সহেলি মিত্র, কলকাতাঃ চা নিয়ে তুঙ্গে বিতর্কে। গুণমান পরীক্ষা দিতে গিয়ে ভারতীয় সীমান্তে দাঁড়িয়ে পচছে নেপালের (Nepal) লাখ লাখ কুইন্টাল চা পাতা। বহু চা কারখানা বন্ধ ও শ্রমিকরা কাজহারা হয়েছেন বলে রিপোর্ট। ভারত ও নেপালের মধ্যে এই বিষয়ে যেন এক ঠান্ডা লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এদিকে এই ঘটনার মাঝেই বিতর্কের আগুনে আরও কিছুটা ঘি দেওয়ার কাজ করল নেপাল। ভারত-নেপাল সীমান্ত দিয়ে নেপালে যাতায়াতকারী ভারতীয় চালকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ খবর। আপনিও কি নিজের গাড়ি নিয়ে নেপালে যাওয়ার কথা ভাবছেন? তাহলে সেখানে যাওয়ার আগে অবশ্যই দশবার ভেবে নিন। মানতে হবে নতুন নিয়ম।
ভারতীয় গাড়িগুলির জন্য নতুন নিয়ম নেপালের
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নেপালে প্রবেশের আগে প্রতিটি গাড়ির জন্য অনলাইনে Temporary Vehicle Entry Declaration জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। যাত্রা শুরুর আগেই চালককে নেপাল কাস্টমসের ওয়েবসাইটে গিয়ে Temporary Vehicle Import Declaration Form পূরণ করতে হবে। ফর্মে নেপালে প্রবেশ ও ফেরার সীমান্ত চেকপোস্ট, নেপালে অবস্থানের সময়কাল, চালকের তথ্য এবং গাড়ির ইঞ্জিন নম্বর, চ্যাসিস নম্বর ও রেজিস্ট্রেশন নম্বরসহ প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য দিতে হবে। এই নিয়ম না মানলে সীমান্তে প্রবেশে জটিলতার মুখে পড়তে হতে পারে।
অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর গাড়ির চালককে একটি QR কোড বা রেফারেন্স নম্বর দেওয়া হবে। নেপাল সীমান্তের সংশ্লিষ্ট কাস্টমস অফিসে এই কোড দেখিয়ে নির্ধারিত ফি জমা দিলে গাড়ি প্রবেশের পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। নতুন নিয়ম না মানলে গাড়ি চালকদের জরিমানা করা হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে গাড়ি বাজেয়াপ্ত করে পরবর্তীতে নিলামও করা হতে পারে। আগে এই পুরো প্রক্রিয়াটি কাস্টমস অফিসে অফলাইনে সম্পন্ন হতো।
এছাড়া নেপাল থেকে ভারতে ফেরার সময় সংশ্লিষ্ট কাস্টমস অফিসে গাড়ির এক্সিট (Exit) রেকর্ড করানো বাধ্যতামূলক। তা না হলে গাড়ির প্রবেশের রেকর্ড সক্রিয় থাকবে এবং প্রতিদিনের ভিত্তিতে জরিমানা বাড়তে থাকবে। পরবর্তীবার নেপালে প্রবেশের সময় বকেয়া জরিমানার অর্থ আদায় করা হতে পারে।
কী বলছে সরকার?
কেন এরকম সিদ্ধান্ত? এই প্রসঙ্গে নেপাল প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভারত-নেপাল উন্মুক্ত সীমান্তের নিরাপত্তা জোরদার করা, গাড়ি চুরি রোধ এবং অবৈধ কেনাবেচা নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যেই এই অনলাইন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এছাড়া কালো কাচযুক্ত গাড়িও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নেপাল সরকার সোমবার থেকে কালো কাচযুক্ত যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু করেছে। কালো কাচযুক্ত ভারতীয় যানবাহনগুলোকে আর নেপালে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। এই ধরনের যানবাহনগুলোকে সীমান্তেই তাদের কালো কাচ খুলে ফেলতে হবে, আর নেপালের ভেতরে ধরা পড়লে জরিমানা করা হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুনঃ জুলাইতে বাংলার ৪১০০ গ্রামের চিত্র বদলে দেবে রাজ্য সরকার, টার্গেট বেঁধে দিল নবান্ন
চা নিয়ে বিতর্ক
ঘটনার সূত্রপাত নেপাল থেকে ভারতে আসা চায়ের প্রতিটি চালান বাধ্যতামূলকভাবে ল্যাব পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। আগে ভারত কেবল দৈবচয়নের ভিত্তিতে নেওয়া ৫ থেকে ২০ শতাংশ নমুনা পরীক্ষা করত এবং একটি ট্রাক উত্তীর্ণ হলেই পুরো চালানটি অনুমোদন পেয়ে যেত। এখন সীমান্তে দাঁড়ানো প্রতিটি ট্রাক থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য কলকাতার একটি কেন্দ্রীয় ল্যাবে পাঠানো হয়। নেপালে বর্তমানে কোনো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পরীক্ষাগার নেই। ফলে, কলকাতা থেকে প্রতিবেদন পৌঁছাতে ১৫ থেকে ২০ দিন সময় লাগছে। এই সময়ে ট্রাক ও গুদামে চা নষ্ট হতে শুরু করে, যার ফলে প্রায় ১৩ লক্ষ কিলোগ্রাম নেপালি চা সীমান্তে আটকে পড়ে। ভারতের এই কঠোর পদক্ষেপ নেপালের উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। পূর্ব নেপালের ঝাপা ও ইলাম জেলার ১০০টিরও বেশি চা কারখানা ও এস্টেট বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, যা প্রায় ৬০,০০০ দিনমজুরের জীবিকাকে হুমকির মুখে ফেলেছিল। তবে পরিস্থিতি এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। ধীরে ধীরে নেপালে এতদিন ধরে বন্ধ থাকা চা কারখানাগুলি পুনরায় খুলে যেতে শুরু করেছে।