অনন্যা সরকার, বীরভূম: তিনি কোনও নামকরা, টেলিভিশনের পর্দায় সচরাচর দেখা পাওয়া বিজ্ঞানীদের মতো নন। অত্যন্ত সাদামাটা ও নিরিবিলি জীবনযাপন করেন তিনি, অথচ তাঁর কাজ এক অনন্য নজির সৃষ্টি করেছে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, সেই ব্যক্তিই হল প্রকৃত বিজ্ঞানী, যাঁর আবিষ্কার, তা যতই ছোট হোক না কেন, মানবজাতির কল্যাণে অবদান রাখে। গত ২৫ বছর ধরে তিনি একটা গুরুতর প্রশ্নের উত্তর খুঁজে চলেছেন – বিজ্ঞানকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকবে এবং পরিবেশ দূষণও ঘটাবে না? তিনি হলেন শান্তিনিকেতনের ‘প্রফেসর শঙ্কু’ অরণি চক্রবর্তী (Scientist Arani Chakraborty)। আসুন তাঁর অসামান্য কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
বাড়িটাই হয়ে উঠেছে গবেষণার আঁতুড়ঘর
শান্তিনিকেতনের গোয়ালপাড়ায় ছোট টিলার ওপর অবস্থিত অদ্ভুত বাড়িটার নাম চিটি চিটি ব্যাঙ ব্যাঙ। আর এর মালিক হলেন অরণি চক্রবর্তী। তাঁর বাড়িতে প্রবেশর জন্য কোনো সদর দরজা নেই। রয়েছে শুধু বিশালাকার কিছু জানলা। প্রায় ২৫ বছর ধরে অরণিবাবু সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর না করেই জীবন কাটাচ্ছেন। তাঁর বাড়ির আলো, পাখা, মোবাইল চার্জার – সবকিছুই চলে তাঁর নিজের ডিজাইন করা সোলার প্যানেলের শক্তিতে। তিনি এমন একটি পাম্প তৈরি করেছেন, যা কোনো বিদ্যুৎ ছাড়াই পায়ের চাপে ভূগর্ভস্থ জল ওপরে তুলতে পারে। এছাড়া, তিনি ভূগর্ভস্থ গ্রাউন্ডওয়াটার রিচার্জের একটি পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন, যার ফলে বৃষ্টির জল অপচয় হয় না, বাড়ির উঠোনে থাকা একটি জলাধার এবং চার কোণে অবস্থিত চারটি কূপের মাধ্যমে জল পরিশোধিত হয়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তরে গিয়ে মিশে যায়।
তবে তাঁর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন হলো সম্ভবত প্রাচীন রোমান কৌশলে অনুপ্রাণিত একটি শীতলীকরণ ব্যবস্থা বা কুলিং সিস্টেম। এই ব্যবস্থায় বাতাসকে একটি পাইপের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করা হয়, যা মাটির নীচে থাকা অংশের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় শীতল হয়ে যায়। এরপর সেই ঠান্ডা হাওয়াকে ঘরের ভেতর প্রবেশ করানো হয়। ফলে, কোনো বিদ্যুতের খরচ ছাড়াই ঘর ঠান্ডা থাকে। এছাড়া তিনি নিজে হাতে থ্রি-ডি (3D) প্রিন্টার, কম্পিউটার, আরামদায়ক অত্যাধুনিক সাইকেল এবং ইন্টারনেট ব্যবস্থাও তৈরি করেছেন।
আরও পড়ুন: আরামে বিশ্রাম করতে পারবেন যাত্রীরা, মালদা টাউন স্টেশনে তৈরি হল স্লিপিং পডস
কলকাতা বয়েজ স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ও সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জনকারী অরণি চক্রবর্তী বর্তমানে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক। তাঁর স্ত্রী শমিতা শীলও পেশায় অধ্যাপিকা, তিনি সিউড়ি বিদ্যাসাগর কলেজে পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন।
বর্তমানে দুটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন শান্তিনিকেতনের প্রফেসর শঙ্কু। একটি হলো সৌরচালিত ইঞ্জিন, আর অন্যটি এমন একটি সফটওয়্যার, যার মাধ্যমে যেকোনো ব্যক্তি নিখরচায় নিজের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা পরিচালনা করতে পারবে। তাঁর সমস্ত কাজে বরাবরই স্ত্রীর পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা পান অরণিবাবু। ভবিষ্যতে গবেষণাগারে উৎপাদিত (কৃত্রিম) মাংস তৈরি করারও পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এই নিভৃতচারী ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষটি দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে নীরবে বিজ্ঞানের প্রয়োগ করে মানবজাতির সেবা করে চলেছেন।