অনন্যা সরকার, মহারাষ্ট্র: মায়েরা সন্তানের জন্য সব করতে পারেন – এটা যে শুধু মুখের কথা নয়, তাই প্রমাণ করলেন ৪৭ বছর বয়সী মহারাষ্ট্রের রমাবাই রণবীর। কোনও দামি স্পোর্টস শু বা আরামদায়ক ট্র্যাকস্যুট ছিল না, ট্রেনার তো দূরের কথা। শুধু গায়ে ছিল প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমের শক্তি আর মনের মধ্যে দুই মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা! এই সংকল্প ও সাহসের জোরেই, পেশায় রাঁধুনি রমাবাই শাড়ি পরে হাতে চপ্পল তুলে নিয়ে খালি পায়ে দৌড়েই মহারাষ্ট্রের বীড জেলার আম্বাজোগাইয়ে অনুষ্ঠিত ম্যারাথন (Marathon) প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করলেন। বিজয়ী হয়ে ৩ হাজার টাকার প্রথম পুরস্কার জিতে নিয়েছেন তিনি।
রমাবাইয়ের জয়ে চোখে জল দর্শকদের
শনিবার সকালে আম্বাজোগাইয়ের ভারতীয় শিক্ষণ প্রসারক সংস্থার খোলেশ্বর এডুকেশনাল কমপ্লেক্সের অমৃত মহোৎসব বর্ষ উপলক্ষে ছত্রপতি শিবাজি মহারাজ চক এবং ভগবান বাবা চকের মধ্যে ‘অমৃত দৌড়’ নামে এক ম্যারাথন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সেখানেই পেশাগত দৌড়ের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এমন তরুণ-তরুণীদের পেছনে ফেলে ৪৭-এর রমাবাইয়ের এই অভূতপূর্ব জয় উপস্থিত সকলের চোখে জল এনে দিয়েছিল। পুরো ক্যাম্পাস তাঁর বিজয়ের আনন্দে হাততালির উচ্চকিত ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে।
অতি সাধারণ একটি শাড়ি পরে রমাবাই সেদিন ভিড়ের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বাকিরা ভেবেছিল তিনি হয়তো আর পাঁচ জনের মতোই দর্শক। কিন্তু পতাকা উড়িয়ে বাঁশি বাজার সাথে সাথেই রমাবাই দৌড়াতে শুরু করলেন এবং অসীম শক্তি ও মনোবলের জোরে জিতেও নিলেন প্রতিযোগিতাটি। দৌড়ানোর সময় তাঁর দুই চপ্পল পা থেকে পিছলে যেতে থাকায় বারবার গতিভঙ্গ হচ্ছিল। তাই তিনি চটি দুটো খুলে হাতে তুলে নিয়ে খালি পায়েই দৌড়াতে থাকেন। শুরুতে অনেক প্রতিযোগীই তাঁকে পিছনে ফেলেছিল। কিন্তু কিছুটা পথ যাওয়ার পর রমাবাই তাঁর গতি বাড়িয়ে দেন এবং ট্র্যাকস্যুট ও স্পোর্টস শু-দের একে একে পেছনে ফেলতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন: এদের ভাতা বাড়ল ২০০০ টাকা, আজ থেকেই কার্যকর, বড় ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
বৃষ্টির কারণে ঠান্ডা, স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে থাক রাস্তা, বা পায়ে বিঁধতে থাকা পাথরের কণা কোনকিছুই তাঁর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। শাড়ির আঁচল ধরে প্রাণপণ দৌড়াতে থাকেন রমাবাই এবং শেষমেষ তিনি সবার আগে ফিনিশিং লাইনে পৌঁছে প্রথম স্থানটি অধিকার করে নেন। আয়োজকরা যখন তাঁকে পুরস্কার দিচ্ছেন, তখন রমাবাই আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, তিনি প্রতিদিন তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য দৌড়ান, আজ নিজের জন্য দৌড়েছেন।
উল্লেখ্য, স্বামীর মৃত্যুর পর দুই মেয়ের লালন-পালন ও পড়াশোনার সম্পূর্ণ দায়িত্ব রমাবাইয়ের কাঁধে এসে পড়ে। মেয়েদের সুশিক্ষিত করার জেদ নিয়ে, তিনি তাঁর পৈতৃক গ্রাম হিঙ্গোলি ছেড়ে আম্বাজোগাইয়ে এসে বসবাস শুরু করেন। আম্বাজোগাইয়ের জ্ঞানদীপ একাডেমিতে রাঁধুনি হিসেবে কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করেন রমাবাই। মেয়েদের একটি উন্নত ভবিষ্যত দেওয়ার জন্য তাঁর এই কঠোর পরিশ্রম এবং ম্যারাথনে তাঁর এই অসামান্য বিজয় সকলের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।