আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দীর্ঘদিনের শিল্প-সমস্যা, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং একের পর এক বিতর্কে বাংলার শিল্পক্ষেত্র কার্যত পিছিয়ে পড়েছিল। তৃণমূল সরকারের আমলে শিল্পের জন্য আর্থিক প্রণোদনা প্রত্যাহার, জমি নিয়ে জটিলতা এবং সিন্ডিকেটরাজ ও কাটমানির অভিযোগ রাজ্যের শিল্পবান্ধব পরিবেশকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। সেই পরিস্থিতি বদলে বাংলাকে নতুন করে শিল্পের মানচিত্রে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছে বিজেপি সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর (Suvendu Adhikari) নেতৃত্বে শিল্পক্ষেত্রে নতুন আশার আলো দেখাতে এবার সামনে এল রাজ্যের নতুন বিনিয়োগ প্রসার নীতি ২০২৬।
কী রয়েছে এই নীতিতে?
৫ নভেম্বর বৃহস্পতিবার ইকোপার্কে এই নতুন শিল্পনীতির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত-সহ সরকারের অন্যান্য প্রতিনিধি এবং শিল্পমহলের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। রাজ্যে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পস্থাপনের পথে প্রশাসনিক জটিলতা কমানো, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো এবং বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই এই নীতির মূল লক্ষ্য। শুধু বড় শিল্প নয়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ এবং কর্মসংস্থাননির্ভর শিল্পায়নকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন শিল্পনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
১. শিল্পের জন্য জমির ব্যবস্থা:
শিল্পস্থাপনের ক্ষেত্রে জমি অন্যতম বড় বাধা। সেই সমস্যা কাটাতে সরাসরি জমি কেনা, ল্যান্ড পুলিং বা জমি একত্রিত করে বড় শিল্পের উপযোগী জমি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সরকারের হাতে থাকা অব্যবহৃত শিল্পজমিও নতুন করে কাজে লাগানোর উদ্যোগ থাকবে। শিল্পের জন্য বরাদ্দ জমি পাওয়ার তিন বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করার শর্তও রাখা হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কারখানা চালু না হলে জমি বরাদ্দ বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
২. মহিলা ও তৃতীয় লিঙ্গের কর্মীদের নিয়োগে বিশেষ সুবিধা:
নতুন নীতিতে মহিলা ও তৃতীয় লিঙ্গের কর্মীদের নিয়োগে বিশেষ আর্থিক উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। যোগ্য MSME সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে পুরুষ কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার EPF-এ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত এবং মহিলা ও তৃতীয় লিঙ্গের কর্মীদের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই সুবিধার বার্ষিক সর্বোচ্চ সীমা প্রতি ইউনিটে ৫ কোটি টাকা। বড় শিল্পের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কর্মসংস্থানের শর্ত পূরণ করলে পাঁচ বছর পর্যন্ত EPF-এ ৫০ শতাংশ সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে।
৩. গবেষণা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে জোর:
শুধু প্রচলিত শিল্প নয়, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণানির্ভর শিল্পকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে সরকার। যোগ্য শিল্পসংস্থার গবেষণা ও উন্নয়ন পরিকাঠামো তৈরির খরচের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে। ১০০ শতাংশ রফতানিমুখী ইউনিটের ক্ষেত্রে এই সহায়তা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। সর্বোচ্চ সহায়তার সীমা ৫ কোটি টাকা। ল্যাবরেটরি, পরীক্ষামূলক উৎপাদন, প্রোটোটাইপ তৈরি, পণ্য উন্নয়ন এবং মেধাস্বত্ব তৈরির ক্ষেত্রেও সহায়তা মিলবে।
৪. ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ:
রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি MSME ক্ষেত্র। এই শিল্পগুলিকে আরও শক্তিশালী করতে আর্থিক প্রণোদনা, প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং পরিকাঠামোগত সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর ফলে ছোট উদ্যোক্তাদের নতুন করে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে।
৫. বিনিয়োগকারীদের জন্য সিঙ্গল উইন্ডো ব্যবস্থা:
শিল্প গড়তে গিয়ে বিভিন্ন দফতরের অনুমোদন পেতে যাতে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে না হয়, তার জন্য সিঙ্গল উইন্ডো পোর্টালের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আবেদন, অনুমোদন, সরকারি সহায়তা এবং অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া একই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার পাশাপাশি দেরি হলে তার কারণ জানানোর ব্যবস্থাও থাকবে।
৬. অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পক্ষেত্র:
সেমিকন্ডাক্টর, ইলেকট্রনিক্স, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, গ্রিন হাইড্রোজেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, জাহাজ নির্মাণ, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বস্ত্র, ওষুধ, জৈবপ্রযুক্তি এবং বিশেষ ইস্পাতের মতো ক্ষেত্রগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পেট্রোকেমিক্যাল, ডেটা সেন্টার এবং লজিস্টিকসের মতো ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
আরও পড়ুন: জানুয়ারি থেকেই যুবশক্তির কড়কড়ে ৩০০০ টাকা! হুগলি থেকে ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
৭. শিল্পে আর্থিক প্রণোদনা:
যোগ্য শিল্পসংস্থাগুলিকে রাজ্য GST-ভিত্তিক সহায়তা, বিদ্যুৎ শুল্কে ছাড়, ঋণের সুদে ভর্তুকি, স্ট্যাম্প ডিউটি ও রেজিস্ট্রেশন ফিতে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। শিল্পের পরিকাঠামো এবং প্রযুক্তির উন্নয়নেও সহায়তা করা হবে।