ।
ভোটে ব্যবহার হবে AI!
কেবল মোবাইলে নয়, এবার ভোটেও ব্যবহার হবে AI। হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন। রাজ্যের প্রতিটি বুথে নজরদারি বাড়ানোর জন্য এবার বাংলায় নির্বাচনে ব্যবহার করা হবে কৃত্রিম মেধা অর্থাৎ AI প্রযুক্তি। সঙ্গে ব্যবহার করা হবে ওয়েব কাস্টিং প্রক্রিয়াও।
কি বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে? চলুন বুঝিয়ে দিই কীভাবে ব্যবহার করা হবে এই দুই প্রযুক্তি।
প্রথমত, ওয়েব কাস্টিংয়ের জন্য প্রতিটি ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে ৩৬০ ডিগ্রি ঘুরবে এমন ক্যামেরা লাগানো হবে। প্রতিটি বুথের ভেতরে এবং বাইরে দু’টি অথবা তিনটি করে এই ধরনের ক্যামেরা বসানো হবে।
আর দ্বিতীয়ত, বুথে বসানো এই ক্যামেরাগুলিতে থাকবে বিশেষ AI প্রযুক্তি। ফলত, এবার কোনও বুথের ভিতরে একসঙ্গে অনেকে ঢুকে গেলে তা ধরা পড়ে যাবে ক্যামেরায়। আর এরম কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়লেই, তা সরাসরি কন্ট্রোল রুমে জানিয়ে দেবে AI।
আবার EVM-এর সামনে এক জনের বদলে দু’জন চলে গেলে, তা-ও ধরা পড়বে ক্যামেরার সেন্সরে।
পান থেকে চুন খসলেই হবে পুনর্নির্বাচন
আমরা এতদিন দেখে এসেছি – সাধারণত ‘ব্যতিক্রমী’ কিছু ক্ষেত্রে পুনর্নির্বাচন করা হত, যেমন ধরুন – বিশাল ঝামেলায় ভেস্তে গিয়েছে ভোট প্রক্রিয়া, কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভোট দিতে পারেননি কেউ। কিন্তু, ২০২৬ সালের নির্বাচনে সেই নিয়ম কিন্তু অনেকটাই বদলে গেল।
এবার জানানো হয়েছে – কোথাও কোনও ভয় দেখানো বা ভোট দানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলেই সেখানে পুনর্নির্বাচন করা হবে। যদি কেউ হুমকির কারণে ভোট দিতে যেতে না পারেন, এবং তিনি বাড়িতে বসে কমিশনের কাছে বা পর্যবেক্ষকের কাছে ফোন করে অভিযোগ জানান সে ক্ষেত্রেও ওই বুথে পুনর্নির্বাচন করা হবে।
একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশন এ-ও জানিয়ে দিয়েছে, কোনও ধরনের হুমকি, অশান্তি, ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে কোনও ওয়ারেন্ট ছাড়াই পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে।
এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে কমিশন পুনর্নির্বাচনকে জরুরী দৃষ্টিভঙ্গি হিসাবে সামনে রেখে এগোচ্ছে। কমিশনের এক আধিকারিকের কথায়, “আগে রিপোল ছিল ব্যতিক্রমী। এখন সেটিকেই জরুরি ভিত্তিতে করা হবে।”
ভুয়ো প্রচার বন্ধ করার মোক্ষম দাওয়াই!
মাঝে মাঝেই ভোট চলাকালীন সময়ে দেখা যায়, সোশ্যাল মিডিয়ায় পুরানো ঝামেলা, ঘটনার খবর ছড়িয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু, ২০শে মার্চ এই ভুয়ো প্রচার বন্ধ করার উদ্দেশ্যে একটি মোক্ষম নির্দেশিকা দেয় কমিশন। কমিশন জানায়, ভোটের মুখে সংবাদমাধ্যমে টাকা দিয়ে কোনও খবর প্রকাশ করা হচ্ছে কি না, MCMC অর্থাৎ Media Certification and Monitoring Committee তার উপর কড়া নজর রাখবে। এছাড়া, একজন প্রার্থীকে নিজের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টের বিবরণ মনোনয়পত্রেই হলফনামার মাধ্যমে জানিয়ে দিতে হবে।
এমনকি ভোট শেষ হওয়ার ৭৫ দিনের মধ্যে ইন্টারনেট বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচারের খরচের বিবরণ কমিশনকে জানাতে হবে বিভিন্ন দলকে।
বুথের বাইরে থাকবে প্রার্থীর আসল পরিচয়!
এবার ভোটারদের সুবিধার্থে একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। যার মধ্যে একটি হল ভোটারদের জানানো প্রার্থীর আসল পরিচয়। আর সেই জন্য একটি অনন্য নির্দেশিকা দিয়েছে কমিশন।
প্রথমত, বুথের বাইরে চার ধরনের পোস্টার টাঙানো হবে। সেখানে প্রার্থীদের নাম-সহ বিভিন্ন খুঁটিনাটি তথ্য থাকবে। পাশাপাশি ভোট দেওয়ার সময় কী করতে হবে এবং কী করা যাবে না তার তালিকা থাকবে ওই পোস্টারে। ভোটার কার্ড ছাড়া আর কী নথি দেখিয়ে ভোট দেওয়া যাবে, তা-ও লেখা থাকবে।
দ্বিতীয়ত, বুথের কাছে থাকবে ভোটার সহায়তা কেন্দ্রও। সেখানে বুথ স্তরের আধিকারিক অর্থাৎ বিএলও-দের থাকতে বলা হয়েছে। তারা ভোটারদের বুথ চিনিয়ে দেওয়া, ক্রম নম্বর অনুযায়ী কক্ষ চিনিয়ে দেওয়ার কাজ করবেন। আর এই সহায়তা কেন্দ্রগুলি এমন জায়গায় থাকবে, যাতে ভোটাররা সহজে দেখতে পান।
তৃতীয়ত, ভোট কেন্দ্র থেকে ১০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে কোনও মোবাইল ফোন সক্রিয় রাখা যাবে না। হয় তা সুইচ অফ করে দিতে হবে, অথবা সাইলেন্ট রাখতে হবে। ফোন জমা রেখেও বুথে ঢুকতে পারবেন ভোটাররা।
কড়া নির্দেশিকা জারি পুলিশদের জন্য!
রাজ্য পুলিশের শীর্ষকর্তা থেকে নিচু স্তরের কর্মীদের জন্য একগুচ্ছ নির্দেশিকা দিল কমিশন।
প্রথমত, আগের নির্বাচনের সময় রাজ্যে যে সব অপরাধমূলক মামলা হয়েছিল, সেগুলির তদন্ত দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। জানানো হয়েছে, ওই মামলায় শীঘ্রই চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জামিন অযোগ্য যত ওয়ারেন্ট রয়েছে, সেগুলি কার্যকর করতে হবে SDPO-দের। অবিলম্বে পলাতক অপরাধীদের তালিকা তৈরি করতে হবে। তালিকা তৈরি করতে হবে ঘোষিত অপরাধীদেরও। তাঁদের গ্রেফতার করার জন্য বিশেষ অভিযান চালাতে হবে। প্রয়োজনে লুকআউট সার্কুলার জারি করতে হবে। SDPO-দের নিজের কর্মক্ষেত্রের পাশের মহকুমা ও জেলার পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করতে হবে। তাঁদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আদানপ্রদান করতে হবে।
তৃতীয়ত, থানার OC বা SHO-দের মাধ্যমে সব বিধানসভা কেন্দ্রে অশান্তিপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করতে হবে। চিহ্নিত করতে হবে সেই সব ‘গুন্ডা ও দুষ্কৃতীদের’, যাঁরা আগের নির্বাচনে অপরাধে জড়িত ছিলেন। এই নির্দেশ কঠোর ভাবে পালন করতে হবে।
নিষেধাজ্ঞা সিভিক ভলান্টিয়ার ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের!
বিধানসভা ভোটের কোনও ডিউটিতে সিভিক ভলান্টিয়ারদের ব্যবহার করা যাবে না – এই মর্মে রাজ্যের সব জেলার SP এবং পুলিশ কমিশনারদের কাছে একটি লিখিত নির্দেশিকা জারি করেছে কমিশন। শুধু তাই নয়, যদি দেখা যায় – কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে সিভিক ভলান্টিয়াররা কাজ করছেন, তাহলে কড়া শাস্তির মুখে পড়তে হবে।
এছাড়াও, কমিশনের তরফ থেকে, চুক্তিভিত্তিক কর্মী বা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীদের ভোটের কাজে নিযুক্ত না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সব জেলার নির্বাচন আধিকারিকদের। এমনকি যদি ভোটের কাজে কেউ চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে শো–কজ় ও প্রয়োজনে আরও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে – স্থায়ী সরকারি কর্মী বা কেন্দ্রীয় সংস্থার কর্মীদের দিয়েই পোলিং পার্সোনেল গঠন করতে হবে। যাদের ভোটের কাজে নিয়োগ করা হচ্ছে তাঁরা যে সরকারি দপ্তরের স্থায়ী কর্মী, সেটা জানিয়ে আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে মুচলেকা দিতে হবে DEO–দের।
ভোট দেওয়ার জন্য বিশেষ ট্রেন!
কর্মসূত্র হোক কিংবা অন্য কোনও কারণে, অনেকেই ভিনরাজ্যে থাকেন। আর নির্বাচনের সময়ে দেখা যায় ইচ্ছা থাকলেও সঠিক ট্রেন কিংবা ট্রেনের সময়সুচীর কারণে তাঁরা ভোটের সময় আসতে পারেন না। কিন্তু এবার ভোটে যাতে তারা বাংলায় ফিরতে পারেন, তার জন্য একগুচ্ছ বিশেষ ট্রেনের ঘোষণা করল ভারতীয় রেল। দক্ষিণ হোক বা উত্তর ভারত— দেশের নানা প্রান্ত থেকে বিশেষ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। আবার পশ্চিমবঙ্গ থেকেও কেউ যদি অন্য রাজ্যে ভোট দিতে যেতে চান, থাকছে তারও সুবিধা।
রেলের তরফ থেকে সেই মর্মে ইতিমধ্যেই জানানো হয়েছে যে ১লা এপ্রিল থেকে ৩০শে এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২৮টি বিশেষ ট্রেন চালানো হবে। কোনও ট্রেন সাপ্তাহিক, আবার কয়েকটি ট্রেন মিলবে সপ্তাহে দু’বারও।
পটনা, হাজিপুর, অসম, মুম্বই, ওড়িশা, সেকেন্দরাবাদ, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, নাগপুর, রায়পুর, তিরুবনন্তপুরম-সহ দেশের নানা প্রান্ত ছুঁয়ে যাবে এই বিশেষ ট্রেনগুলি। কোনও ট্রেন ছাড়বে হাওড়া, কোনওটা আবার কলকাতা স্টেশন থেকে। রেল সূত্রে খবর, সেই সব রাজ্যের কোনও বাসিন্দা যদি পশ্চিমবঙ্গে থাকেন, তবে নির্বাচনের সময়ে তাঁরাও বাড়ি ফিরে যাতে ভোট দিতে পারেন, সে ভাবেই বিশেষ ট্রেনের রুট ঠিক করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আপনারা বুঝতেই পারছেন – ভোট যত এগিয়ে আসছে ততই নতুন নতুন মোক্ষম দাওয়াই নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। আপনার কী মনে হয়ে এবারের নির্বাচন কি নিরপেক্ষ হবে? নাকি জলে যাবে কমিশনের সমস্ত ব্রহ্মাস্ত্র? কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না আপনার মতামত।