বাবা নেই, মাসে ৬ হাজার আয় মায়ের, NEET পাস করে গ্রামের প্রথম ডাক্তার হচ্ছেন প্রিয়াঙ্কা

অনন্যা সরকার, হিমাচল প্রদেশ: অল্পবয়সেই হারিয়েছেন বাবাকে, মা ৬ হাজার টাকা বেতনের একটি সামান্য চাকরি করেন। তবে, মেয়ে মনের মধ্যে লালন করতেন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও কঠোর পরিশ্রম যে সফল বাধা দূরে সরিয়ে দিতে পারে, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন হিমাচল প্রদেশের প্রিয়াঙ্কা। প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের মেয়ে আজ সফলভাবে সর্বভারতীয় ডাক্তারি প্রবেশিকা পরীক্ষায় (NEET UG 2026 Success Story) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তার গ্রাম কেহরি থেকে প্রথম ডাক্তার হতে চলেছেন।

প্রতিকূলতা কাটিয়ে স্বপ্নপূরণ প্রিয়াঙ্কার

থিওগ থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কিহারি গ্রামের বাসিন্দা প্রিয়াঙ্কা সম্প্রতি NEET পরীক্ষায় ৭২০-এর মধ্যে ৫৩৩ নম্বর পেয়েছেন। তপশিলি জাতি (SC) বিভাগে তাঁর সর্বভারতীয় র‍্যাঙ্ক ১৬০৮। প্রিয়াঙ্কার মা থিওগের কিহারি সরকারি স্কুলে একজন মাল্টি টাস্ক ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করেন। প্রিয়াঙ্কা সেই স্কুল থেকেই দশম শ্রেণি পাশ করে থিওগের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে দ্বাদশ শ্রেণিতে ১০০-এর মধ্যে ১০০ নম্বর পেয়ে ওই স্কুলের মেডিকেল বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। 

আরও পড়ুন: দাদার আত্মত্যাগ পৌঁছে দিল AIIMS-র দরজায়, NEET-এ অসাধারণ ফল মজদুরের ছেলের

প্রথম প্রচেষ্টাতেই নিট রি-এক্সামে (NEET Re-Exam) উত্তীর্ণ হন প্রিয়াঙ্কা। তবে এর আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য বাতিল হওয়া পরীক্ষাটি আরও ভালো হয়েছিল তাঁর। ৬১২ নম্বর পাবেন বলে আশা করেছিলেন। প্রিয়াঙ্কার এই সাফল্যের পেছনে তাঁর মা ও স্কুলের দুই শিক্ষকের অবদান রয়েছে সবচেয়ে বেশি। প্রিয়াঙ্কার আরও দুই ভাইবোন রয়েছে। বাবা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে।

প্রিয়াঙ্কাকে তাঁর স্কুলের প্রধান শিক্ষক রমেশ নেগি এবং লেকচারার প্রকাশ শর্মা আর্থিক ও মানসিকভাবে খুবই সাহায্য করেন। প্রধান শিক্ষক এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁর জন্য ‘অ্যাসপায়ার’ নামের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে কোচিংয়ের ব্যবস্থা করে দেন। এছাড়া, স্কুলের রমেশ নেগি এবং প্রকাশ শর্মা প্রিয়াঙ্কার হোস্টেলের খরচ বাবদ প্রায় ৯,০০০ টাকাও দেন। প্রিয়াঙ্কা এক  সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, তার শিক্ষকরা না থাকলে তিনি আজ এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতেন না।

শিমলার লালপানি স্কুলের জীববিজ্ঞানের শিক্ষক প্রকাশ শর্মা জানিয়েছেন যে, গত বছর তিনি থিওগ স্কুলে পড়াতেন, যেখানে প্রিয়াঙ্কা পড়াশোনা করেছেন। তিনি প্রিয়াঙ্কার প্রসংশা করে বলেন, সে খুবই বুদ্ধিমতী মেয়ে, তবে ওদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। তথ্যের অভাবে প্রিয়াঙ্কা গত বছর নিট পরীক্ষা দেয়নি। যখন তিনি বিষয়টি জানতে পারেন, তখন তাঁকে এক বছর পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কোচিং নেওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর শিমলার অ্যাস্পায়ার কোচিং ইনস্টিটিউট প্রিয়াঙ্কাকে বিনামূল্যে কোচিং দিতে রাজি হয়, এমনকি তাঁর এক মাসের হোস্টেল ফি-ও মকুব করে দেয়। প্রকাশ শর্মা বলেন যে, প্রিয়াঙ্কার পরিবার চেয়েছিল সে, বিএসই (BSE) পড়ুক কারণ তাকে ডাক্তার বানানোর মতো সামর্থ্য তাদের ছিল না। 

আরও পড়ুন: বাবার সামান্য মুদিখানার দোকান, অনটন উপেক্ষা করে একসাথে NEET উত্তীর্ণ তিন ভাইবোন

নিট পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। কিন্তু এমবিবিএস (MBBS) পড়ার খরচ জোগাড় হবে কোথা থেকে? প্রকাশ শর্মা জানান, সেটারও ব্যবস্থা তিনি করে ফেলেছেন। ‘উড়ান’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন চালান তিনি, যেখানে অনেক সদস্য রয়েছে। এই গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে থেকেই কেউ ফি দিচ্ছেন, কেউ হোস্টেলের খরচ এবং বাকিরা সাধ্যমত সাহায্য করছেন। প্রিয়াঙ্কার মা রেখা জানান, তার তিনটি সন্তানের প্রত্যেকেই খুব বুদ্ধিমান ও বাধ্য। প্রিয়াঙ্কার এই সাফল্যের আবেগাপ্লুত তাঁর মা। 

Leave a Comment