আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: বর্তমান সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence (AI) প্রযুক্তির গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ থেকে শুরু করে তথ্য বিশ্লেষণ এবং দৈনন্দিন নানা কাজে AI মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়েছে পড়েছে। তবে এই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতাগুলি বোঝাও অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই স্কুলস্তর থেকেই পড়ুয়াদের AI সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেওয়া এবং তাদের মধ্যে যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে তোলার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এই লক্ষ্যেই ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (National Council of Educational Research and Training) বিদ্যালয়ের পাঠক্রমে AI-কে একটি স্বতন্ত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কোন শ্রেণির পাঠক্রমে যুক্ত হবে AI?
শিক্ষা মন্ত্রকের অধীন NCERT নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের জন্য কম্পিউটেশনাল থিঙ্কিং (CT) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নিয়ে একটি প্রাথমিক শিক্ষামূলক মডিউল তৈরি করেছে। জাতীয় শিক্ষানীতি (NEP) ২০২০-র ভাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি এই মডিউলের মূল লক্ষ্য, পড়ুয়াদের প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন করে তোলা। পাশাপাশি এই মডিউল শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, নতুন ধারণা তৈরি করা এবং যুক্তিসংগত উপায়ে সমস্যার সমাধান করতে সাহায্য করবে। সবটাই শুরু থেকে হাতে-কলমে শেখানো হবে, তাই এই বিষয়গুলি শেখার জন্য পড়ুয়াদের আগে থেকে AI বা কোনও নির্দিষ্ট প্রযুক্তি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান না থাকলেও চলবে।
কী কী থাকছে মডিউলে?
NCERT-এর তৈরি এই প্রাথমিক মডিউলটি মূলত নবম, দশম, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের কথা মাথায় রেখে তৈরি। এখানে শুধু AI প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করানোই নয়, প্রযুক্তি কীভাবে কাজ করে এবং বাস্তব জীবনে এটিকে কীভাবে প্রয়োগ করতে হবে, সেই বিষয়গুলিও বোঝানোর চেষ্টা করা হবে।
- কম্পিউটেশনাল থিঙ্কিং: কোনও সমস্যাকে চিহ্নিত করে সেটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা, তথ্য ও পরিস্থিতির মধ্যে প্যাটার্ন খুঁজে বের করা এবং ধাপে ধাপে সেই সমস্যা সমাধান করার পদ্ধতি শেখানো হবে।
- AI-এর প্রাথমিক ধারণা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী, এটি কীভাবে কাজ করে এবং বাস্তব জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোথায় এর ব্যবহার হয়, সে সম্পর্কে পড়ুয়ারা জানতে পারবে।
- AI-এর সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা: এই প্রযুক্তি কী কী কাজে সাহায্য করতে পারে, কোথায় তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে এবং কেন AI-এর দেওয়া প্রতিটি উত্তরকে নির্ভুল বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়, তা বোঝানো হবে।
- বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে শিক্ষা: দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তির ব্যবহার বোঝাতে ভারতের আধার ও UPI-এর মতো পরিচিত ব্যবস্থার উদাহরণও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই মডিউলে।
- ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা: AI ব্যবহার করার সময় ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে সুরক্ষিত রাখতে হয়, সে বিষয়ে সচেতন করা হবে।
- ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্তকরণ: AI-এর তৈরি তথ্যের সত্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা এবং বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু চিনতে শেখানো হবে।
- ন্যায্যতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা: প্রযুক্তির ব্যবহারে পক্ষপাত, ন্যায্যতা এবং অনলাইন নিরাপত্তার গুরুত্ব তুলে ধরা হবে।
- নৈতিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার: প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় মানুষের নিজস্ব বিচারবুদ্ধি, সৃজনশীলতা ও নৈতিক দায়িত্বের গুরুত্ব বোঝানো হবে।
কীভাবে পড়ানো হবে?
এই মডিউলে শুধুমাত্র বইয়ের তথ্য পড়ে মুখস্থ করার পরিবর্তে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কার্যকলাপের মাধ্যমে শেখার উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের আলোচনায় অংশ নেওয়া, ব্যবহারিক অনুশীলন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং নিজেদের কাজ নিয়ে পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকবে। এর ফলে তারা পুঁথিগত তথ্যের পাশাপাশি প্র্যাকটিকাল বা ব্যবহারিক দিকটি সম্পর্কেও অবগত হবে।
এবার প্রশ্ন হচ্ছে এই শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য কি কম্পিউটার থাকাটা বাধ্যতামূলক? অনেক বিদ্যালয়েই তো পর্যাপ্ত কম্পিউটার নেই। তবে কি সেই সমস্ত স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা এই শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে? না, সমস্ত কার্যক্রমের জন্য কম্পিউটার বা ডিজিটাল ডিভাইস থাকা বাধ্যতামূলক নয়। ডিজিটাল পরিকাঠামো ততটা উন্নত নয়, এই ধরনের স্কুলেও যাতে পড়ুয়ারা এই বিষয়গুলি শিখতে পারে, সেই কথা মাথায় রেখে মডিউলটি তৈরি করা হয়েছে। স্কুলস্তরে AI এবং CT-এর প্রাথমিক শিক্ষা চালু হলে পড়ুয়ারা ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
স্কুলশিক্ষায় CT এবং AI-কে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-র বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি অংশ মাত্র। এই নীতিতে গণিতভিত্তিক চিন্তা, প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা বিকাশের উপর জোর দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ‘রাজনীতিতে অবদান নয়, রাহুলের বিদেশ সফর নিয়েই আলোচনা হয়’ কড়া মন্তব্য দিলীপ ঘোষের
কবে থেকে চালু হবে?
NCERT-এর এই উদ্যোগের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় শিক্ষাব্যবস্থায় AI ও CT-কে ধাপে ধাপে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তৃতীয় থেকে অষ্টম শ্রেণির জন্য ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে CT ও AI পাঠ্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণির জন্যও সংশ্লিষ্ট পাঠ্যক্রম চূড়ান্ত করার কথা জানানো হয়েছে। প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে, বুঝতে এবং ভবিষ্যতে চাকরির ক্ষেত্রেও এই পাঠক্রম প্রত্যেকটি ছাত্র-ছাত্রীকে নিঃসন্দেহে অনেকটা সাহায্য করবে।