আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে যাঁর অবদান অনস্বীকার্য, তিনি মহাকবি কাশীরাম দাস (Kashiram Das)। সংস্কৃত ভাষায় রচিত মহাভারতকে সহজবোধ্য বাংলা কাব্যে রূপান্তরিত করে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর অনূদিত ‘কাশীদাসী মহাভারত’ আজও বাংলা সাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত। পূর্ব বর্ধমানের (Bardhaman) সিঙ্গি (Singi) গ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে এই মহাকবির স্মৃতি। অথচ বাংলা সাহিত্যের এমন এক অমূল্য সম্পদের স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটেই আজ অস্তিত্বের সংকটে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্রমশ নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে কবির ঐতিহাসিক বাসস্থান।
কী বলছেন গ্রামবাসী?
পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া-২ ব্লকের সিঙ্গি গ্রামে অবস্থিত কাশীরাম দাসের জন্মভিটের বর্তমান পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক। বাড়ির অবশিষ্টাংশের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ছে। আগাছা ও ঝোপজঙ্গলে ঢেকে গিয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপত্যের একাংশ। স্থানীয়দের দাবি, এই বাড়ির গুপ্ত কুঠিতেই বসে মহাভারতকে বাংলা কাব্যে রূপ দেওয়ার কাজ করেছিলেন কবি। অথচ যে স্থান একসময় সাহিত্যচর্চার সঙ্গে জড়িত ছিল, আজ তার অস্তিত্বই বিপন্ন।
এই পরিস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন সিঙ্গি গ্রামের বাসিন্দারা। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরেই তাঁদের তরফে বারবার জন্মভিটে সংরক্ষণের দাবি জানানো হচ্ছে। বাম আমল থেকে তৃণমূল সরকারের সময়কাল, একাধিকবার বিষয়টি প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলেও স্থায়ী সংরক্ষণের কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ২০১৫ সালেও জন্মভিটে সংরক্ষণ করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবিতে হেরিটেজ কমিশনে চিঠি দিয়েছিলেন গ্রামবাসীরা। কিন্তু সেই উদ্যোগের পরও প্রত্যাশিত ফল মেলেনি বলে অভিযোগ। তাঁদের দাবি, অবিলম্বে কবির জন্মভিটেকে হেরিটেজ ঘোষণা করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সম্প্রতি সিঙ্গি গ্রামে কাশীরাম দাসের জন্মভিটের বেহাল অবস্থা সরেজমিনে দেখতে যান বাংলার মঠ-মন্দির বাঁচাও কমিটির সভাপতি গৌর ঘোষ। ভগ্নপ্রায় ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। গৌরবাবু জানান, বিষয়টি নিয়ে কলকাতায় গিয়ে কার্তিক মহারাজের সঙ্গে আলোচনা করবেন। পাশাপাশি মহাকবির জন্মভিটেকে হেরিটেজ ঘোষণার দাবিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানাবেন বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে, জন্মভিটার পাশের বাড়ির বাসিন্দা প্রভাত কুমার চৌধুরীও বর্তমান সরকারের কাছে দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে ব্লক প্রশাসনের তরফেও জন্মভিটে সংস্কার, সংরক্ষণ এবং সংগ্রহশালা তৈরির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছিল।
আরও পড়ুন: সরকার বিরোধী বিক্ষোভ রূপ নিল দাঙ্গার, জার্মানির রাজপথে হাজার হাজার Gen Z
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কাশীরাম দাসের অবদান কোনও নির্দিষ্ট গ্রাম বা জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর সৃষ্টি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির সাহিত্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে রয়েছে। অথচ সেই মহাকবির স্মৃতিবিজড়িত জন্মভিটে যদি এভাবেই অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যায়, তবে তা নিঃসন্দেহে বাংলার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পক্ষে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। শুধু আশ্বাস বা পরিকল্পনা নয়, এবার প্রয়োজন বাস্তব পদক্ষেপ। দ্রুত জন্মভিটেকে হেরিটেজ ঘোষণা করে সংস্কার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক, এমনটাই দাবি সিঙ্গিবাসীর। নতুন সরকারের আমলে কি যোগ্য সম্মান পাবে এই বাস্তুভিটে? আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে গ্রামবাসীদের?