অনন্যা সরকার, কলকাতা: এবার বাড়িঘর, রাস্তা তৈরির কাজে ব্যবহার করা যাবে মানব বর্জ্য (Human Waste)। কী অবাক হচ্ছেন? কিন্তু এটাই সত্যি। ভারতের বিজ্ঞানীরা এমন এক নতুন ধরনের কংক্রিট (Concrete) তৈরি করেছেন যাতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রক্রিয়াজাত মানব বর্জ্য। আর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি হল এটি প্রচলিত কংক্রিটের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বলে দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। মণিপাল ইউনিভার্সিটি, জয়পুরের সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রঘুবেশ তিওয়ারি এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষকদের দলটি ভারতের ওয়ারাঙ্গলের একটি শোধনাগার থেকে সংগৃহীত মানব বর্জ্য থেকে তৈরি ‘বায়োচার’ (Biochar) দিয়ে তৈরি করছে এই বিশেষ ধরনের কংক্রিটটি।
বায়োচার কী?
বায়োচার হল কার্বন-সমৃদ্ধ এক ধরনের পদার্থ, যা অত্যন্ত কম অক্সিজেনের উপস্থিতিতে জৈব পদার্থকে উত্তপ্ত করে তৈরি করা হয়। এই সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রক্রিয়াজাত পয়ঃপ্রণালীর বর্জ্যের কাদা বা স্লাজ (Sewage Sludge) শুকিয়ে ৩৫০ থেকে ৪৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় উত্তপ্ত করা হয়েছিল। তারপর সেটিকে পিষে মিহি গুঁড়ো বানানো হয়।
গবেষকরা ধাপে ধাপে কংক্রিটে ব্যবহৃত সিমেন্টের ৫%, ১০% এবং ১৫% অংশ এই বর্জ্য-ভিত্তিক বায়োচার দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছেন। এরপর এই নমুনাগুলোর মজবুতি, জল শোষণ ক্ষমতা, সংকোচনের পরিমাণ এবং ছিদ্র হওয়ার প্রবণতা (Porosity) পরীক্ষা করা হয়। আর এর থেকে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। ৯১ দিন কিউরিং বা জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ার পর, ৫% বায়োচারযুক্ত কংক্রিটের সংকোচন সহ্য করার ক্ষমতা ২০% এবং নমনীয়তা-সহন ক্ষমতা ৩৬% বৃদ্ধি পেয়েছে। যে নমুনায় ১০% প্রতিস্থাপনের করা হয়েছিল, তার নমনীয়তা-সহন ক্ষমতা ৪২% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সংকোচন-সহন ক্ষমতা ২১% বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন: পুলিশের ডিউটির ফাঁকে সবুজের সাধনা, ১০ হাজারের বেশি গাছ লাগিয়ে নজির ASI নিশীথ বিশ্বাসের
বিজ্ঞানীদের মনে করছেন ছিদ্রযুক্ত বায়োচার জল শোষণ করতে পারে ও কংক্রিট শক্ত হওয়ার সময় তা ধীরে ধীরে ছাড়তে পারে। এটি কংক্রিটকে শক্তিশালী করে এমন রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোতেও সহায়তা করতে পারে। এই পদার্থটিতে রয়েছে সিলিকাও, যা কংক্রিটের শক্তি বৃদ্ধি করতে পারে এমন সব যৌগ গঠনে ভূমিকা রাখে।
তবে, বায়োচারের পরিমাণ বাড়ালেই যে ভালো ফলাফল মিলবে, এমনটা কিন্তু নয়। কারণ ১৫% সিমেন্ট প্রতিস্থাপন করে বায়োচার ব্যবহার করা কংক্রিটের নমুনাটিতে বেশি ছিদ্র ও ফাটল দেখা দিয়েছে এবং দেখা গেছে এর সামগ্রিক শক্তি তুলনামূলকভাবে কম। গবেষকরা জানাচ্ছেন যে, বাস্তবে কোনও নির্মাণকাজে এই পদার্থটি ব্যবহারের আগে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। অত্যধিক তাপমাত্রা, হিমাঙ্কের নীচে তাপমাত্রা এবং লবণের সংস্পর্শের মতো পরিস্থিতিতে এর কার্যকারিতা নিয়েও আরও গবেষণা করার প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া, নালা থেকে নির্গত বর্জ্য-ভিত্তিক পদার্থ থেকে ভারী ধাতু (Heavy Metals) নির্গত হওয়ার সম্ভাবনাও নিয়েও সতর্ক হচ্ছে বিজ্ঞানীরা।