অনন্যা সরকার, ছত্তিশগড়: কথায় বলে শিক্ষক-শিক্ষিকারা (Teachers) হলেন মোমবাতির মতো, তাঁরা নিজেরা জ্বলে অন্যদের পথ আলোকিত করেন। প্রতিটি মানুষের জীবনে শিক্ষাগুরুর অবদান অনেকখানি। আত্মত্যাগ ও নিষ্ঠা দিয়ে তাঁরা ভবিষ্যৎ গড়ে তোলেন শিক্ষার্থীদের। ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য শিক্ষিকাদের এরকমই এক আত্মত্যাগের ছবি উঠে এল ছত্তিশগড়ের বলরামপুর জেলা থেকে। বর্ষায় দুই শিক্ষিকা প্রতিদিন এক কষ্টকর যাত্রা করেন, যা যে কারও গা শিউরে দেবে (Struggle Story)। তাঁরা স্কুটারে করে কিছুটা পথ আসার পর পাহাড়ি ও পাথুরে পথ ধরে প্রায় ৩ কিলোমিটার হেঁটে প্রতিদিন স্কুলে পৌঁছান এবং পথে একটি উত্তাল নদীও পার করতে হয় তাঁদের। এক শিক্ষিকা তো তাঁর ৯ মাসের মেয়েকে কোলে নিয়ে নদী পার হন। জল কখনও থাকে কোমর পর্যন্ত, কখনও বা তারও বেশি। তবুও ছাত্রছাত্রীদের পড়ানোর জন্য তাঁদের এই বিপদসংকুল যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
বর্ষাকালে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় গ্রাম
এই ঘটনা বলরামপুরের ওয়াদরাফনগর ব্লকের ধৌরপুর গ্রামের। প্রত্যন্ত গ্রাম ধৌরপুর মোরান ও ইরিয়া নদীর সঙ্গমস্থলে অবস্থিত। বর্ষাকালে, যখন নদীর জলস্তর বেড়ে যায়, তখন এই এলাকাটি কার্যত বাকি বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই সময়ে, গ্রামে পৌঁছানো হয়ে পড়ে অত্যন্ত কঠিন, কারণ কোনও যানবাহনই সেখানে পৌঁছাতে পারে না। তাই, শিক্ষিকাদের ওই পাহাড়ি পথ ও নদী পায়ে হেঁটেই পার হতে হয়। সন্ধ্যা হালদার ও কর্মিলা টোপ্পো এই গ্রামের স্কুলের বাচ্চাদের পড়ান এবং প্রতি বছর বর্ষাকালে এই একই প্রতিকূলতার সম্মুখীন হন।
সন্ধ্যা হালদার জানান যে, তাঁরা দুজনেই তাঁদের স্কুটারগুলো মারনা নামক একটি জায়গায় পার্ক করেন, কারণ ওই জায়গার পর আর যানবাহন যেতে পারে না। দুর্গম পথ এবং নদী পার হওয়ার সময় জীবন বিপন্ন হওয়া সত্ত্বেও, শিক্ষিকা জানান যে, স্কুলের শিশুদের হাসিমুখগুলো, তাদের আনন্দই তাঁকে এই ভয়ঙ্কর রাস্তায় এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
আরও পড়ুন: দামোদরে দেখা মিলল ইলিশের! দু’বছর পর রূপোলি শস্যের সন্ধান পেয়ে খুশির হাওয়া খন্ডঘোষে
আবার, আরেক শিক্ষিকা কর্মিলা টোপ্পো জানান তিনি ২০১৪ সাল থেকে এই স্কুলে কর্মরত রয়েছেন। প্রতি বছর বর্ষাকালে তাঁকে একই রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। কোলে ৯ মাসের মেয়েকে নিয়ে নদী পার হতে হতে টোপ্পো বলেন, বর্ষাকালে প্রতি বছরই এমনটা হয়। তাঁদের বহুবার এই রাস্তা ব্যবহার করতে নিষেধ করা হয়। বলা হয় যে, জলস্তর বেশি থাকলে যেন তাঁরা সেখানে না যান। তা সত্ত্বেও, তিনি এই কঠিন পথ দিয়েই বাচ্চাদের পড়াতে স্কুলে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন।
আরও পড়ুন: UPSC-র ইন্টারভিউতে যাওয়ার ছিল না টাকা, দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে IAS দিনমজুরের মেয়ে
যখন এই দুই শিক্ষিকার কঠিন সংগ্রাম ও নিষ্ঠার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন বলরামপুরের কালেক্টর চন্দন সঞ্জয় ত্রিপাঠীর কানেও বিষয়টি পৌঁছায়। তিনি জানান যে, কোনও সরকারি সূত্র থেকে নয়, বরং একটি সংবাদ প্রতিবেদনের মাধ্যমে তিনি এই বিষয়টি জানতে পেরেছেন। কালেক্টর কর্মিলা টোপ্পোর এই কঠোর পরিশ্রম ও দায়িত্বশীলতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, তিনি তাঁর সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জেলার অন্যান্য শিক্ষকদের জন্য একটি প্রশংসনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্ষাকালে ধৌরপুর পৌঁছানো সাধারণ মানুষের জন্য যেখানে একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ, সেখানে সন্ধ্যা হালদার ও কর্মিলা টোপ্পোর কাছে এটি তাঁদের সন্তানসম ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষাদানের জন্য একটি নিত্যদিনের দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।