ড. শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ঃ আন্তর্জাতিক যোগ দিবস (International Day of Yoga) ঘিরে যখন শহরজুড়ে প্রস্তুতি তুঙ্গে, তখনই বিস্মৃতির অন্ধকার কাটিয়ে স্মৃতির আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠেন ভাদুড়ী মহাশয়, যিনি পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ নামেও পরিচিত।
প্রচারের আড়ালে থেকে এক ভিন্নধর্মী যোগচর্চার পরম্পরা বহন করেছিলেন এই ভাদুড়ী মহাশয়। মুঙ্গেরে যোগের কঠোর সাধনায় সিদ্ধিলাভের পর তাঁর মহাজীবন কেটেছে মূলত কলকাতাতেই। আপার সার্কুলার রোডের এই ভাদুড়ী মহাশয়কে ঘিরে সেদিন কৌতূহল ছিল, কিন্তু নীরবতাও ছিল। জীবনের শেষ পর্বের কুড়ি বছর তো তিনি বাইরে বড় একটা বেরই হননি।
শ্যামাচরণ লাহিড়ী গৃহস্থদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন যোগশিক্ষা; তাঁরই পরম্পরা আমেরিকায় প্রচার করেছিলেন পরমহংস যোগানন্দ। তিনিই আমাদের এখানে ও পাশ্চাত্যে ‘যোগদা সৎসঙ্গ সোসাইটি অব ইন্ডিয়া’ ও ‘সেল্ফ রিয়ালাইজেশন ফেলোশিপ’ সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা, পাশ্চাত্যে ‘ক্রিয়াযোগ’ প্রসারের মূল মুখ। তাঁর ‘অটোবায়োগ্রাফি অব আ যোগী’ বা ‘যোগিকথামৃত’-র পাতায় আজও উজ্জ্বল ভাদুড়ী মহাশয়। সেই সূত্রেই সারা পৃথিবী ভাদুড়ী মহাশয়কে চেনে লঘিমাসিদ্ধ সাধু, অর্থাৎ ‘The Levitating Saint’ হিসেবে।
গুরুপরম্পরায় প্রাপ্ত ক্রিয়াযোগ প্রচারে যে পরমহংস যোগানন্দ আমেরিকা জয় করেছিলেন, পশ্চিমে যাওয়ার আগে তিনিই নিয়েছিলেন ভাদুড়ী মহাশয়ের বিদায় আশীর্বাদ। ‘অটোবায়োগ্রাফি অব আ যোগী’ বা ‘যোগিকথামৃত’ বই আজও তার সাক্ষ্য বহন করছে।
যোগীরাজ শ্যামাচরণ সংসারে থেকেই ছিলেন সন্ন্যাসী; আর ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবের আশীর্বাদপ্রাপ্ত ভাদুড়ী মহাশয় দশনামী সম্প্রদায় থেকে সন্ন্যাস নিলেও কখনও গেরুয়া পরেননি। যোগাভ্যাসে জাতি, ধর্ম মানেননি শ্যামাচরণ লাহিড়ী। একই কথা প্রযোজ্য ভাদুড়ী মহাশয় অর্থাৎ পরমহংস মহর্ষি নগেন্দ্রনাথ ভাদুড়ী সম্পর্কেও। সেই পরম্পরা পরবর্তী সময়ে বহন করেছিলেন ভাদুড়ী মহাশয়ের মানসপুত্র ধ্যানপ্রকাশ ব্রহ্মচারীও। তবে শুধু যোগ নয়, ভাদুড়ী মহাশয় যোগের সঙ্গে সংযুক্ত করেছিলেন ভক্তিকেও। ভক্তদের জন্য তাই তিনি রেখেছিলেন নামযজ্ঞের আদর্শ।
ভাদুড়ী মহাশয় এবং ধ্যানপ্রকাশ ব্রহ্মচারী ভৃগু যোগের পরম্পরা বহন করেছিলেন। শোনা যায়, স্বয়ং ভগবান বিষ্ণু ভাদুড়ী মহাশয়কে যোগদীক্ষা প্রদান করেছিলেন। ভারতের প্রাচীন যোগের সঙ্গে ভাদুড়ী মহাশয় সংযুক্ত করেছিলেন ভক্তিকে; যোগ-ভক্তি মার্গকে তিনি উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন সংসারের সকলের জন্য।
যোগ দিবসের আগত লগ্নের প্রাক্কালে যোগসাধনা এবং যোগচর্চার যে মূল সুরটি আজও ভারতীয় পরম্পরার গভীরে বিরাজ করছে, ভাদুড়ী মহাশয়ের অবস্থান যেন সেখানে বুঝিয়ে দেয়—যোগই সেই পথ, যে পথ সন্ধান দিতে পারে ব্রহ্মস্বরূপে পৌঁছানোর।
——–
(লেখকের মা সম্পর্কে ভাদুড়ী মহাশয়ের প্রপৌত্রী।)