দার্জিলিংয়ে হবে বিশ্বের প্রথম স্যালামান্ডার অভয়ারণ্য, বিরল প্রাণীকে বাঁচাতে বনদপ্তরের যুগান্তকারী প্রয়াস

অনন্যা সরকার, দার্জিলিং: এক অভূতপূর্ব আন্তর্জাতিক মাইলফলক অর্জন করতে চলেছে দার্জিলিং। বিশ্বের প্রথম ‘হিমালয়ান স্যালামান্ডার অভয়ারণ্য’ (Himalayan Salamander Sanctuary) গড়ে উঠছে কার্শিয়াংয়ের পার্বত্য উপত্যকায়। এই অভয়ারণ্যের মূল লক্ষ্য হল ‘হিমালয়ান স্যালামান্ডার’ বা ‘হিমালয়ান নিউট’ (Tylototriton Verrucosus)-কে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা প্রদান করা ও বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা। স্যালামান্ডার হল একটি বিরল উভচর প্রাণী, যা প্রাগৈতিহাসিক ডাইনোসরের যুগ থেকে পৃথিবীর বুকে টিকে আছে। তবে বর্তমানে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক প্রভাবে এরা বিলুপ্তির দিকে পা বাড়িয়েছে। 

কার্শিয়াংয়ে তৈরি হচ্ছে বিশ্বের প্রথম স্যালামান্ডার অভয়ারণ্য

পশ্চিমবঙ্গের বন বিভাগ, চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এবং কেন্দ্রীয় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অভয়ারণ্যটি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে চূড়ান্ত পর্যায়ে। কার্শিয়াং বন বিভাগের পরিচালিত গবেষণা এবং একটি বিস্তারিত প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক ও সেন্ট্রাল জু অথরিটির কাছে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। 

এই যুগান্তকারী সংরক্ষণ উদ্যোগের পেছনের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছেন কার্শিয়াং-এর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (DFO) দেবেশ পান্ডে। তিনি শুধু এই বিপন্ন পার্বত্য প্রজাতির প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্রই পুনরুদ্ধার করেননি, তার সাথে তিনি কৃত্রিম জলাশয় তৈরি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বৈজ্ঞানিকভাবে সচেতন করার মতো কাজের সাথেও যুক্ত। এর স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে ‘ইকো ওয়ারিয়র অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’-এর ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ’ বিভাগে মনোনীত করা হয়েছে।

আরও পড়ুন: তুলো নয়, জানেন ট্রেনের সিটের ভিতরে কী ভরা থাকে?

বৈজ্ঞানিকভাবে টাইলোটোট্রিটন ভেরুকোসাস বা টাইলোটোট্রিটন হিমালয়ানাস নামে পরিচিত এই অদ্ভুত দর্শন উভচর প্রাণীটি উভচর প্রাণীদের একটি উপশ্রেণী, ‘কাউডাটা’ বর্গের অন্তর্গত। প্রায় ১৪-১৬ কোটি বছর আগে ‘জুরাসিক এরা’ বা ডাইনোসরদের সময়কাল থেকে ‘হিমালয়ান স্যালামান্ডারদের পূর্বপুরুষেরা এই ভূমিতে বিচরণ করে আসছে। এটি সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে কাউডাটা বর্গের উভচর প্রাণীদের একমাত্র জীবিত প্রজাতি। গাঢ় বাদামী রঙের এই প্রাণীটি প্রায় ১৬-১৮ সেমি লম্বা। এদের পিঠে করাতের মতো খাঁজ দেখা যায়। দুর্লভতার কারণে হিমালয়ান স্যালামান্ডার ১৯৭২ সালের ভারতীয় বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইনের তফসিলের-১ অধীনে সর্বোচ্চ সুরক্ষিত প্রাণীর স্বীকৃত পেয়েছে।

জানিয়ে রাখি, দার্জিলিং এবং কার্শিয়াং পাহাড়ে ১০০টিরও বেশি জায়গায় এদের দেখা যেত। তবে, ক্রমবর্ধমান পর্যটন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্লাস্টিক দূষণ ও ভূমি ব্যবহারে বদলের কারণে এই প্রাণীগুলির প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র মারাত্মকভাবে কমে গেছে। ছোট পাহাড়ি জলাশয়, বা পরিষ্কার জল জমে থাকা গোলাকার অববাহিকা কিংবা পার্বত্য ঢালে থাকা জলাভূমিগুলি হল এদের প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র। কিন্তু ইদানিংকালে অনেক এলাকায় আবর্জনার স্তূপ জমে ও রাস্তা নির্মাণের মাটি ফেলার কারণে এই জলাশয়গুলি বুজে গেছে। 

আরও পড়ুন: কালনা থেকে দিঘা যান SBSTC-র বাসে, মহিলাদের জন্য সম্পূর্ণ ফ্রি, জেনে নিন রুট ও সময়সূচি

স্যালামান্ডারদের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র পাহাড়ি অঞ্চলের কোনো একটি বড় বনভূমিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা ছড়িয়ে রয়েছে বিক্ষিপ্তভাবে। প্রস্তাবিত অভয়ারণ্যটির সীমানা কার্শিয়াং-এর নামথিং পোখরি, পোখরিয়াটার এবং পঞ্চ পোখরি – এই তিনটি কেন্দ্র বিন্দুকে স্পর্শ করে। জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার সাথে যৌথ গবেষণার মাধ্যমে হিমালয়ান স্যালামান্ডারের সঠিক ভৌগোলিক বিস্তার, বিপদ এবং সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাগুলি মূল্যায়ন করা হয়েছে। 

একই সাথে, ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (WWF)-এর সহযোগিতায় স্যালাম্যান্ডারের খাদ্যতালিকা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে আকর্ষণীয় ইনফোগ্রাফিক তৈরি করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ডিজিটাল পোস্টারগুলোর মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে, যাতে এই বিরল প্রাণীটিকে কেউ ভুল করে ক্ষতিকর বলে মনে না করে।

Leave a Comment