ঋণ করে কেনেন অটো, আজ ৯০০ কোটির ব্যবসা! এক আইডিয়ায় বদলে যায় শঙ্করের জীবন

অনন্যা সরকার, কর্নাটক: কর্ণাটকের বেল্লারের বাসিন্দা সত্য শঙ্কর কে. দারিদ্র্যকে হারিয়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। পানীয় শিল্পে নিজের স্বতন্ত্র নাম তৈরি করেছেন তিনি (Success Story of Sathya Sankar)। জনপ্রিয় বিন্দু ফিজ জিরা মসলার (Bindu Fizz Jeera Masala) প্রস্তুতকারক সংস্থা এসজি কর্পোরেটস (SG Corporates)-এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি। বছরে এখন ৯০০ কোটি টাকা আয় তার কোম্পানির। আসুন জেনে নিই শূন্য থেকে শুরু করে সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানো সত্য শঙ্করের সাফল্যের কাহিনী।

অটোরিকশা চালক থেকে ৯০০ কোটির কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা

সত্য শঙ্করের বাবা ছিলেন বেল্লারের একজন দরিদ্র পুরোহিত। আর্থিক অনটনের কারণে ১৯৮৪ সালে দ্বাদশ শ্রেণীর পাশ করার পর পড়াশোনা ছাড়তে বাধ্য হন সত্য শঙ্কর। লেখাপড়ার খরচ চালানোর মতো অর্থ তাদের ছিল না। কিন্তু এতে দমে যাননি তিনি বরং একটা উপায় বার করে ফেলেন। একটি অটো রিক্সার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন এবং সরকারি প্রকল্পের অধীনে ঋণ নিয়ে কিনে ফেলেন একটি অটোরিকশা। 

এক বছর ধরে সেই অটোরিকশা চালিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে ঋণের টাকা শোধ করেছিলেন সত্য শংকর। কিছুদিনের মধ্যেই অটোরিকশা বিক্রি করে কেনেন একটি ট্যাক্সি। আর এই ট্যাক্সি চালাতে চালাতেই তার জীবনে প্রথম বড় সুযোগটি আসে। প্রায়ই অনেক বিদেশি পর্যটক তার গাড়িতে উঠতেন। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন তারা আর কিছু কিনুন না কিনুন, এক বোতল প্যাকেজড পানীয় জল ঠিকই কিনতেন। এখান থেকেই তিনি ভাবলেন বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবসা শুরু করলে কেমন হয়।  

১৯৮৮ সালে সত্য-শংকর তার গাড়িটি বিক্রি করে দেন। গাড়ি চালানোর চেয়ে ক্ষুদ্র যন্ত্রাংশ বিক্রির কাজ থেকে বেশি লাভ করা যায় ভেবে কর্ণাটকের পুত্তুরে একটি ছোট অটোমোবাইলের দোকান খোলেন। তিনি দেখলেন যে সমস্ত গ্রাহক তার দোকান থেকে যন্ত্রাংশ কিনেন, তাদের টায়ারেরও প্রয়োজন হয় তাই একটি টায়ারের দোকানও খুললেন। এই সময় তিনি মানুষের অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি দেখে একটি ফাইন্যান্স কোম্পানি বানানোর চিন্তাভাবনা শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে প্রবীণ ক্যাপিটাল (Praveen Capital) নামে একটি ফাইন্যান্স সংস্থা খুলেও ফেলেন সত্য শঙ্কর। যেখানে অন্যান্য কোম্পানিগুলি ব্যবহৃত গাড়িতে ঋণ দিত না, সেখানেই ব্যবহৃত অটো ও গাড়ির জন্য লোন দিতেন তিনি। নিজের জীবন সংগ্রাম দিয়ে সেই সমস্ত মানুষদের দুর্দশা বুঝেছিলেন সত্য শঙ্করের। 

১৫ বছর ধরে অন্যান্য ব্যবসায় মনোনিবেশ করলেও জলের ব্যবসার কথা তার মাথায় সবসময় ঘুরপাক খেত। অবশেষে ২০০০ সালে তিনি পুত্তুরের কাছে নারিমোগেরু গ্রামে একটি কারখানা স্থাপন করেন। ব্র্যান্ডের নাম রাখেন ‘বিন্দু’ (Bindu)। তবে শুধু জলেতেই থেমে থাকেননি তিনি। ভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন সত্য শঙ্কর। উত্তর ভারতে ঘুরতে গিয়ে জিরা সোডার স্বাদে মুগ্ধ হন। ঠিক করেন এই পানীয়টিকেই তিনি আরও ভালো বানাবেন। পুত্তুরে ফিরে এসে তাই শুরু করলেন “বিন্দু ফিজ জিরা মশলা” (Bindu Fizz Jeera Masala)। আর এখান থেকেই তার জীবন অন্য মোড় নিল। 

শুরুতে সত্য শঙ্করের তৈরি ড্রিঙ্ক কেউই কিনতে চাইছিলেন না। বাজারে ২০০ বাক্স পাঠালে ১০০ বাক্স ফেরত চলে আসতো। বাজার চলতি কোক, পেপসির জনপ্রিয়তার সাথে তার পানীয় এঁটে উঠতে পারছিল না। তবে তিনি জানতেন মানুষ একঘেয়ে স্বাদ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, তারা স্থানীয় কিছু চাইছে। তার অনেক বাজেট ছিল না, তাই হাইওয়ের ধারে বড় বড় বিজ্ঞাপনী ছবি আঁকানোর ব্যবস্থা করলেন। ধীরে ধীরে লোকমুখে সুনাম ছড়িয়ে পড়লো তার পানীয়ের। 

আরও পড়ুনঃ বাংলার গ্রামীণ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য ৮৫০৮ কোটি টাকার অনুমোদন কেন্দ্রের

বর্তমানে ৬১ বছর বয়সী সত্য শঙ্করের গ্রুপ, এসজি কর্পোরেটস-এর টার্নওভার ৯০০ কোটি টাকা। যেখানে ড্রিক ও স্ন্যাকস ব্র্যান্ড হাউস অফ বিন্দু থেকে আয় হয় ৫৭০ কোটি টাকা, আর প্রবীণ ক্যাপিটাল বছরে আয় করে ৩৩০ কোটি টাকা। স্থানীয় রুচির ওপর নির্ভর করে তার পানীয় ব্র্যান্ডটি আজ এত জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছে। সত্য শঙ্করের জীবনের কাহিনী প্রমাণ করে বড় কিছু করার জন্য প্রচুর অর্থ বা বড় ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। শুধু একটি আইডিয়া, আত্মবিশ্বাস আর সংকল্প থাকলেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব।

Leave a Comment