শালীর সাথে পালিয়েছে বাবা, বেপাত্তা মা-ও! অসুস্থ ঠাকুমাকে নিয়ে অনাহারে মেধাবী অরিত্র

আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: ইতিহাস অনার্স নিয়ে কলেজের তৃতীয় বর্ষে পড়ছিল অরিত্র বিশ্বাস। মেধাবী এই পড়ুয়ার স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু অভাব আর পারিবারিক পরিস্থিতি তার সেই স্বপ্নে বিরাট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে (Sad Story)। ছোটবেলাতেই বাবা-মা তাকে ছেড়ে চলে যান। তারপর থেকে ঠাকুমার কাছেই বড় হয়েছে অরিত্র। সামর্থ্য ছিল না, তা সত্ত্বেও লোকের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে কোনওরকমে নাতিকে স্কুলে পড়িয়েছেন তিনি। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় কলেজে অনার্সে সুযোগ পেয়ে যায় অরিত্র। কিন্তু ছয় মাস আগে আবারও ব্রেন স্ট্রোক হয় তার ঠাকুমার। সেই ঘটনার পর থেকেই বদলে যায় নাতি-ঠাকুমার জীবন। বর্তমানে অরিত্রর ঠাকুমা নিজের পায়ে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারেন না। বেশিরভাগ সময়ই তাঁকে বিছানায় থাকতে হয়। ফলে পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁর দেখভালের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে অরিত্রর উপর।

ঠাকুমার অসুস্থতায় থমকে গিয়েছে জীবন

এই অসুস্থ ঠাকুমাকে বাড়িতে একা রেখে বাইরে গিয়ে কাজ খোঁজারও উপায় নেই অরিত্রর। ফলে ধীরে ধীরে কলেজে যাওয়া এবং নিয়মিত পড়াশোনা করা বন্ধ হয়ে গিয়েছে তার। একদিকে অসুস্থ ঠাকুমার চিকিৎসার খরচ, অন্যদিকে সংসারের নিত্যদিনের অভাব, সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটছে তাদের। টাকার অভাবে ঠাকুমার ওষুধপত্র কিনতে পারছে না সে। ভালো চিকিৎসকের কাছে ঠাকুমাকে দেখানোর সামর্থ্যও নেই তার। অরিত্রর কথায়, ছোটবেলা থেকে ঠাকুমাই তার সবকিছু। যতদিন ঠাকুমা সুস্থ ছিলেন, ততদিন কোনওরকমে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছিল সে। কিন্তু এখন ঠাকুমা বিছানায় পড়ে যাওয়ায় তার জীবনের সমস্ত কিছুই যেন থমকে গিয়েছে। ঠাকুমাকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন তার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

অরিত্রের অভিযোগ, ছোটবেলায় তার বাবা তার মায়ের বোনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রতিবাদ করায় তার বাবা একসময় নিজের ছেলের গলা টিপে মারার চেষ্টা করেছিলেন বলেও দাবি অরিত্রের। এমনকি তার ঠাকুমার গায়েও হাত তোলা হয়েছিল বলে জানিয়েছে সে। এরপর নিজের যাবতীয় জিনিসপত্র নিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান অরিত্রর বাবা। তারপর থেকে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আর কোনওরকম সাহায্য পায়নি সে। ঠাকুমাই সমস্ত প্রতিকূলতার মধ্যে নাতিকে আগলে রেখেছেন। সুস্থ থাকাকালীন, মানুষের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে অরিত্রের পড়াশোনা চালিয়ে গিয়েছেন ঠাকুমা। সেই মানুষটিই এখন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে রয়েছেন। মাঝে মধ্যে অরিত্রের বন্ধুরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করে। সেই সাহায্যের জোরেই কোনওরকমে দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে সে। রেশনের চালই তাদের খাবারের অন্যতম ভরসা।

আরও পড়ুন: এই ছোট্ট উপায় মানলেই রুটি হবে একেবারে চাঁদের মতো গোল!

ভিক্ষে করে নয়, কাজ করে বাঁচতে চায় অরিত্র

চরম অভাবের মধ্যেও কারও কাছে হাত পেতে বেঁচে থাকতে চায় না অরিত্র। তার ইচ্ছে, এমন একটি কাজ করা যাতে নিজের ঠাকুমার চিকিৎসা এবং সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি পড়াশোনাটাও শেষ করতে পারে সে। কিন্তু অসুস্থ ঠাকুমাকে একা রেখে বাইরে বেরোনোর সুযোগ না থাকায় সেই কাজ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। রান্নার গ্যাস সিলিন্ডার কেনার সামর্থ্য নেই তাদের। তাই কখনও পাতা কুড়িয়ে উনুন জ্বালিয়ে সেই আগুনে ভাত সেদ্ধ করে খেয়েই দিন কাটাতে হয় নাতি-ঠাকুমাকে। অরিত্রের কাছে ঠাকুমা শুধু পরিবারের একজন সদস্য নন, বরং তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। তাই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ঠাকুমাকে ছেড়ে যেতে নারাজ সে। তার একটাই চাওয়া, কোনওভাবে একটা কাজের সুযোগ পাওয়া, ঠাকুমার চিকিৎসা করানো এবং একইসঙ্গে নিজের অসম্পূর্ণ পড়াশোনা শেষ করে ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানো।

Leave a Comment