এক্সক্লুসিভ: বহুতলে অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার ক্ষেত্রে প্রচলিত মইয়ের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে এবার অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপর জোর দিচ্ছে রাজ্যের দমকল ও জরুরি পরিষেবা দফতর (Fire Service)। ৩৬ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম ‘আর্টিকুলেটিং ওয়াটার টাওয়ার’ থেকে শুরু করে নতুন প্রজন্মের জলবাহী ফায়ার টেন্ডার সমগ্র পরিকাঠামো ঢেলে সাজানোর এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দফতরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তপোক্ত করতে ধাপে ধাপে মোট ২২৬টি আধুনিক যান বহরে যুক্ত হচ্ছে।
এই নতুন যানগুলির মধ্যে রয়েছে ১৯৮টি ‘মিড সাইজ ওয়াটার টেন্ডার’ (যার প্রতিটির জলধারণ ক্ষমতা প্রায় ২.৫ কিলোলিটার), ২৫টি ‘মাল্টি পারপাস ফায়ার টেন্ডার’ (জলধারণ ক্ষমতা প্রায় ৬ কিলোলিটার) এবং ৩টি ‘আর্টিকুলেটিং ওয়াটার টাওয়ার’। আর্টিকুলেটিং ওয়াটার টাওয়ারের মূল বিশেষত্ব হলো, এটি যান্ত্রিকভাবে প্রায় ৩৬ মিটার পর্যন্ত উঁচুতে উঠে জল স্প্রে করতে পারে। ফলে উঁচু বহুতলে আগুন লাগলে প্রচলিত ‘টার্নটেবিল ল্যাডার’-এর নাগালের সীমাবদ্ধতা অনেকটাই কাটানো সম্ভব হবে।
দফতর সূত্রে জানানো হয়েছে, যানগুলি শুধু শহরকেন্দ্রিক অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের জন্য নয়, বরং নতুন আবাসন, ঘনবসতিপূর্ণ নগরাঞ্চল এবং শিল্পাঞ্চলের চাহিদার কথা মাথায় রেখে মোতায়েন করা হবে। আগামীকাল রেড রোড প্রাঙ্গণে প্রস্তুতি ও ফ্ল্যাগ-অফ প্রক্রিয়া শেষে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দমকল ও জরুরি বিভাগ তাদের ‘ভেহিকল পুল’-এর মাধ্যমে এগুলো পরিচালনা করবে।
আাগামী পুজোয় বাড়তি নজর ও তৎপরতা
আসন্ন দুর্গাপুজোয় অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে রাখা হচ্ছে বাড়তি প্রস্তুতি। গত বছরের ৯৯টির জায়গায় এবার ১০৯টি ‘স্ট্যান্ডবাই ফায়ার স্টেশন’ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুজো চলাকালীন ভিড় ও যানজট এড়িয়ে দ্রুত অকুস্থলে পৌঁছতে দমকলের মোটরবাইক বাহিনীর সংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। মণ্ডপ পরিদর্শন, প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত রেসপন্স নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যানজট এড়িয়ে যাতে দ্রুত ফায়ার টেন্ডার পৌঁছতে পারে, তার জন্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পুজো মণ্ডপ ঘিরে যৌথ “রুট প্ল্যান” তৈরি করা হচ্ছে। মণ্ডপের অনুমোদনের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা, পৃথক প্রবেশ ও প্রস্থান পথ এবং অগ্নিনিরাপত্তা বিধি মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
জনসাধারণের প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
একটি বিশেষ অভিনব উদ্যোগ হিসেবে প্রতিটি পুজো কমিটি থেকে এক বা দু’জন সদস্যকে সরকারি খরচে বিনামূল্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ফায়ার এক্সটিংগুইশার ব্যবহারের কৌশল, প্রাথমিক অগ্নিনির্বাপণ এবং দ্রুত দমকলে খবর দেওয়ার বিষয়ে তারা প্রস্তুত থাকবেন। ফলে আগুন লাগার প্রথম ৫ থেকে ১০ মিনিটের সংকটজনক সময়ে দমকল পৌঁছনোর আগেই প্রাথমিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, যা পরবর্তীতে অন্যান্য জরুরি ক্ষেত্রেও কাজে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নতুন ফায়ার স্টেশন তৈরির ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ প্রস্তুত করা হয়েছে। বর্তমানে একাধিক নতুন কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ চলছে। পাশাপাশি আগামী বাজেটে আরও নতুন কেন্দ্র তৈরি এবং দুর্গম ও পিছিয়ে পড়া গ্রামীণ এলাকায় অতিরিক্ত ফায়ার স্টেশন গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় অগ্নি-নিরাপত্তা পরামর্শদাতা সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী শহরাঞ্চলে প্রায় ৫ মিনিট এবং গ্রামাঞ্চলে সর্বোচ্চ ২০ মিনিটের মধ্যে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জনই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
দমকল ও জরুরি পরিষেবা দফতরের এই সামগ্রিক পরিকল্পনায় আধুনিক সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত জনবল এবং দ্রুত রেসপন্স টাইমকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, পুজো-কেন্দ্রিক অস্থায়ী পরিকাঠামোর দিকেও নজর রাখা হয়েছে। অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধারকাজ, অগ্নি-প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির এই সমন্বিত প্রয়াস রাজ্যের সুরক্ষায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তথ্যসূত্র ও কৃতজ্ঞতা: দমকল ও জরুরি পরিষেবা দফতর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দফতর এবং দমকল প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী।