আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: চোরবাগান (Chorbagan) সর্বজনীন দুর্গাপুজোর (Durga Puja) মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় অস্থায়ী হোমগার্ডদের (Home Guard) ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন মুখ্যমন্ত্রী (Chief Minister) শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর অভিযোগ, বৃষ্টির সময় ভিড় নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা হোমগার্ডরা দড়ি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়াতেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল। একই সঙ্গে শহরের অন্যান্য বড় পুজোমণ্ডপগুলিতে নিরাপত্তার খামতি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিশেষ দল গঠনের কথা জানিয়েছেন তিনি। রবিবার ভবানী ভবনে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করেন তিনি। তারপরেই এই ঘটনায় রাজ্য সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ স্পষ্ট করেন মুখ্যমন্ত্রী।
কী বক্তব্য শুভেন্দু অধিকারীর?
শনিবার মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপ সংলগ্ন এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আচমকা বৃষ্টি এবং প্রবল ভিড়ের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হলে পদপিষ্ট হয়ে বহু মানুষ হতাহত হন। এই ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৫ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন রিপোর্টে জানানো হয়েছে। দুর্ঘটনার পর থেকেই ভিড় নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ ও বেরোনোর পথের ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন এবং আহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। সবকিছু পর্যবেক্ষণ করে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাব দিয়েছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, পুলিশই অ্যাপ ক্যাবের ব্যবস্থা করে আহতদের হাসপাতালে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। তাই যাঁরা বলছেন পুলিশকে ঘটনার সময় পাশে পাওয়া যায়নি, তারা সম্পূর্ণ ঠিক নন।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, চোরবাগান মণ্ডপের ভিতরে নয়, মূলত প্রবেশ ও প্রস্থানপথেই আসল গলদ। তাঁর দাবি, ওই এলাকায় দড়ি দিয়ে ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টি শুরু হলে অস্থায়ী হোমগার্ডরা দড়ি ছেড়ে সরে যান বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। এই কর্মীদের তালিকা চেয়ে পাঠানোর কথাও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, কয়েকজন হোমগার্ড গত দু’বছর পুজোর সময় দায়িত্ব পালন করেছেন, এ বার ছিল তাঁদের তৃতীয় বছর। পূর্বতন সরকারের আমলে নিয়োগ নিয়ে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, “অনেক ‘আবর্জনা’ বয়ে চলেছি”।
তবে হোমগার্ডদের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর এই অভিযোগ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে, এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। দুর্ঘটনার জন্য আয়োজকদের ভূমিকা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেও পুজো উদ্যোক্তাদের ত্রুটির কথা স্বীকার করেছেন এবং স্থানীয় পুলিশের নজরদারি যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
চোরবাগান-কাণ্ডের পর শহরের অন্য পুজোমণ্ডপগুলির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ দল গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের প্রিন্সিপাল সচিব, দমকলের ডিজি এবং ডিজিএসটিএফের নেতৃত্বে ওই দল বিভিন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করবে। কোথাও নিরাপত্তার খামতি বা ভিড় নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা গেলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় ডিসি এবং থানার ওসি-কে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মণ্ডপে দাঁড়িয়েই এই দল প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, যে পুরসভা, পুলিশ ও দমকলের তরফে মণ্ডপের অনুমতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন করা হয়েছিল, তাদের বাদ রেখেই তদন্তের ব্যবস্থা করতে চান তিনি। এই উদ্দেশ্যে কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কর্মরত বিচারপতি পাওয়া না গেলে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে কমিটি গঠনের বিকল্পও রাখা হয়েছে।
দুর্ঘটনায় মৃতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাসও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ২০ ও ২১ অক্টোবর নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে ২৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। ময়নাতদন্তের পর দেহ পরিবারের হাতে সম্মানের সঙ্গে তুলে দেওয়া এবং শেষকৃত্য পর্যন্ত প্রশাসনিক আধিকারিকদের উপস্থিত থাকার ব্যবস্থার কথাও বলেছেন। আহতদের চিকিৎসা এবং তাঁদের সহায়তার বিষয়টিও রাজ্যের ঘোষিত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে।
আরও পড়ুন: চোরবাগানকাণ্ডের জের, বন্ধ সন্তোষ মিত্র স্কয়ার, চেতলা অগ্রণী সহ একাধিক মণ্ডপ
চোরবাগানের এই বিপর্যয়ের পর বড় পুজোমণ্ডপগুলিতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ব্যবস্থা নতুন করে খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য। তদন্তে কার গাফিলতি প্রমাণিত হয় এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর।