অনন্যা সরকার, পূর্ব মেদিনীপুর: যখন সংকল্প হয় দৃঢ়, তখন শূন্য থেকে শুরু করলেও খুলে যায় সাফল্যের দরজা। পূর্ব মেদিনীপুর জেলার বাসিন্দা স্মৃতিলেখা এবছর সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় (NEET UG 2026) ৭২০-এর মধ্যে ৬০৩ নম্বর পেয়ে বহু নিট পরীক্ষার্থীর কাছে এক অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন (NEET UG Success Story of Smritilekha)। তিনি ডাক্তার হতে চেয়েছেন নিজের জন্য নয়, তাঁর গ্রামের মানুষদের কাছে ভালোভাবে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ায় উদ্দেশ্যে। কারণ তাঁর গ্রাম থেকে নিকটবর্তী হাসপাতালে পৌঁছাতেই লেগে যায় ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময়। অনেক গুরুতরভাবে অসুস্থ মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হলে সমস্যার পড়েন গ্রামবাসীরা। দীর্ঘদিন ধরে গ্রামের মানুষের এই সমস্যা দেখে সরকারি চাকরি ছেড়ে ডাক্তার হওয়ার সংকল্প করে নিটের প্রস্তুতি শুরু করেন স্মৃতিলেখা। আসুন তার এই সাফল্যের কাহিনীটি জেনে নেওয়া যাক।
গ্রামের মানুষদের সেবা করার উদ্দেশ্যে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন স্মৃতিলেখার
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার এক ছোট গ্রাম, পৌশির বাসিন্দা স্মৃতিলেখা জানান, তাঁর গ্রামে এখনও কোনো হাসপাতাল নেই। কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য তাঁদের কয়েক কিলোমিটার দূরের হাসপাতালে যেতে হয়। অনেক সময় সঠিক সময়ে হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারার কারণে মানুষ প্রাণও হারান। মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা স্মৃতিলেখার। তাঁর বাবা-মা, বিমল কুমার গিরি ও রিতা গিরি দুজনেই স্কুল শিক্ষক। ছোট থেকেই বাবার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর মেয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করুক।
আরও পড়ুন: ১১ বছর বয়সে হয়ে যায় বিয়ে, দারিদ্রতার সঙ্গে লড়াই করে ৫ বারের চেষ্টায় NEET-এ সফল
পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞান (PCMB) নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণি পাস করার পর স্মৃতিলেখা কেন্দ্রীয় সরকারের ডাক বিভাগে (India Post) একটি চাকরি পেয়েছিলেন। তবে নিরাপদ সরকারি চাকরি থাকা সত্ত্বেও, তিনি এতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই নিট পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন স্মৃতিলেখা। শুরুর দিকে চাকরি ও নিটের প্রস্তুতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল, যার ফলে তাঁকে পড়াশোনা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়। দুই বছর চাকরি করার পর, পরিচিতদের কটাক্ষের শিকার হয়েও বাবা-মায়ের সমর্থনে তিনি চাকরি ছেড়ে দেন।
এরপর, নতুন করে প্রস্তুতি শুরু করতে তিনি শিলিগুড়ির ‘পিডাব্লিউ বিদ্যাপীঠ’ (PW Vidyapeeth)-এ ভর্তি হন। দুই বছরের বিরতির পর আবার শিক্ষাজীবনে প্রবেশ করা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল, তবে শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলে তিনি ধীরে ধীরে নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরে পান। তাঁর কঠোর পরিশ্রম বিফলে যায়নি। তিনি ২০২৫ সালের নিট পরীক্ষায় প্রাপ্ত ৪৭০ স্কোরকে এবছর ৬০৩-এ উন্নীত করেছেন। পাশাপাশি, তাঁর অল ইন্ডিয়া র্যাঙ্ক (AIR) ৯১,৯৪১ থেকে ৯,০৬৫-এ এগিয়ে এসেছে এবং এবছরের নিট পরীক্ষায় সেরা ১০,০০০ পরীক্ষার্থীর তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে, স্মৃতিলেখা।
আরও পড়ুন: প্রকাশ্যে ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা’-র বিজ্ঞপ্তি, এরা করতে পারবেন না আবেদন
স্মৃতিলেখা এখন বড় ডাক্তার হয়ে নিজের গ্রামে একটি হাসপাতাল গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন, যাতে গ্রামবাসীরা সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পরিষেবা পেতে পারেন। আগামীদিনের নিট পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে স্মৃতিলেখা পরামর্শ দেন, নিজের ওপর আস্থা রেখে লক্ষ্যের প্রতি অবিচল থাকলেই সাফল্য আসবে। তার সাথে শিক্ষকদের নির্দেশ মেনে চলা এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির সময় এনসিইআরটি (NCERT)-এর পাঠ্যবইগুলোকে উপেক্ষা না করলে নিটের মতো কঠিন পরীক্ষায় ভালো নম্বরের সাথে পাশ করা সম্ভব।