অনন্যা সরকার, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্য, শিক্ষা বা পরিবহনের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের জন্য নানা ব্যবস্থা ও নীতি গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি, রেশন বন্টন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনতে এবং দুর্নীতি রুখতেও একাধিক কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে রাজ্যের নতুন সরকার। গত সরকারের আমলে বিপুলসংখ্যক অযোগ্য ব্যক্তিদের রেশন কার্ড (Ration Card) দেওয়া নিয়ে অভিযোগ ওঠে। সে দিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে সরকার। বর্তমানে উপভোক্তাদের রেশন কার্ড যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গ খাদ্য ও সরবরাহ দফতর (Food and Supply Department)। কাদের নাম বাদ পড়ছে রেশন প্রাপকের তালিকা থেকে, কী কী যোগ্যতার ভিত্তিতে আপনার রেশন কার্ডটি সচল রাখবেন, আসুন জেনে নেওয়া যায়।
শুরু হয়েছে রেশন কার্ড যাচাইয়ের প্রক্রিয়া
ভারতের জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইনের অধীনে দেশের দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে ভর্তুকি মূল্যে চাল, ডাল, গমের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়। তবে দুর্নীতির কারণে বহু ‘অযোগ্য’ মানুষ রেশন প্রাপকের তালিকায় অন্যায়ভাবে ঢুকে পড়ায় অসংখ্য যোগ্য পরিবারকে রেশন ব্যবস্থার সুবিধাগুলি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সরকারের অনুমান, বর্তমানে রেশন তালিকায় এমন অনেক উপভোক্তা আছেন, যাঁদের বার্ষিক আয় নির্ধারিত সীমার বেশি। এছাড়া, ভুয়ো রেশন কার্ডধারী ও মৃত ব্যক্তির নামে অপর কোনো ব্যক্তি রেশন সংগ্রহ করছে – এমন অভিযোগও সামনে এসেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে তাই এই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে সুবিধাভোগীদের রেশন কার্ড যাচাইকরণের কাজ শুরু করেছে। এই যাচাইকরণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভালোভাবে বুঝতে গেলে আগে জানতে হবে কত ধরনের রেশন কার্ড রয়েছে এরাজ্যে। উত্তরটি হল তিন।
১. অন্ত্যোদয় অন্ন যোজনা রেশন কার্ড (AAY)
দেশের দারিদ্র্যসীমার নীচে (BPL) থাকা পরিবারগুলি এই কার্ডের অধীনে রেশন সংগ্রহ করে। এই কার্ড দিয়ে প্রতিটি পরিবার ২১ কেজি চাল এবং ১৩ কেজি ৩০০ গ্রাম আটা কিংবা ১৪ কেজি গম বিনামূল্যে পায়। এছাড়া, রেশন দোকান থেকে ১৩ টাকা ৫০ পয়সা কেজি দরে চিনিও কিনতে পারেন তারা।
২. বিশেষ অগ্রাধিকারযুক্ত পরিবারের জন্য রেশন কার্ড (SPHH)
যেসমস্ত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল পরিবার বছরে ৪৪ হাজার থেকে ৫৯ হাজার বা ১.২ লক্ষ আয় করে, তাদের এই এসপিএইচএইচ শ্রেণিভুক্ত করা হয়। যাদের এই কার্ড রয়েছে, তারা মাথাপিছু বিনামূল্যে ৩ কেজি চাল এবং মাথাপিছু ১ কেজি ৯০০ গ্রাম আটা পান। তবে আটার বদলে মাথাপিছু ২ কেজি করে গমও মেলে।
৩.অগ্রাধিকারযুক্ত পরিবারের রেশন কার্ড (PHH)
এই রেশন কার্ড থাকলে প্রতিটি উপভোক্তা মাথাপিছু ৩ কেজি চাল ও ১ কেজি ৯০০ গ্রাম আটা/২ কেজি গম পান। তবে এই প্রধান তিনটি ক্যাটাগরি ছাড়াও আরকেএসওয়াই I (RKSY I), আরকেএসওয়াই II (RKSY lI)- এই দুই ধরনের রেশন কার্ডও রয়েছে, যাদের প্রতিমাসে মাথাপিছু যথাক্রমে ৫ কেজি ও ২ কেজি করে বিনামূল্যে চাল দেওয়া হয়।
আরও পড়ুন: ১ কোটি অনুপ্রবেশকারীকে খাদ্যশস্য! মমতা সরকারের ১৮ হাজার কোটির রেশন দুর্নীতি
কোন কোন কারণে বাতিল করা হচ্ছে রেশন কার্ড?
শহরাঞ্চলের ক্ষেত্রে তিনটি বা তার বেশি ঘর রয়েছে এমন পাকবাড়িতে বসবাস করলে বাতিল হচ্ছে রেশন কার্ড। এর পাশাপাশি, বাড়িতে এসি মেশিন, ইন্টারনেট সংযোগ যুক্ত কম্পিউটার বা ল্যাপটপ, ল্যান্ডলাইন ফোন, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন, চার চাকা ও টু হুইলার থাকলেও সেই পরিবারগুলির রেশন কার্ড বাতিল করা হচ্ছে। কোনো রেশন প্রাপক যদি ইনকাম ট্যাক্স বা প্রফেশনাল ট্যাক্স দেন বা তিনি রাজ্য/কেন্দ্রীয় সরকারের গেজেটেড কর্মচারী, সরকার পোষিত বা সাহায্যপ্রাপ্ত অফিসের কর্মচারী হন, তাহলেও রেশন তালিকা থেকে বাদ যাবে নাম।
আরও পড়ুন: ছুটির দিনে দুর্যোগ, দক্ষিণবঙ্গের ৯ জেলায় বৃষ্টির সম্ভাবনা, আজকের আবহাওয়া
কিষাণ ক্রেডিট কার্ড থাকলে বাতিল রেশন কার্ড!
গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারীদের ক্ষেত্রে, যাদের টু/থ্রি/ফোর হুইলার/ফিশিং বোট, কৃষিকাজের জন্য ট্র্যাক্টর বা সমতুল্য মেশিন বা গাড়ি, সরকারের কাছে রেজিস্টার্ড কৃষি ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে কোনও উদ্যোগ বা ব্যবসা, ৫০ হাজার বা তার বেশি লিমিটের কিষাণ ক্রেডিট কার্ডে অনুমোদিত ঋণ, সেচের কাজে ব্যবহৃত মেশিন সহ ২.৫ একর বা তার বেশি সেচযোগ্য জমি, দুই বা তিন ফসলি পাঁচ একর বা তার অধিক আকারের জমি, পরিবারের কোনো ব্যক্তির ১৫ হাজার টাকা বা তার বেশি উপার্জন, আয়করদাতাদের রেশন কার্ড বাতিল করা হচ্ছে। এছাড়া, বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ফোন বা রেফ্রিজারেটর রয়েছে এবং তিন বা তার বেশি পাকাঘর রয়েছে এমন বাড়ির বাসিন্দাদের রেশন বাতিলের প্রক্রিয়া চলেছে।
রেশন ব্যবস্থায় দুর্নীতি আটকানো প্রসঙ্গে খাদ্যমন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়া বলেন, আগে যেভাবে মধ্যস্বত্বভোগীরা রেশনের ৭০ শতাংশ টাকাই আত্মসাৎ করতো, তা আর নতুন সরকার বরদাস্ত করবে না। কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারে একত্রিত হয়ে প্রকৃত উপভোক্তাদের কাছে রেশন পৌঁছে দেবে। রেশন প্রক্রিয়ায় আরও স্বচ্ছতা ও মসৃণতা আনতে অনলাইনের মাধ্যমে রেশন বন্টনের পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। এই ‘স্মার্ট রেশন’ (Smart Ration) ব্যবস্থার মাধ্যমে ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করে, তা গ্রাহকদের হাতে তুলে দেওয়া থেকে রেশন কার্ড সংক্রান্ত সমস্ত কাজ পরিচালনা – সবই ডিজিটাল পদ্ধতিতে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।