আলো জ্বেলে পথ দেখাবে গাছ! জৈব প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বায়োলুমিনেসেন্ট প্লান্ট

অনন্যা সরকার, কলকাতা: ভাবুন রাতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর আপনার চারপাশ আলোকিত করে রেখেছে রাস্তার ধারের গাছগুলো। কি অদ্ভুত লাগছে শুনতে? তবে একদল বিজ্ঞানী বলছেন এই অলীক কল্পনাই বাস্তবরূপ নিতে পারে আর কিছু বছরের মধ্যে। বহু শতাব্দী ধরে উদ্ভিদকে দিনের আলো, সালোকসংশ্লেষণ এবং সূর্যের স্বাভাবিক চক্রের সাথে যুক্ত বলেই মনে করা হয়েছে। তবে বর্তমানে চীনের গবেষকরা এমন এক আবিষ্কার করেছেন, যা কল্পবিজ্ঞানের গল্পের মতো শোনায়। তারা বানিয়েছেন এমন সব উদ্ভিদ, যা অন্ধকারেও আলো ছড়াতে সক্ষম (Bioluminescent Plant)।

জৈব পদ্ধতিতে আলো নিঃসরণকারী উদ্ভিদ বানালেন বিজ্ঞানীরা

বায়ো-টেকনোলজি, মেটিরিয়াল সায়েন্স এবং প্লান্ট ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো জটিল প্রযুক্তি একত্রিত করে এই বায়োলুমিনেসেন্ট প্লান্ট তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এটি ব্যবহার করে এমন জৈব বস্তু তৈরি করা হয়, যা বিদ্যুতের কোনো কৃত্রিম উৎস ছাড়াই আলো নিঃসরণ করতে পারে।

অবতার (Avatar)’ সিনেমার প্যান্ডোরা গ্রহের মতো আলোকোজ্জ্বল জঙ্গলটা হয়তো কাল্পনিক, কিন্তু বায়োলুমিনেসেন্ট বা জৈব-আলোক সৃষ্টিকারী প্রাকৃতিক দৃশ্য তৈরি করা এখন বাস্তব। জিনগতভাবে পরিবর্তিত ফুল থেকে শুরু করে রিচার্জেবল ও আলো-প্রদানকারী সাকুলেন্ট উদ্ভিদের মতো উদ্ভাবনগুলি সাসটেনেবল লাইটিং,  আরবান ডিজাইন ও পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। সাথে আধুনিক শহরে লিভিং ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও শুরু হয়েছে আলোচনা।

কীভাবে চীনা বিজ্ঞানীরা বিদ্যুৎ ছাড়াই আলো ছড়ানো উদ্ভিদ তৈরি করলেন?

বর্তমানে সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রচেষ্টাগুলোর মধ্যে একটি হল এই বায়োলিউমিনিসেন্ট প্লান্ট।  চীনা জৈবপ্রযুক্তি গবেষকরা জোনাকি এবং প্রাকৃতিকভাবে আলো ছড়ানো ছত্রাক থেকে প্রাপ্ত বায়োলুমিনেসেন্স উদ্ভিদ কোষে প্রবেশ করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। তারা উদ্ভিদের নিজস্ব মেটাবলিক সিস্টেমে একটি নির্দিষ্ট ফাঙ্গাল বায়োলুমিনেসেন্স পাথওয়ে (FBP) একত্রিভূত করার মাধ্যমে এমন উদ্ভিদ তৈরি করেছেন, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আলো বিকিরণ করে।

কোনও বাহ্যিক বৈদ্যুতিক শক্তি ছাড়াই এই পরিবর্তিত উদ্ভিদগুলো থেকে জৈবিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এক ধরনের মৃদু আভা নির্গত হয়। এই গবেষণায় নিকোটিয়ানা টাবাকাম (তামাক), রোজা রুবিগিনোসা (গোলাপ),বাডালিয়া পিনাটা, অ্যারাবিডোপসিস থ্যালিয়ানা, ক্যাথারান্থাস রোজিয়াস (মাদাগাস্কার পেরিউইঙ্কল), পেটুনিয়া হাইব্রিডা (পেটুনিয়া) সহ ৬টিরও বেশি প্রজাতিকে দৃশ্যমান আলো নিঃসরণের জন্য জিনগতভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।

গবেষকরা বলেছেন তাদের এই উদ্ভাবনের লক্ষ্য শুধুমাত্র নতুনত্ব মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই,  বায়োলুমিনেসেন্ট উদ্ভিদগুলি পার্ক, পর্যটন কেন্দ্র, এবং পাবলিক গার্ডেনগুলিতে কৃত্রিম আলোর  পরিবর্তে ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি শক্তি সঞ্চয় করে পরিবেশ রক্ষা করতে সক্ষম হবে। এই প্রযুক্তি প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে, যা অনেকটা জোনাকি এবং আলো-জ্বলা ছত্রাকের ব্যবহৃত পদ্ধতির মতোই সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তিকে আলোতে রূপান্তরিত করে। 

আরও পড়ুনঃ একধাক্কায় অনেকটাই কমল সোনা, রুপোর দাম! আজকের রেট

আলো বিকিরণকারী উদ্ভিদকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়ছে, তবে এর দ্বারা প্রচলিত আলোর পরিকাঠামোকে প্রতিস্থাপন করার আগে এখনও অনেকগুলি প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। গবেষকরা বিভিন্ন ধরনের শোভা বর্ধনকারী ও মোটা কান্ডযুক্ত উদ্ভিদে আলো বিকিরণ প্রক্রিয়ার স্থিতিশীল বাস্তবায়নের জন্য “কাট-ডিপ-বাডিং” (Cut Deep Budding) এবং ডি নভো মেরিস্টেম ইন্ডাকশনের (de novo meristem induction) মতো টিস্যু-কালচার-মুক্ত রূপান্তর পদ্ধতির বিকাশ করছেন। তাছাড়া, আধুনিক এলইডি আলোর তুলনায় বর্তমানের বায়োলুমিনেসেন্ট উদ্ভিদগুলো অপেক্ষাকৃত কম আলো নির্গত করে। তাই  গবেষকরা এর উজ্জ্বলতা, দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও কার্যকারিতা উন্নত করার জন্য কাজ করে চলেছেন।

Leave a Comment