আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: ‘বাংলা মোদের গর্ব’ (Bangla Moder Gorbo) প্রকল্পের টেন্ডার বণ্টনকে কেন্দ্র করে প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের (Indranil Sen) বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইডির সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে রাজ্যের দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission)। ২০২২ এবং ২০২৩ সালে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই প্রকল্পের অধীনে মেলা, প্রদর্শনী এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কাজ কীভাবে পরিচালনা হয়েছিল, কোন খাতে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছিল মূলত সেই প্রক্রিয়াই এখন তদন্তকারীদের নজরে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে চালু হয়েছিল ‘বাংলা মোদের গর্ব’ প্রকল্প। বাংলার লোকসংস্কৃতি, স্থানীয় ইতিহাস ও হস্তশিল্পকে তুলে ধরা এবং জেলার শিল্পীদের একটা মঞ্চ দেওয়াই ছিল এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য। সেই সূত্রে বিভিন্ন জেলায় মেলা ও প্রদর্শনীর আয়োজন করা হত। স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি সামগ্রী বিক্রির স্টল এবং বাউল, ভাটিয়ালি, আদিবাসী-সহ বিভিন্ন লোকশিল্পের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ঘিরেই এই মেলা পরিচালনা হত।
কী অভিযোগ উঠেছে?
দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে অভিযোগ জমা পড়েছে, ২০২২ ও ২০২৩ সালে এই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত একাধিক কাজের টেন্ডার বারবার কয়েকটি নির্দিষ্ট সংস্থার হাতেই গিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মেলার স্টল তৈরি, অনুষ্ঠান পরিচালনা এবং শিল্পীদের আনার মতো বিভিন্ন কাজেও একই সংস্থাগুলিকে বরাত দেওয়া হয়েছিল। অন্য সংস্থাগুলি অংশ নিয়েও কেন কাজ পেল না, সেই প্রশ্নও তদন্তের আওতায় এসেছে।
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, টেন্ডার পাওয়া কয়েকটি সংস্থার মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তৎকালীন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের পরিবারের সদস্য অথবা ঘনিষ্ঠদের সম্পর্ক ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা। এই দাবির সত্যতা যাচাই করতেই সংস্থাগুলির মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগসূত্র সম্পর্কিত বিষয়গুলি তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে। তবে এই অভিযোগগুলি এখনও তদন্তাধীন, কোনও আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা এগুলিকে চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত বলে ঘোষণা করেনি।
তদন্তকারীদের নজরে রয়েছে টেন্ডার প্রক্রিয়ার একাধিক দিক। কোন সংস্থা কত টাকার কাজ পেয়েছিল, সেই কাজ বাস্তবে করতে কত টাকা খরচ হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার আর্থিক লাভ কত, তার হিসাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি দরপত্রে অন্য কোনও সংস্থা অংশ নিয়েছিল কি না, অংশ নিয়ে থাকলে মূল্যায়নের পর তাদের পরিবর্তে নির্দিষ্ট সংস্থাগুলিই কেন কাজ পেল, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা হচ্ছে। মেলার স্টলে স্থানীয় শিল্পীদের তৈরি পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রেও কোনও আর্থিক কমিশন নেওয়া হয়েছিল কি না, সেই অভিযোগও তদন্তের অংশ। অভিযোগটি সত্য হলে সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে গিয়েছে, সেটিও যাচাই করা হবে।
সরকারি e-Procurement নথিতেও ‘বাংলা মোদের গর্ব’ প্রকল্পের বিভিন্ন জেলার অনুষ্ঠান সংক্রান্ত টেন্ডারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যেমন, দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পশ্চিম মেদিনীপুরের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আলাদা টেন্ডার ও চুক্তির তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের পুলিশকর্তা কে জয়রামন জানিয়েছেন, অভিযোগের ভিত্তিতেই তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তের প্রয়োজনে ইন্দ্রনীল সেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। প্রাথমিক তদন্ত শেষ হলে রিপোর্ট তৈরি করে সরকারের কাছে জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
আরও পড়ুন: পুজোয় ৮ কোটি মানুষকে উপহার, রেশনে মিলবে ময়দা থেকে চিনি, সুজিও! ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত টেন্ডার দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যাচ্ছে না। নথিপত্র, টেন্ডার প্রক্রিয়া, আর্থিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের পরই পুরো বিষয়টি সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি পাওয়া যাবে।