অনিয়মিত বর্ষার মাঝেই ভারতে কমছে জলস্তর, জারি অ্যালার্ট

অনন্যা সরকার, কলকাতাঃ গ্লোবাল ক্রেডিট রেটিং সংস্থা, মুডি’স (Moody’s) ভারতের বিভিন্ন শহরে জল সংকট (Water Crisis) নিয়ে একটি বড় সতর্কতা জারি করেছে। মুডি’স রেটিংস তাদের রিপোর্টে এদেশের জল ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থাকে (Water Management System) অসংগঠিত এবং দুর্বল বলে উল্লেখ করেছে। সংস্থাটি এও জানিয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে জল বণ্টনের ধীর প্রক্রিয়া এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। আবার, নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় জলের দামের ওপর সরকারি ভর্তুকি (Subsidy) কোষাগারের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। অনেক রাজ্যে কৃষিকাজের জন্য জল ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে ভর্তুকি দেওয়া হয়। এটি ধীরে ধীরে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি করছে। এছাড়া, সেচ, স্থানীয় জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পানীয় জল সরবরাহ মূলত রাজ্যগুলি নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে প্রতিটি রাজ্যে জল নীতি আলাদা আলাদা ভাবে পরিচালিত হয়।

ভারত কেন জল সংকটের সম্মুখীন হতে পারে?

১. বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে অপর্যাপ্ত জল বন্টন ব্যবস্থার কারণে জল সংকট দেখা দিতে পারে।

২. ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের সাথে সাথে ভারতে জলের ব্যবহার তো বেড়েছে কিন্তু সরবরাহ সীমিতই রয়ে গেছে। 

৩. অনিয়মিত বর্ষা, খরা, বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো প্রতিকূলতা জল সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

মুডিস রেটিংস জানাচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে জল সম্পদের কার্যকর ব্যবহার বিভিন্ন রাজ্যের ভিন্ন নীতি ও অগ্রাধিকারের জন্য ব্যাহত হচ্ছে। এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাবে সেইসব অঞ্চলে যেখানে জলের চাহিদা এবং প্রাপ্যতার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। এছাড়া, গার্হস্থ্য, কৃষি ও শিল্প খাতের মধ্যে জলের পুনর্বন্টন যতটা দ্রুত হওয়া উচিত, তার চেয়ে ধীরগতিতে হচ্ছে। ফলে যেসব অঞ্চলে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে সেখানে জল সংকটও বৃদ্ধি পেতে পারে।

ডিজিটাল অর্থনীতির প্রসারের সাথে সাথে ভারতে দ্রুত বিকশিত হচ্ছে ক্লাউড কম্পিউটিং, ডেটা সেন্টার, ও এআই-ভিত্তিক শিল্প। সার্ভারকে ঠান্ডা রাখার পাশাপাশি অন্যান্য প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াতে জন্য প্রচুর পরিমাণে জলের প্রয়োজন হয় পড়ছে। তাই ডিজিটাল অর্থনীতিতে অগ্রসর হওয়ার জন্য শীঘ্রই জল সম্পদের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা খুঁজে বের করার প্রয়োজন রয়েছে।

ভারত বর্তমানে অনিয়মিত বর্ষা, তীব্র খরা, বন্যা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে। আবার, পাইপলাইন নেটওয়ার্কের অদক্ষতার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ জল অতিরিক্ত পরিমাণে উত্তোলন করার ফলেও জল সংকট তৈরি হচ্ছে। দেশের একাধিক রাজ্যে ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমে যাওয়ার খবরও প্রায়ই সামনে আসছে, যা আগামী দিনে ওইসব অঞ্চলে জল সংকটের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। মুডিস-এর রিপোর্টে এও বলা হয়েছে যে, কার্যকর জল সম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র পরিবেশের জন্যই নয়, একটি দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতকে তাই নিশ্চিতভাবে একটি দীর্ঘমেয়াদী ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যা ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষির চাহিদা ও শিল্প সম্প্রসারণের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য বজায় রাখবে।

আরও পড়ুনঃ কোচিং ছাড়াই সাফল্য, বাংলা মাধ্যমে পড়ে UPSC ক্লিয়ার করে আজ IAS ব্রততী দত্ত

জানিয়ে রাখি, দেশের আর্থিক রাজধানী, মুম্বাই এখন প্রকট জল সংকটের সম্মুখীন। শহরটি যে সাতটি জলাধার থেকে জল পায় সেগুলির সম্মিলিত জলের মজুদ এখন মাত্র ৯.৩৩ শতাংশ। গত বছর এই সময়ে এই জলাধারগুলিতে জল ছিল ১২.২৭ শতাংশ। মুম্বাইয়ে যে পরিমাণ জল লাগে সেই হিসেবে এই জলাধারগুলিতে মাত্র এক মাস চলার মতো জল রয়েছে। দিল্লিতেও প্রায় একই অবস্থা। এমন অনেক এলাকা আছে যেখানে ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে জল পৌঁছায়নি। বর্তমানে, দিল্লিতে সমস্ত প্ল্যান্ট, বৃষ্টির জলের কূপ এবং টিউবওয়েল মিলিয়ে মোট জল উৎপাদন হচ্ছে ৯৪৮ থেকে ৯৫০ এমজিডি (MGD), যা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৫০ এমজিডি কম। অন্যদিকে, চেন্নাইয়ের প্রধান জলাধারগুলিতে বর্তমানে প্রায় ২৮৮ দিনের, বা প্রায় ৯-১০ মাসের পানীয় জল মজুত রয়েছে, যা বর্ষার বৃষ্টি না হলেও শহরের চাহিদা মেটাতে পারবে। কিন্তু এখানকার ভূগর্ভস্থ জলের স্তর দ্রুত কমছে।  

Leave a Comment