আনিষা চৌধুরী, কলকাতা: দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা চলছে। এই নিয়ে যথেষ্ট উদ্বিগ্ন বিচারব্যবস্থা। এই বিষয়টিকে সামনে রেখেই খোলা চিঠি দিলেন ৪২ জন প্রাক্তন বিচারপতি (Judges)। ৭ অক্টোবর লেখা ওই চিঠিতে নির্বাচন কমিশন (Election Commission), উচ্চতর বিচারব্যবস্থা এবং অন্যান্য সাংবিধানিক ও আইনসিদ্ধ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে চলা লাগাতার আক্রমণ নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। স্বাক্ষরকারীদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে কথা বলছেন না। তবে প্রতিষ্ঠানগুলি বর্তমানে যে পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে, তাতে তাঁরা আর চুপ করে বসে থাকতে পারছেন না।
কী বলা হয়েছে ওই চিঠিতে?
চিঠিতে বলা হয়েছে, দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর বারংবার আঘাত আনা হচ্ছে। এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখ্য নির্বাচন কমিশন। উচ্চতর বিচারব্যবস্থা ও অন্যান্য সাংবিধানিক সংস্থাকেও একইভাবে নিশানা করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন প্রাক্তন বিচারপতিরা। তাঁদের মতে, কোনও প্রতিষ্ঠানের কাজের সমালোচনা করা অবশ্যই গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া কোনও সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষকে ‘চোর’, ‘পুতুল’ বা ‘আপস করা প্রতিষ্ঠান’ বলে বারবার আক্রমণ করা মানে সংবিধানকে অমর্যাদা করা। দুটো বিষয় কিন্তু এক নয়। চিঠিতে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, “প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা করা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু প্রতিষ্ঠানকে হেয় করা গণতান্ত্রিক অধিকার নয়।”
‘ভোট চুরি’ বা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতিরা। প্রাক্তন বিচারপতিদের বক্তব্য, এমন গুরুতর অভিযোগ করা হলে তার পক্ষে যথাযথ প্রমাণ এবং আইনি প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, ভোটে কারচুপির মতো গুরুতর অভিযোগ আদালতে প্রমাণ বা হলফনামার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করা হয়নি। তার পরিবর্তে সংবাদমাধ্যমের সামনে বিষয়টি বাজেভাবে উত্থাপন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের তরফে প্রয়োজনীয় হলফনামা বা প্রমাণ চাওয়া হলেও তা জমা দেওয়া হয়নি বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।
প্রাক্তন বিচারপতিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি ভোটার বিপুল সংখ্যক ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে নির্বাচন কমিশন কোনও পক্ষপাতিত্ব করে না বরং একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই কাজ করে। তাঁদের বক্তব্য, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্র ও রাজ্য, দুই স্তরেই ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তর হয়েছে। শুধু তাই নয়, বহু ক্ষেত্রেই নির্বাচনে পরাজিত রাজনৈতিক দল ভোটার ফলাফল মেনে নিয়েছে।
চিঠির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ভোটার তালিকার SIR। প্রাক্তন বিচারপতিদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে আইনসম্মত। এর উদ্দেশ্য হল ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য করা। তাঁরা জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ২১ নম্বর ধারার ৩ নম্বর উপধারার উল্লেখ করে বলেছেন, নির্বাচন কমিশনের হাতে ভোটার তালিকা সংশোধনের ক্ষমতা রয়েছে। তাঁদের দাবি, মৃত ব্যক্তির নাম, একই ব্যক্তির একাধিক নাম কিংবা অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়ার পাশাপাশি যোগ্য ভোটারদের তালিকায় রাখাই এই ধরনের সংশোধনের প্রধান উদ্দেশ্য। তাঁরা মনে করেন, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট সময়ে অন্তর ভোটার তালিকায় এরূপ সংশোধনের প্রয়োজন।
এসআইআরের বৈধতার প্রসঙ্গে চিঠিতে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাক্তন বিচারপতিদের বক্তব্য, প্রয়োজনীয় নোটিস, শুনানি, আপত্তি জানানোর সুযোগ এবং আপিলের মতো ব্যবস্থাপনা যদি থাকতে পারে তাহলে নির্বাচন কমিশনের হাতেও ভোটার তালিকার সংশোধন অধিকার থাকবে না কেন? এটাতো কমিশনের ক্ষমতার মধ্যেই পড়ে। সেই কারণেই এসআইআরকে সরাসরি বেআইনি বা গণতন্ত্রবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করার একেবারেই ঠিক নয়।
প্রাক্তন বিচারপতিদের বক্তব্য, বারবার যদি মানুষকে বলা হয় তাঁদের ভোটের কোনও মূল্য নেই বা নির্বাচনব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য নয়, তাহলে ধীরে ধীরে ভোট এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির উপর মানুষের বিশ্বাস উঠে যাবে। এই প্রসঙ্গে চিঠিতে বলা হয়েছে, “আস্থাই গণতন্ত্রের মুদ্রা।” এমনকি ভোটের উপর আস্থা হারালে তার প্রভাব রাজপথেও পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, “যখন ব্যালটের গুরুত্ব হারায়, তখন রাজপথ তার জায়গা নেয়।”
চিঠিতে বলা হয়েছে, “কোনও শিরোনাম প্রমাণ নয়, আর একই অভিযোগ বারবার বললেই সেটি সত্য হয়ে যায় না।” সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও স্বচ্ছ থাকার, মানুষের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার এবং রাজনৈতিক সংঘাতের ঊর্ধ্বে থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। নাগরিকদেরও কোনও দাবি বা অভিযোগ শুনেই বিশ্বাস না করে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছেন প্রাক্তন বিচারপতিরা।
চিঠির শেষদিকে ভোটারদের উদ্দেশেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। স্বাক্ষরকারীরা বলেছেন, “কেউ যেন আপনাদের বোঝাতে না পারে যে আপনাদের ভোট অর্থহীন। কারণ আপনাদের ভোটই আপনাদের কণ্ঠস্বর এবং তার গুরুত্ব অপরিসীম।” তাঁদের বক্তব্য, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান কোনও সরকারের নিজস্ব সম্পত্তি নয়, এগুলি দেশের মানুষের প্রতিষ্ঠান। তাই কোনও প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে বা তার উপর মানুষের আস্থা নষ্ট হলে শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়বে নাগরিকদের উপর, গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর।
আরও পড়ুন: ‘শয়তানের মৃত্যু…’ নানা পাটেকরের প্রয়াণে প্রতিক্রিয়া তনুশ্রী দত্তের
৪২ জন স্বাক্ষরকারীর মধ্যে প্রাক্তন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হেমন্ত গুপ্তা ও পঙ্কজ মিত্তল-সহ বিভিন্ন হাই কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতিরা রয়েছেন। এই চিঠি প্রকাশের জেরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের আন্দোলন এবং SIR নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়েছে।