ভয়ঙ্কর বিমান অভিজ্ঞতা থেকে গবেষণায় সাফল্য, ১৮ বছরের আদিত্য পেল ৯৫ লক্ষের স্কলারশিপ

অনন্যা সরকার, কলকাতা: বিমানে যাত্রা করার সময় বিশৃঙ্খল বায়ুপ্রবাহের (Turbulence) ফলে হঠাৎই তৈরি হওয়া টালমাটাল অবস্থা সবচেয়ে সাহসী মানুষটিকেও আতঙ্কগ্রস্থ করে দিতে পারে। ওয়াশিংটনের বাসিন্দা ১৮ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত ছাত্র আদিত্য সেনগুপ্ত এই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতাকেই তাঁর গবেষণার মূল বিষয়বস্তু বানিয়ে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন (Success Story of Aditya Sengupta)। বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, ডেভিডসন ইনস্টিটিউট তাঁকে ২০২৬ সালের ডেভিডসন ফেলো লরিয়েট পুরস্কার এবং ১,০০,০০০ মার্কিন ডলারের (প্রায় ৯৫ লক্ষ টাকা) একটি মোটা অঙ্কের বৃত্তি (Scholarship) দিয়ে সম্মানিত করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার জন্য বিশেষ সম্মান আদিত্যকে 

আদিত্য সেনগুপ্ত একবার তুমুল টার্বুলেন্সের সম্মুখীন হন। তখন তাঁর মনে একটিই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল যে, আবহাওয়া ও মেঘের পূর্বাভাস যেখানে এত সহজে দেওয়া যায়, সেখানে এই কম্পনগুলির পূর্বাভাস আগে থেকে দেওয়া এত কঠিন কেন? এই প্রশ্নই তাঁকে বিশ্বের অন্যতম বড় সমস্যাটির সমাধান খুঁজে বার করতে উৎসাহিত করে। হাই স্কুলে পড়ার সময়ই আদিত্য টার্বুলেন্স ফিজিক্স, বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞান এবং মেশিন লার্নিং নিয়ে পড়াশোনা করেন। আর এই সমস্ত জ্ঞানের সমন্বয়ে ‘ফোরক্যাট’ (ForeCAT) নামক একটি অনন্য এআই (AI) সিস্টেম তৈরি করেন। 

‘ফোরক্যাট’ সিস্টেমটি আসলে কী?

আদিত্যর তৈরি মডেলটি প্রচলিত ফোরকাস্ট সিস্টেমের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং উন্নততর। এই সিস্টেমটি মেশিন লার্নিংকে সরাসরি বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদ্যার নিয়মের সাথে একত্রীভূত করে। এর নিউরাল নেটওয়ার্কটি ভৌত নিয়ম দিয়ে তৈরি। এই নিয়মগুলি সহজেই বায়ুপ্রবাহ শনাক্ত করে, যার ফলে এটি পূর্বাভাস দিতে পারে যে, বায়ুপথের কোন কোন অঞ্চল টার্বুলেন্স বা বিপজ্জনক দমকা হাওয়া দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

আরও পড়ুন: বয়স ৯ মাস, হামাগুড়ি দেওয়ার বয়সে বিশ্বরেকর্ড গড়ে বিশ্ববাসীকে “শিক্ষা” দিল ভারতের শ্রেয়া

স্কুল স্তরের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল মেলা, রিজেনারন আইএসইএফ (Regeneron ISEF))-এ জমা দেওয়া তথ্য অনুসারে, এই মডেলটি ৯৫% ক্লাসিফিকেশন অ্যাক্যুরেসি প্রদর্শন করেছে, যা বর্তমানে উপলব্ধ অনেক প্রচলিত টুলের নির্ভুলতাকে ছাপিয়ে গেছে। সিস্টেমটির ক্ষমতা একটি ঘটনা থেকেই অনুমান করা যায়। আদিত্যর তৈরি মডেলটি ২০২৪ সালের মে মাসের সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনার পূর্বাভাস ৮৭% নির্ভুলতার সাথে দিয়েছিল।

যেকোনো বড় সাফল্যের পথ কখনোই মসৃণ হয় না। আদিত্যর যাত্রাটিও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি অসংখ্য ব্যর্থ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন এবং নতুন করে শুরু করার জন্য বেশ কয়েকটি প্রাথমিক মডেলকে বাদও দেন। তিনি বিশ্বাস করেন যে, যে গবেষণা পরীক্ষাগুলো ব্যর্থ হয়েছে, সেগুলো সফল পরীক্ষাগুলোর মতোই মূল্যবান। পড়াশোনা ও গবেষণার পাশাপাশি আদিত্য সেনগুপ্ত রোবোটিক্সেরও বিশেষজ্ঞ। ভিইএক্স রোবোটিক্স ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে তার দল শর বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে।

আরও পড়ুন: শুভেন্দুর সাথে গোপনে সাক্ষাৎ মমতা তৃণমূলের প্রার্থী সঞ্চিতা দে প্রধানের, বাড়ছে জল্পনা

আদিত্য সেনগুপ্ত তাঁর তৈরি এআই সিস্টেমটিকে শুধু একটি স্কুল প্রজেক্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি বাস্তব জগতের প্রয়োজন মাথায় রেখে এটি ডিজাইন করেছেন। আগামীদিনে, এই প্রযুক্তিটি এয়ার-ট্র্যাফিক কন্ট্রোল সিস্টেম ও ফ্লাইট-প্ল্যানিং সফটওয়্যারের সাথে সংযুক্ত করা হতে পারে। যদি বিমানের পাইলটরা বিপজ্জনক বায়ুপ্রবাহের আগাম সতর্কতা পান, তবে তারা সময়মতো তাদের উড়ানের পথ বা উচ্চতা পরিবর্তন করতে সক্ষম হবেন। আদিত্যের এই আবিষ্কার গোটা বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ বিমানযাত্রীর জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।

Leave a Comment