অনন্যা সরকার, কলকাতা: ফুটপাথ (Footpath) রয়েছে তবে তাতে হাঁটতে পারেন না পথচারীরা। কলকাতা শহরের এ চেনা চিত্র। ধর্মতলা থেকে হাতিবাগান পর্যন্ত শহরের ফুটপাথগুলোর দিকে তাকালেই এই কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। ফুটপাথগুলির ওপর পথচারীদের আর কোনও প্রকৃত অধিকার নেই। হকারদের অবৈধ দখল, যেখানে সেখানে পার্ক করে রাখা বাইক, গাড়ি এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে এই পথগুলোর প্রকৃত ব্যবহার আজ প্রায় বন্ধ। ফলে সাধারণ নাগরিকরা মূল রাস্তায় নেমে যানবাহনের ভিড়ের মধ্যে চলতে বাধ্য হন, যা যেকোনও মুহূর্তে একটা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। তবে এই চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে, অন্ধ্রপ্রদেশ (Andhra Pradesh) সরকার ভারতীয় নগর পরিকল্পনায় একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ফুটপাথে হাঁটার অধিকারকে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হিসেবে নীতি প্রনয়ন করেছে রাজ্যটি।
পথচারী সুরক্ষার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করল অন্ধ্রপ্রদেশ
অন্ধ্রপ্রদেশ দেশের প্রথম রাজ্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পথচারী নিরাপত্তা ও সর্বজনীন সুগম্যতা নীতি ২০২৬’ (Pedestrian Safety and Universal Accessibility Policy 2026) বাস্তবায়ন করেছে। সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) ঐতিহাসিক নির্দেশের ওপর ভিত্তি করে, এই পলিসির ফলে পথচারীদের ‘হাঁটার অধিকার’ এখন একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতিলাভ করেছে। কলকাতা শহরের এই দীর্ঘদিনের ফুটপাথ সংকটের পরিস্থিতিতে, অন্ধ্রপ্রদেশের এই আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার পথপ্রদর্শক হওয়ার পাশাপাশি, সমস্যাটি নিয়ে পর্যালোচনা করারও প্রয়োজনীয়তাকে উস্কে দিয়েছে।
অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার চায় এই নতুন নীতির মাধ্যমে নগর পরিকল্পনাকে যানবাহন-কেন্দ্রিক করার পরিবর্তে জনকেন্দ্রিক করে তুলতে। যেমন – এই নীতিতে ফুটপাতে হাঁটার জন্য ন্যূনতম দুই মিটার প্রস্থ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বিশেষভাবে সক্ষম ও বয়স্কদের জন্য হুইলচেয়ার র্যাম্প, স্পর্শ-নির্ভর নির্দেশক এবং ব্রেইল বা শ্রবণযোগ্য সংকেত অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: শীঘ্রই পিস প্রতি ২০-২৫ টাকায় বিক্রি হবে ডিম? নেপথ্যে এই একটি জিনিস
এছাড়াও, ফুটপাতে দখলদারি আটকাতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিও গ্রহণ করবে অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার। মোটর ভেহিকেল আইনের ১৯৮এ ধারা প্রয়োগ করে এই নীতিতে ত্রুটিপূর্ণ ম্যাপ বা ফুটপাত নির্মাণে অবহেলার কারণে হওয়া দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ইঞ্জিনিয়ার, ঠিকাদার এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিধানও রয়েছে।
সর্বক্ষণের নজরদারি নিশ্চিত করতে এবং ফুটপাতকে সুগম রাখতে সিসিটিভি ক্যামেরা, জিআইএস ম্যাপিং, ড্রোনের মতো ডিজিটাল প্রযুক্তিরও সাহায্য নেওয়া হবে। অর্থাৎ এককথায় বললে, এই নীতিটি কলকাতার জন্য একটি মূল্যবান শিক্ষা হয়ে উঠতে পারে। শহরে অবৈধভাবে দখল করা ফুটপাতের উচ্ছেদের জন্য মাঝেমধ্যে প্রশাসনিক বা আইনি উদ্যোগ দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই অবস্থা আবার যে-কে-সেই। এর মূল কারণ হল রাজ্যে পথচারীদের জন্য কোনও নির্দিষ্ট বাধ্যতামূলক নীতি নেই। তবে, অন্ধ্রপ্রদেশের নীতিটি কাগজে-কলমে যুগান্তকারী মনে হলেও, এটিকে সফলভাবে বাস্তবায়িত করে তোলাই বড় চ্যালেঞ্জ। যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা হলে বহু মানুষের জীবিকা নির্বাহে সমস্যা সৃষ্টি হবে, যা সমাজের বৈষম্যমূলক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবুও, অন্ধ্রপ্রদেশ দেখিয়ে দিল যে শহরের রাস্তা শুধু যানবাহনের জন্য নয়, এর ওপর প্রাথমিক অধিকার রয়েছে পথচারীদেরই।