অনন্যা সরকার, মহারাষ্ট্র: ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস (UPSC CSE) পরীক্ষাকে দেশের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন পূরণের জন্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় অংশ নেন, কিন্তু খুব কম সংখ্যকই সফল হন। আইএএস অফিসার রমেশ ঘোলাপ শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, চরম দারিদ্র্য ও অকালে পিতৃবিয়োগের মতো প্রতিকূলতা কাটিয়ে, কঠোর পরিশ্রম করে এবং বিনা কোচিংয়ে এই সাফল্যে অর্জন করেছেন (UPSC Success Story of IAS Ramesh Gholap)। তাঁর এই চড়াই-উতরাইয়ে ভরা যাত্রাটি প্রমাণ করে যে সংকল্প যদি দৃঢ় হয়, তবে পৃথিবীর কোনো শক্তিই সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আসুন তাহলে রমেশ ঘোলাপের সাফল্যের কাহিনীটি বিশদে জেনে নেওয়া যাক।
শৈশবে পোলিওতে আক্রান্ত হওয়া থেকে UPSC-এর যাত্রা
আইএএস অফিসার রমেশ ঘোলাপ ছোটবেলায় পোলিওতে আক্রান্ত হন। অল্প বয়সে তাঁর বাঁ পায়ে পোলিও হয় এবং পরিবারে আর্থিক সংকটের কারণে সেই অবস্থাতেই তাঁকে মায়ের সাথে রাস্তায় বসে চুড়ি বিক্রি করতে হয়েছে। আইএএস রমেশ ঘোলাপের বাবার একটি ছোট সাইকেলের দোকান ছিল। বাবার মদ্যপানের বদ অভ্যাসের কারণে পরিবারটি পথে পথে ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হয়। একদিন অতিরিক্ত মদ্যপানের কারণে বাবার স্বাস্থ্যের এতটাই অবনতি হয় যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে, পরিবারের সমস্ত ভার রমেশের মায়ের ওপর এসে পড়ে। সংসার চালানোর জন্য তাঁর মা চুড়ি বিক্রি শুরু করেন। বাঁ পায়ে পোলিওতে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও রমেশ তাঁর মা এবং ভাইকে সাথে নিয়ে চুড়ি বিক্রি চালিয়ে যান।
রমেশ ঘোলাপ তাঁর গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি বারশিতে তাঁর কাকার বাড়িতে চলে আসেন। যখন তাঁর বাবা মারা যান, রমেশ তখন দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ছিলেন। বাবার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই রমেশের জন্য বাড়ি ফেরাটা খুবই জরুরি ছিল। কাকার বাড়ি থেকে নিজের বাড়ি যাওয়ার ভাড়া ছিল ৭ টাকা, আর প্রতিবন্ধী হওয়ায় রমেশকে দিতে হতো ২ টাকা। কিন্তু তাঁর আর্থিক অবস্থা এতটাই শোচনীয় ছিল যে, ভাড়া দেওয়ার মতো ২ টাকাও তাঁর কাছে ছিল না। দ্বাদশ শ্রেণি শেষ করার পর, রমেশ পরিবারের ভরণপোষণের জন্য একটি ডিপ্লোমা অর্জন করে নিজের গ্রামেই শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি বিএ ডিগ্রি কোর্সও সম্পন্ন করেন।
আরও পড়ুন: উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে UPSC-র প্রস্তুতি, প্রথম প্রচেষ্টাতেই IAS ক্ষিতিজ
ইউপিএসসি-র প্রস্তুতির জন্য রমেশ ছয় মাসের জন্য তাঁর চাকরি ছেড়ে দেন এবং নিষ্ঠার সাথে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। তিনি ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো ইউপিএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন কিন্তু ব্যর্থ হন। এরপর তাঁর মা গ্রামবাসীদের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার করে রমেশকে পড়াশোনার জন্য পুনেতে পাঠান। সেখানে রমেশ কোনো কোচিং ছাড়াই ইউপিএসসি-র প্রস্তুতি শুরু করেন। কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে তিনি অবশেষে ২০১২ সালে সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রতিবন্ধী কোটায় রমেশ ঘোলাপ ২৮৭ র্যাঙ্ক অর্জন করে একজন আইএএস অফিসার হন। তাঁর এই সাফল্যের গল্পটি আজ দেশের লক্ষ লক্ষ যুবক যুবতীর কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে।