৪০০ টন আবর্জনা ও খচ্চরের বিষ্ঠা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, নজির গড়বে অমরনাথ যাত্রা

অনন্যা সরকার, শ্রীনগর: প্রতিবছর শ্রী অমরনাথ যাত্রায় (Amarnath Yatra) লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম হয়। ৫১ দিনব্যাপী এই যাত্রা যেমন একদিকে ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র, তেমনই এর মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার (Waste Management) এক নতুন পথও উন্মোচিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী যাত্রা যোগ দিলেও যাতে হিমালয়ের মনোরম চূড়ায় বা যাত্রাপথে আবর্জনা না ছড়ায়, তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যাত্রা চলাকালীন একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের দ্রব্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বর্জ্য কমাতে ভক্তদের কাপড়ের ব্যাগ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়াও, বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট চালানোর জন্য বিশেষ যন্ত্র দিয়ে খচ্চরের মল সংগ্রহ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জৈব জ্বালানি উৎপাদন করাও যাবে, আবার তীর্থযাত্রার পথের সমস্ত বর্জ্যও দূর হবে।

অমরনাথ যাত্রা হয়ে উঠেছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এক সফল উদাহরন

শ্রী বাবা অমরনাথ শ্রাইন বোর্ড ইন্দোর-ভিত্তিক এনজিও ‘স্বাহা রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’-কে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছে। কোম্পানির সিইও ডঃ সমীর শর্মা জানিয়েছেন যে, ট্রেকের চলাকালীন রাস্তায় যেন কোনো আবর্জনা না জমে তা নিশ্চিত করার জন্য নজরদারি চালানো হচ্ছে। যা বর্জ্য উৎপন্ন হবে, সবই আলাদাভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হবে বলেও জানান তিনি। যাত্রা শেষ হওয়ার পর পরিবেশকর্মীরা পুরো ট্রেকের পথ আবর্জনা মুক্ত আছে কিনা, তা নিশ্চিত করবেন এবং পাহাড় শৃঙ্গ সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করার পরই তারা জায়গা ছাড়বেন। পবিত্র গুহার দিকে যাওয়ার উভয় পথেই বহু ডাস্টবিন বসানো হয়েছে এবং তীর্থযাত্রার সময় উৎপন্ন কঠিন ও তরল বর্জ্য সংগ্রহের জন্য সাফাইকর্মী মোতায়েন থাকবে। তিনি জানান, তীর্থযাত্রীদের আচরণে পরিবর্তন আনাও এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এ বছর অমরনাথ যাত্রায় তীর্থযাত্রীর সংখ্যা ৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত ৩ জুলাই তীর্থযাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যেই ২.৫ লক্ষেরও বেশি ভক্ত অমরনাথ গুহায় বাবা বরফানির দর্শন করেছেন। অনুমান করা হচ্ছে, এ বছরের তীর্থযাত্রার সময় উভয় তীর্থপথ থেকে সংগৃহীত আবর্জনার পরিমাণ প্রায় ৪০০ টন পর্যন্ত হতে পারে। তবে দর্শনার্থীর সংখ্যা ৬ লক্ষে পৌঁছালে আবর্জনার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। সঠিক পরিকল্পনার সাথে এই সমস্যা মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।  

প্লাস্টিক দূষণ আটকাতে তীর্থযাত্রার পথে আটটি ওয়াটার এটিএম (Water ATM) স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি এটিএম প্রতি ১২ ঘণ্টায় প্রায় ৬,০০০ লিটার পানীয় জল সরবরাহ করা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা তীর্থযাত্রীদের প্যাকেটজাত জল ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দূর করবে। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৫০,০০০ প্লাস্টিকের বোতল এবং পুরো তীর্থযাত্রায়  প্রায় ৩০ লক্ষ প্লাস্টিকের বোতলের ব্যবহার কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তীর্থযাত্রার পথে চলাচলকারী ২৫,০০০-৩০,০০০ খচ্চরদের থেকে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে মল উৎপাদিত হয়, যা রাস্তার পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা নষ্ট করে। তাই এই প্রথম খচ্চরের গোবর সংগ্রহের মেশিন স্থাপন করা হয়েছে এবং এই বর্জ্যকে মিথেন গ্যাসে রূপান্তর করার জন্য ৫ ঘনমিটারের বায়োগ্যাস প্ল্যান্টও বসানো হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে পশুর বর্জ্য থেকে পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি উৎপাদন করা ও তীর্থযাত্রার পথে দূষণ কমানো উভয়ই সম্ভব হবে। বালতাল প্রদর্শনী কেন্দ্রে একটি মিথেন-চালিত বাতি স্থাপনও করা হয়েছে।

আরও পড়ুনঃ ভারতের সর্ববৃহৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সাইবার হামলা, ফাঁস ১৯ হাজারের বেশি নথি

দর্শনার্থীরা পলিথিনের ব্যাগ নিয়ে আসলেও, তাঁদেরকে সেটি বেস ক্যাম্পের বাইরে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এর বদলে তাঁদের বিনামূল্যে কাপড়ের ব্যাগ সরবরাহ করা হবে। দুটি বেস ক্যাম্পেই দেড় লক্ষ কাপড়ের ব্যাগ মজুত রাখা হয়েছে। এছাড়া যাত্রাপথে দোকানদার এবং খাদ্য বিতরণকারী সংস্থাগুলিকে খাবার পরিবেশনের জন্য শুধুমাত্র স্টিলের থালা ও গ্লাস ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এমনকি, প্লাস্টিকের গ্লাস ব্যবহার করলে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হবে। স্বাহা রিসোর্স ম্যানেজমেন্টকে ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হলেও জম্মু ও কাশ্মীরের গ্রামীণ স্যানিটেশন বিভাগ এই কর্মসূচির তত্ত্বাবধান করবে। যাত্রাপথে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার জন্য ৪,০০০ কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে, এবং ৬২৩ জন সাফাইকর্মী শুধুমাত্র ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের দায়িত্বে থাকবেন। 

Leave a Comment