অনন্যা সরকার, কলকাতা: পরমপ্রিয় ইলিশের (Ilish) জন্য বাঙালিদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার দিন শেষ। আর সমুদ্র বা নদীর মোহনায় ইলিশ ওঠার অপেক্ষায় হাপিত্যেশ করে বসে থাকতে হবে না ইলিশপ্রেমীদের। পুকুরে জাল ফেললেই উঠে আসবে টাটকা রূপোলি শস্য। হ্যাঁ, আবদ্ধ জলাশয়ে ইলিশ মাছের চাষ (Hilsa Farming) করে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে ব্যারাকপুরের কেন্দ্রীয় অভ্যন্তরীণ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বা সিফরি (ICAR-CIFRI)। কীভাবে এই অসাধ্য সাধন সম্ভব হল, আসুন জেনে নিই।
জলাশয়ে ইলিশ চাষে এল ব্যাপক সাফল্য
প্রতিবছরই ইলিশের চাহিদার তুলনায় যোগান থাকে অল্প। সেই সমস্যার সমাধান করতে ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই গবেষণা চালাচ্ছে সিফরি। তাদের পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, নির্দিষ্ট পরিবেশে আবদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে ইলিশ মাছের বৃদ্ধি সম্ভব। এই গবেষণায় সিফরির রহড়া কেন্দ্র বড় ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া, কাকদ্বীপ ও কোলাঘাট কেন্দ্রও গবেষণা চালাচ্ছে।
আরও পড়ুন: স্কুল-কলেজের সিলেবাসে এবার শ্যামাপ্রসাদের জীবনী, মতামত জানাতে চালু হবে নতুন পোর্টালও
তারা জলাশয়ে মধ্যে ইলিশ মাছকে বড় কেস তোলার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন। মাছগুলিকে স্বাভাবিক খাদ্যের পাশাপাশি বিশেষভাবে তৈরি করা ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন, জুপ্ল্যাঙ্কটন ও আলাদাভাবে বানানো পুষ্টিকর খাদ্য দিয়ে ইলিশ মাছগুলিকে তাড়াতাড়ি বড় করার ব্যবস্থা করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ এই সংস্থার প্রধান বৈজ্ঞানিক শ্রীকান্ত সামন্ত জানিয়েছেন যে, ইলিশ মাছ স্বাভাবিকভাবেই খুব ধীরে ধীরে বড় হয়। জন্মানোর পর প্রথম বছরে মাছের ওজন প্রায় ১৫০ গ্রাম হয়, দ্বিতীয় বছরে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামে পৌঁছায়। সাধারণত বাজারে যে ইলিশ পাওয়া যায়, সেগুলির বয়স ৩ থেকে ৩.৫ বছর হয়।
গবেষকরা পুকুরে সর্বোচ্চ ৯৯২ গ্রাম ওজনের ইলিশ উৎপাদন করে নজির গড়েছেন। বর্তমানে আবদ্ধ জলাশয়ের মধ্যে ইলিশের সম্পূর্ণ প্রজননের পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা চালানো হচ্ছে। গবেষকরা জানাচ্ছেন, এই ক্ষেত্রেও যদি সফলতা আসে, তাহলে আগামীদিনে যেকোনো জলাশয়ে বাণিজ্যিকভাবে ইলিশ মাছ চাষ করা সম্ভব হবে। ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বহু মৎস্যজীবী।
আরও পড়ুন: সুখবর কর্মীদের জন্য, টাকা তোলার নিয়ম শিথিল করল EPFO
গবেষকরা বলেছেন, ইলিশের শরীরে যেহেতু পটকা নেই, তাই তাদের অক্সিজেনের প্রয়োজন হয় বেশি। ফলে পুকুরে বড় করার সময় এক জলাশয় থেকে অন্য জলাশয়ে স্থানান্তর করার ঝুঁকি নেওয়া উচিত নয়। পর্যাপ্ত অক্সিজেনের যোগান রেখে জলের মান বজায় রেখেও আবদ্ধ জায়গায় ইলিশ মাছকে বড় করে তোলা সম্ভব। তাঁদের মতে, দেশীয় প্রজাতির ইলিশ মাছের উৎপাদন বাড়াতে খোকা বা ছোট ইলিশ ধরা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। চাইনিজ নেট ও ৯০ মিলিমিটারের কম ফাঁসের জাল দিয়ে ইলিশ মাছ ধরা যাবে না। এছাড়া, সরকার যেসময়টা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করবে, অর্থাৎ ‘ব্যান পিরিয়ডে’ মাছ না ধরলে স্বাভাবিকভাবেই ইলিশের সংখ্যা বাড়বে।
গবেষণায় সফলতা পাওয়ার পর ব্যারাকপুর কেন্দ্রের ডিরেক্টর ড. প্রদীপ দে জানান, গবেষণায় আশাপ্রদ সাফল্য মিলেছে। অদূর ভবিষ্যতে আরও উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে জলাশয়ের মধ্যে ইলিশ চাষ করা আরও সহজ হয়ে উঠবে। এতে যেমন একদিকে উপকৃত হবেন মৎস্যচাষীরা, তেমনই বাজারে যোগান বাড়ায় সাধারণ ক্রেতারা সাশ্রয়ী মূল্যে তাদের প্রিয় মাছ কিনতে পারবেন।