আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: আগামী ২ ও ৩ নভেম্বর দেশজুড়ে দু’দিনের ধর্মঘটে শামিল হতে চলেছেন IDBI (Industrial Development Bank of India Limited) ব্যাঙ্কের কর্মী ও আধিকারিকদের একাংশ। ব্যাঙ্কের বেসরকারিকরণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেই এই কর্মসূচির ডাক দিয়েছে UFIOE (United Forum of IDBI Officers and Employees)। সূত্র অনুযায়ী, ১০ হাজারেরও বেশি কর্মী এই আন্দোলনে অংশ নিতে চলেছেন। কর্মীদের দাবি, দীর্ঘদিনের সরকারি বিনিয়োগ এবং তাঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় ব্যাঙ্কটি আর্থিক সংকট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে একটি বিদেশি সংস্থার হাতে ব্যাঙ্কের পরিচালনভার তুলে দেওয়া কি আদৌ যুক্তিসংগত?
ধর্মঘটের প্রেক্ষাপট
বস্তুত, IDBI ব্যাঙ্কের মালিকানা হস্তান্তরের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করেই এই বিতর্কের সূত্রপাত। গত ১৬ অক্টোবর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কানাডার Fairfax Financial Holdings-এর সহযোগী সংস্থার কাছে ব্যাঙ্কের ৬০.৭২ শতাংশ অংশীদারিত্ব বিক্রির অনুমোদন দেয়। প্রস্তাবিত লেনদেনের মূল্য ৫২,৮৭৮.০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে কেন্দ্রের হাতে থাকা ৩০.৪৮ শতাংশ এবং LIC-এর হাতে থাকা ৩০.২৪ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই লেনদেন সম্পূর্ণ হলে ব্যাঙ্কের পরিচালন নিয়ন্ত্রণও বেসরকারি সংস্থার হাতে চলে যাবে। কর্মী সংগঠনগুলির আশঙ্কা, এর ফলে IDBI ব্যাঙ্কের রাষ্ট্রায়ত্ত চরিত্র বদলে যেতে পারে। শুধু তাই নয়, ব্যাঙ্কের আর্থিক পুনরুদ্ধারের পিছনে সরকারি অর্থ ও কর্মীদের অবদান থাকা সত্ত্বেও কেন মালিকানা হস্তান্তরের পথে হাঁটা হচ্ছে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।
কী কী দাবি কর্মীদের?
বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের পাশাপাশি একাধিক দাবিতে সরব হয়েছেন UFIOE-এর সদস্যরা। তাঁদের মূল দাবিগুলি হল–
- কেন্দ্র ও LIC মিলিয়ে IDBI ব্যাঙ্কের অন্তত ৫১ শতাংশ অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। সেই লক্ষ্যে সরকারকে আরও অন্তত ৬ শতাংশ শেয়ার অধিগ্রহণের দাবি জানিয়েছে সংগঠন।
- বর্তমান কর্মীদের চাকরির শর্ত, পেনশন, কর্মীকল্যাণমূলক সুযোগ-সুবিধা এবং সংরক্ষণ নীতি বজায় রাখার জন্য লিখিত ও আইনগত নিশ্চয়তা দিতে হবে।
- রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মতো বেতন সংশোধন ও পেনশন সংক্রান্ত সুবিধা বহাল রাখতে হবে।
- বেসরকারিকরণ সম্পূর্ণ হলে কর্মীদের অন্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে তাঁদের বেতন, পদমর্যাদা, চাকরির অভিজ্ঞতা, অবসরকালীন সুবিধা সুরক্ষিত রাখতে হবে।
- চুক্তিভিত্তিকভাবে ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিযুক্ত কর্মীদেরও ব্যাঙ্কের অধীনে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে।
কর্মী সংগঠনগুলির আরও আশঙ্কা, বেসরকারিকরণের ফলে শুধু কর্মীদেরই নয়, কৃষক, ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতা এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের স্বার্থও প্রভাবিত হতে পারে।
অন্যদিকে, অর্থ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, ব্যাঙ্কের কর্মীদের স্বার্থ ও চাকরির বর্তমান শর্তাবলি বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বিদ্যমান পরিষেবার শর্ত অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু কর্মী সংগঠনগুলি এই আশ্বাসকে যথেষ্ট বলে মনে করছে না। তাঁদের দাবি, শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতি নয়, চাকরি, পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা রক্ষায় লিখিত এবং আইনগত নিশ্চয়তা দিতে হবে। ফলে একদিকে সরকারের বেসরকারিকরণের সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে কর্মীদের আপত্তি, এই দুইয়ের সংঘাতেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
এদিকে ধর্মঘটের জেরে সাধারণ গ্রাহকদের ব্যাঙ্কিং পরিষেবা কতটা প্রভাবিত হতে পারে, তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। IDBI ব্যাঙ্কের তরফে ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত গ্রাহক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, ২ ও ৩ নভেম্বর শাখাভিত্তিক পরিষেবা ব্যাহত হতে পারে। তাই ওই দু’দিনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাঙ্কিংয়ের কাজ আগেভাগেই সেরে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রাহকদের জন্য বিকল্প পরিষেবাগুলিও চালু থাকবে বলে আশ্বস্ত করেছে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ। সেগুলি হল–
- Go Mobile+ এবং ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং পরিষেবা।
- UPI-এর মাধ্যমে লেনদেন।
- ATM এবং কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট (CSP) পরিষেবা।
- অন্য ব্যাঙ্কের ATM থেকে টাকা তুললেও ওই দু’দিন কোনও অতিরিক্ত চার্জ লাগবে না।
আরও পড়ুন: ডিসেম্বর থেকেই ঢুকবে ১৫০০ করে, বার্ধক্য ভাতা নিয়ে বিরাট সুখবর
ধর্মঘটের কারণে ব্যাঙ্কের শাখায় গিয়ে টাকা জমা দেওয়া, তোলা বা অন্যান্য কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা হতে পারে, তবে সমস্ত রকমের ব্যাঙ্কিং পরিষেবা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না। এই ধর্মঘট আদৌ দু’দিনে সীমাবদ্ধ থাকবে কিনা সেই নিয়ে কোনও নিশ্চয়তা নেই। তাই এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কর্মীদের আন্দোলন এবং গ্রাহকদের পরিষেবা সচল রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন IDBI ব্যাঙ্কের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।